চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) এলাকাটি আবারও খবরের শিরোনামে। তবে কোনো উৎসব বা ঐতিহ্যের সংবাদের জন্য নয়, বরং এই প্রাণপ্রাচুর্যে ঘেরা পাহাড়-অরণ্যের বুকে বেসরকারি হাসপাতাল নির্মাণের এক হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে। গত সরকারের আমলে ২০২১ সালেও জনগণের তীব্র আন্দোলনের মুখে যে প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল, ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই একই উদ্যোগের পুনর্জাগরণ কেবল বিস্ময়করই নয়, বরং চট্টগ্রামের মানুষের আবেগ ও পরিবেশের প্রতি চরম অবজ্ঞা।
সিআরবি কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়; এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। শতবর্ষী রেইনট্রি, বিচিত্র প্রজাতির পাখি এবং পাহাড়ঘেরা এই অঞ্চলটি এই ইট-পাথরের নগরে একমাত্র প্রশ্বাসের জায়গা। এখানে হাসপাতাল নির্মাণের যেকোনো উদ্যোগের অর্থ হলো: কয়েক হাজার গাছ কেটে ফেলার ফলে নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে এবং জীববৈচিত্র্য চিরতরে হারিয়ে যাবে। ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহ্যের স্মারক সিআরবি ভবনটি আধুনিক নির্মাণের চাপে তার গাম্ভীর্য হারাবে। পয়লা বৈশাখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মিলনমেলা যা সিআরবির শিরীষতলায় অনুষ্ঠিত হয়, তা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে।
২০২১ সালে যখন প্রথম এই হাসপাতাল নির্মাণের চুক্তি হয়েছিল, তখন চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ—লেখক, বুদ্ধিজীবী, পরিবেশবাদী থেকে শুরু করে আপামর জনতা—একতাবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। দীর্ঘ আন্দোলনের পর তৎকালীন সরকার জনদাবির কাছে নতি স্বীকার করে প্রকল্পটি বাতিল করে। সেই জয় ছিল প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের। কিন্তু এখন প্রশ্ন জাগে, সেই একই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আবার কেন ফিরে আসছে? চট্টগ্রামের মানুষ কি তবে তাদের সবচেয়ে প্রিয় সবুজ প্রান্তরটিকে রক্ষা করতে প্রতিবারই রাজপথে জীবন বাজি রাখতে হবে?
একটি বেসরকারি হাসপাতাল অবশ্যই জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তা কেন একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা ঐতিহ্যবাহী স্থানেই হতে হবে? চট্টগ্রামে হাসপাতালের জন্য বিকল্প অনেক সরকারি জায়গা পড়ে আছে। অথচ সেই দিকে নজর না দিয়ে সবুজের বুক চিরে দালান গড়ার এই জেদ কোনোভাবেই কল্যাণকামী রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের ভাষা পড়ার সময় এসেছে। চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ এবং বুদ্ধিজীবীরা ইতিমধ্যেই রাজপথে নেমেছেন। তাদের দাবি পরিষ্কার—সিআরবি থেকে সরিয়ে হাসপাতাল অন্য কোথাও নেওয়া হোক। সিআরবিকে ঘোষণা করা হোক ‘জাতীয় ঐতিহ্য’ এবং একে একটি কার্যকর সংরক্ষিত উদ্যান হিসেবে গড়ে তোলা হোক।
আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাই, অবিলম্বে এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করা হোক। চট্টগ্রামের মানুষের ফুসফুসকে পিষে ফেলার এই অপচেষ্টা বন্ধ না করলে জনরোষ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের প্রাণের স্পন্দন দালানকোঠায় নয়, বরং ওই শিরীষতলার ছায়াতেই নিহিত।
এ মুহূর্তের সংবাদ



















































