শৈল-সৈকত ও দেশগ্রাম

চন্দনাইশের রংবিলাস রং ছড়াচ্ছে সারা দেশে

নিজস্ব প্রতিনিধি, চন্দনাইশ >> চট্টগ্রামের চন্দনাইশে রংবিলাস জাতের আখ চাষ এখন কৃষকদের কাছে লাভজনক কৃষি উদ্যোগ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অধিক ফলন, সুস্বাদু ও রসালো আখ, সহজ বাজারজাতকরণ এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ের কারণে এ জাতের আখ চাষে ঝুঁকছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষক। বর্তমানে চন্দনাইশের আখ বাংলাদেশের সর্বত্র সরবরাহ হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে ক্ষেত থেকেই আখ ক্রয় করে নিয়ে যায়। আখ চাষে অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটেছে, বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র।

উপজেলার ধোপাছড়ি, বৈলতলী, হাশিমপুর, সাতবাড়িয়া, বরমা, জোয়ারা, কাঞ্চনাবাদসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জমিতে এখন দৃষ্টিনন্দন রংবিলাস আখের আবাদ চোখে পড়ে। একসময় এসব জমির অনেক অংশ মৌসুমি ফসলের আওতায় থাকলেও বর্তমানে অধিক লাভের আশায় কৃষকরা আখ চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

---------

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রংবিলাস জাতের আখ স্বাদে মিষ্টি, রসালো এবং আকর্ষণীয় রঙের হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা বেশ ভালো। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ফেনী এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ আখ সরবরাহ করা হয়। মৌসুম এলেই পাইকাররা সরাসরি মাঠে এসে আখ কিনে নেওয়ায় বিপণনে কৃষকদের তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না।

আখচাষি ওসমান গনি জানান, এক একর জমিতে আখ চাষে যে ব্যয় হয়, বাজারমূল্য ভালো থাকলে তা থেকে কয়েক গুণ বেশি আয় করা সম্ভব। চন্দনাইশের রংবিলাসসহ বিভিন্ন জাতের আখ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে এখন সারা দেশে সরবরাহ হচ্ছে। এছাড়া আমরা আখের সারির মাঝখানে পেঁয়াজ, রসুন, মুলা, বাঁধাকপি, ফুলকপি ও বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করে অতিরিক্ত আয় করে থাকি। এতে উৎপাদন ব্যয় সহজেই উঠে আসে এবং আখ বিক্রির অর্থ প্রায় পুরোটাই লাভে পরিণত হয়।

হাশিমপুরের নাসির মোহাম্মদ পাড়ার কৃষক দেলোয়ার বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করায় ফলনও আগের তুলনায় বেড়েছে। উন্নত বীজ, সময়মতো পরিচর্যা এবং রোগবালাই দমনে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে রংবিলাস জাতের আখ চাষে সাফল্য মিলছে। ঢাকা এবং চট্টগ্রাম থেকে পাইকাররা এসে ক্ষেত থেকে পাইকারি দামে আখ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। তারা এই আখ সারা দেশে সরবরাহ করে।

হাশিমপুর ব্লকের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা রূপায়ন চৌধুরী বলেন, হাশিমপুর ব্লকের বরুমতি খালের দুপাশের চরের মাটি আখ চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এই এলাকার অধিকাংশ কৃষক আখ চাষের ওপর নির্ভরশীল। আমরা সব সময় তাদেরকে রোগবালাই এবং পরিচর্যার বিষয়ে সব পরামর্শ দিয়ে থাকি। আগে বিভিন্ন জাতের আখের চাষ করলেও এখন রংবিলাসের দিকে ঝুঁকছেন চাষিরা।

চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আজাদ হোসেন জানান, এবার চন্দনাইশে আখের আবাদ হয়েছে ১৩৭ হেক্টর জমিতে এবং লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩৫ হেক্টর। তন্মধ্যে ৮০ শতাংশ রংবিলাস, বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য জাতের আখ চাষ হয়েছে চন্দনাইশে। চন্দনাইশের মাটি ও জলবায়ু রংবিলাস জাতের আখ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রতিবছরই এ জাতের আখের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, উন্নত সেচব্যবস্থা এবং বাজারজাতকরণে সরকারি সহায়তা আরও জোরদার করা গেলে রংবিলাস জাতের আখ দেশের বাণিজ্যিক কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশেও এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

লাভজনক এই ফসলকে ঘিরে চন্দনাইশের কৃষকদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি। অনেকের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে রংবিলাস জাতের আখই হতে পারে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির নতুন শক্তি।