বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৩, ২০২৬
টপ নিউজ

সুইডেন যাচ্ছেন মন্ত্রীর পিএস-কর্মকর্তা!

রোলার চালানোর প্রশিক্ষণ

দরপত্রের চুক্তিতে স্পষ্টভাবে প্রশিক্ষণের শর্ত উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেই শর্তের ব্যতয় ঘটিয়ে বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন কর্মকর্তারা।

নিজস্ব প্রতিবেদক »

নিয়মবহির্ভূতভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ডাবল ড্রাম রোড রোলারের অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স প্রশিক্ষণের জন্য সুইডেন যাচ্ছেন চসিক সচিব ও মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিবসহ পাঁচ কর্মকর্তা।

-advertise-

আগামী ২৫ জুলাই তারা এই ভ্রমণ করবেন| যন্ত্রপাতি কেনার সংরক্ষিত দরপত্রের চুক্তিপত্র এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের বিদেশ সফর অনুমোদনপত্র পর্যালোচনা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, চালক ও যান্ত্রিক কর্মকর্তাদের এই প্রশিক্ষণে সচিব ও মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিবের অংশ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। আবার চুক্তি অনুযায়ী মেশিন সরবরাহের সাত দিনের মধ্যে কর্মস্থলে (চট্টগ্রাম) একদিনের প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও ছয় মাস পর ১০ দিনের প্রশিক্ষণে সুইডেনে পাঠানোর বিষয়টিও নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একাধিক আইনের লঙ্ঘন।

চুক্তিতে যা ছিল

চসিকের আড়াই হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি ডাবল ড্রাম রোড রোলার কেনার কার্যাদেশ ২০২৫ সালের ৩ জুলাই পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরকার কবির আহমেদ। দরপত্র চুক্তির ১২ নম্বর শর্ত অনুযায়ী, মেশিন সরবরাহের সাত দিনের মধ্যে কর্মস্থলে একজন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার (মেকানিক্যাল) ও প্রতিটি যন্ত্রের জন্য একজন চালককে মাত্র একদিনের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (কিউ অ্যান্ড এম) প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা। একই চুক্তিতে উৎপাদনকারী দেশ থেকে মেশিন পাঠানোর আগেই ক্রেতা কর্তৃপক্ষের মনোনীত তিনজন কারিগরি কর্মকর্তার প্রি-শিপমেন্ট পরিদর্শনের বাধ্যবাধকতাও ছিল।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি যন্ত্রপাতি দেশে আসে এবং ৯ জানুয়ারি তা সিটি করপোরেশনের দামপাড়া সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে আনা হয়। অথচ মেশিন সরবরাহের ছয় মাস পর পাঁচ কর্মকর্তাকে সুইডেনে পাঠানো হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদনপত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সাত দিনের জন্য সুইডেন সফরের একটি অনুমোদন জারি করা হয়েছিল। অন্তর্বতীকালীন সরকারের সময় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে কড়াকড়ি থাকায় তখন তাঁরা যেতে পারেননি। পরে সেই অনুমোদন প্রতিস্থাপন করে ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্টে নতুন করে অনুমোদন দেওয়া হয়।

সুইডেনে যাচ্ছেন যাঁরা

গত ৬ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগের জারি করা সংশোধিত অনুমোদনপত্র অনুযায়ী, ২৫ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত ১০ দিনের জন্য সুইডেন যাচ্ছেন পাঁচ কর্মকর্তা| তাঁরা হলেন-স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব মো. মনিরুজ্জামান, চসিক সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশিকুল ইসলাম এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইমরান হোছাইন খোকা।

এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর জারি করা অনুমোদনপত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. আব্দুর রহমানের নাম ছিল| পরে একই নম্বর ও তারিখের চিঠির পরিবর্তে নতুন আদেশ জারি করে তাঁর পরিবর্তে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে সফরের মেয়াদ সাত দিন থেকে বাড়িয়ে করা হয় ১০ দিন। আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সফরের সব ব্যয় বহন করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরকার কবির আহমেদ।

আইন কী বলছে

আইন ও বিধিমালা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এই বিদেশ সফর কেবল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) ও দরপত্রের শর্তেরই সরাসরি লঙ্ঘন নয়, বরং এটি একাধিক সরকারি আইনের স্পষ্ট ব্যত্যয়।

দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ১৯৪৭-এর ৫(১) (ডি) ধারায় বলা হয়েছেত্মকোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি নিজের পদের ক্ষমতা অপব্যবহার করে, অসদুপায় অবলম্বন করে কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের বা অন্য কারও জন্য কোনো আর্থিক সুবিধা বা মূল্যবান বস্তু হাসিল করেন বা করার চেষ্টা করেন, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা দায়িত্বে আসতে যাচ্ছেন এমন ব্যক্তি যদি তাঁর বৈধ পারিশ্রমিকের বাইরে গিয়ে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে যেকোনো প্রকারের অনৈতিক সুবিধা বা উপহার গ্রহণ করেন বা গ্রহণের চেষ্টা করেন তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইন অনুযায়ী, এই ‘উপহার বা সুবিধা’ কেবল নগদ টাকাই নয়, বরং যেকোনো ধরনের বস্তুগত বা আতিথেয়তামূলক সুবিধাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। কোনো দাপ্তরিক সুবিধার বিনিময়ে বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আতিথেয়তায় এই ধরণের সুবিধা গ্রহণ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার আইনি বিধান রয়েছে।

এছাড়া সরকারি কেনাকাটা ও চুক্তি বাস্তবায়নে দুর্নীতি ঠেকাতে প্রণীত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর ৬৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দরপত্র বাস্তবায়নকালে কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনৈতিক সুবিধা, চক্রান্ত বা দুর্নীতির আশ্রয় নিতে পারেন না। উক্ত ধারার স্পষ্ট নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের খরচে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর কেবল নিয়মবহির্ভূতই নয়, বরং ফৌজদারী অপরাধের সামিল।

আইনের ৬৪ (৩) ও ৬৪(৪) ধারা মতে, এই ধরণের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী অসদাচরণ ও দুর্নীতির দায়ে বিভাগীয় শাস্তির পাশাপাশি দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা এবং ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭’-এর অধীনে সরাসরি ফৌজদারী মামলা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে| একইসাথে, বিধি বহির্ভূতভাবে কর্মকর্তাদের আতিথেয়তা প্রদান করে চুক্তির মৌলিক শর্ত ভঙ্গ করায় উক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিলসহ তাকে সকল সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে কালো তালিকাভুক্ত করার স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তাদের বিলাস ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করছে সরকার

গত জুনেও একবার বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য চসিক মেয়র ও কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র সফরের একটি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান| সেই প্রস্তাবে বিদেশ সফরের কোনো শর্ত না থাকলেও তা আটকে দেওয়া হয়েছিল, অথচ রোড রোলার চালানো শেখার এই সফরে যাচ্ছেন একই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।

সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর কমাতে অন্তর্বর&তী সরকার অন্তত চারবার সফর নিরুৎসাহিতকরণ-সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেছে। এর আগে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারও মেয়াদের শেষ দিকে ডলার-সংকট ও কৃচ্ছ্রসাধনের কারণে বিদেশ সফরে কিছু বিধিনিষেধ জারি করেছিল| পরবর্তী সময়ে অন্তর্বতী সরকার ২০২৪ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের মার্চ, জুলাই ও অক্টোবরেও বিদেশ সফর-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে।

কে কী বলছেন

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তারা কল রিসিভ করেননি।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) মো. মনিরুজ্জামানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে ব্যস্ততার বিষয় জানিয়ে পরে কথা বলতে অনুরোধ করেন। কিন্তু প্রায় ৪৫ মিনিট পরে আবার যোগাযোগ করা হলে তখন আর ফোন রিসিভ করেনন।

এছাড়া প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশিকুল ইসলাম এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মুহাম্মদ ইমরান হোছাইন খোকার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা কেউ-ই ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্যে নাগরিক-সুজনের চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির কবীর চৌধুরী বলেন, ‘সম্প্রতি মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য সিটি মেয়র ও কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তাবটি খোদ প্রধানমন্ত্রী নাকচ করে দিয়েছিলেন। এখন আবার রোড রোলার চালাতে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে যাওয়াটা কতটা যৌক্তিক, তারা কি এসে রোড রোলার চালাবেন? তাছাড়া ঠিকাদারের টাকায় বিদেশ সফর মানে তো সেই টাকাটা ঠিকাদার পরোক্ষভাবে তার কাজের মাধ্যমে আদায় করে নেবেন। আর এটা সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই না।’