বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬
এ মুহূর্তের সংবাদ

একদিকে দুর্বিষহ গরম অন্যদিকে লোডশেডিং নগরবাসী মুক্তি পাবে কবে

চৈত্রের দাবদাহ আর বৈশাখের গুমোট গরমে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জনজীবন এখন ওষ্ঠাগত। পাহাড়, নদী আর সমুদ্রবেষ্টিত এই জনপদে একসময় যে শীতল হাওয়ার পরশ পাওয়া যেত, নগরায়ণ আর বৃক্ষনিধনের ফলে আজ তা কেবলই স্মৃতি। বর্তমানে থার্মোমিটারের পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর স্পর্শ করছে। এই চরম তাপদাহে যখন নগরবাসীর নাভিশ্বাস উঠছে, ঠিক তখনই মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে অসহনীয় লোডশেডিং। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার প্রাণকেন্দ্র এই বাণিজ্যিক রাজধানীতে বিদ্যুতের এই লুকোচুরি খেলা এখন সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে।
চট্টগ্রামের সরু গলি থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকা—সর্বত্রই এখন হাহাকার। বহদ্দারহাট, চকবাজার, জিইসি মোড় কিংবা আগ্রাবাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা ভয়াবহ। প্রচণ্ড গরমে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। নগরের হাসপাতালগুলোতে ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। চমেক হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে বিদ্যুতের অভাবে জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলা দীর্ঘমেয়াদী লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে, যা শ্রমজীবী মানুষের কর্মদক্ষতা কমিয়ে দিচ্ছে।
দেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ডখ্যাত চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য এখন লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে ধুঁকছে। খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের মতো পাইকারি বাজারে বিদ্যুতের অভাবে পণ্য খালাস ও সংরক্ষণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কলকারখানাগুলোতে উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক খাত, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস, তা-ও এই সংকটে বিপর্যস্ত। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের পকেটে। ছোট ছোট দোকানদার কিংবা ফ্রিল্যান্সারদের জীবন যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও কেন এই নগরীকে এমন অন্ধকারের গহ্বরে নিমজ্জিত হতে হচ্ছে, তা এক বড় প্রশ্ন। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের দোহাই দিয়ে চট্টগ্রামের মানুষকে দিনের বড় একটা সময় অন্ধকারে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে রমজান পরবর্তী এই সময়ে মানুষের দৈনন্দিন রুটিন তছনছ হয়ে গেছে। অনেক এলাকায় পানি সরবরাহের পাম্পগুলো বিদ্যুতের অভাবে ঠিকমতো না চলায় তীব্র পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। ফলে গরম, অন্ধকার আর পানির অভাব—এই ত্রিমুখী কষ্টে নগরবাসী দিশেহারা।
চট্টগ্রামের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জোনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই সংকট নিরসনে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কয়লা নিশ্চিত করতে জরুরি বরাদ্দ দিতে হবে। লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের গুরুত্ব বিবেচনা করে এর বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং শহর ও গ্রামের মধ্যে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। জরাজীর্ণ ট্রান্সফরমার ও ফিডার লাইনগুলোর দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন যাতে লোডশেডিংয়ের ওপর বাড়তি ‘টেকনিক্যাল বিভ্রাট’ যোগ না হয়।

বন্দরনগরীর মানুষ এমনিতেই যানজট আর জলাবদ্ধতার মতো নিত্য সমস্যায় জর্জরিত। তার ওপর এই আগুনের মতো গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। চট্টগ্রামের মানুষ কেবল বাণিজ্যিক উন্নয়ন চায় না, তারা চায় ন্যূনতম স্বস্তিতে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের আকুল আবেদন—বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এই দুঃসহ অধ্যায় বন্ধ করে জনজীবনে প্রশান্তি ফিরিয়ে আনুন।