ফিচার শিল্প-সাহিত্য

বিমল মিত্র : বাংলা সাহিত্যের ব্যতিক্রমী এক কথাশিল্পী

এস ডি সুব্রত »

বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী এক কথাশিল্পী বিমল মিত্র। বিমল মিত্র যে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একজন বিরল ব্যক্তিত্ব এবং যুগ পুরুষ, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। রবীন্দ্রোত্তর সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নাম অমর হয়ে আছে। এর প্রধান কারণ, তাঁর সাহিত্যকীর্তি। তিনি বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। বিমল মিত্র শুধু একজন সাহিত্যপ্রেমিক বা এক অসাধারণ প্রতিভাময় সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন রবীন্দ্রোত্তর যুগে সাহিত্যের চালিকাশক্তি। ভারতের প্রাক স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা উত্তর এই দুই যুগের সাহিত্যিক হিসেবে একজন যুগপুরুষ। কেন তাঁকে যুগ পুরুষ বলছি, তার কারণ তিনি শহর জীবনের কথা ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এতো সুন্দর ও নিবিড় ভাবে গেঁথেছেন, তাঁর আগে কোনও সাহিত্যে এ ধরনের কাজ হয়েছে কিনা তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে ।
বিমল মিত্র জনপ্রিয় বাঙালি ঔপন্যাসিক। তিনি ১৯১২ সালের ১৮ মার্চ বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা নদীয়া জেলার হাঁসখালি থানার এক প্রত্যন্ত গ্রাম ফাতেপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সতীশচন্দ্র মিত্র আর মাতা সুরঞ্জনা দেবী। তিনি বাংলা ও হিন্দি উভয় ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। তার প্রথম উপন্যাস ‘ছাই’। ‘সাহেব বিবি গোলাম’ উপন্যাস তার অন্যতম গ্রন্থ। ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ গ্রন্থের জন্য ১৯৬৪ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর এত জনপ্রিয়তা সম্ভবত আর কোনো সাহিত্যিক অর্জন করতে পারেননি। বিমল মিত্র তাঁর অসাধারণ লেখনী শক্তির প্রয়োগে তিনশো বছরের ভারতের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ঘটনাকে সাহিত্যের আঙ্গিকে একাধিক চরিত্রের মাধ্যমে সৃজিত করেছেন এবং তা দর্শক ও পাঠকদের সামনে প্রাঞ্জল ভাবে প্রস্তুত করেছেন। এটা কিন্তু খুব সহজ কাজ নয়। ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যের সুনিপুণ মেলবন্ধনে সজীব করে তোলা অত্যন্ত দুরূহ কীর্তি। সাহিত্যের স্রোত অন্য ধারায় প্রভাহিত করতে ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর সাহিত্যিকরা যখন ব্যস্ত এবং মাটির কাছাকাছি থাকা তিন বন্দ্যোপাধ্যায় -বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক যখন খ্যাতির শীর্ষে ঠিক তখনই মাটির গন্ধ মেখে বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় কথাশিল্পী বিমল মিত্রের আবির্ভাব। আশুতোষ কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে রেলে চাকরি। রেলে চাকরি করতে করতে সাহিত্যচর্চা। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ছাই।
পঞ্চাশের গোড়ায় বন্ধু সাগরময় ঘোষের আগ্রহে ধারাবাহিক ‘সাহেব বিবি গোলাম’ লিখে আলোড়ন তুলেছিলেন। তার লেখার মাধ্যম ছিল ছোটগল্প, উপন্যাস। উপন্যাস রচনায় তিনি এতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, ঈর্ষান্বিত হয়ে আরো বেশ ক’জন নকল লেখক বিমল নামে উপন্যাস রচনা করতে থাকে। তার নামে অন্তত ২০০টি বই বেরিয়েছিল যে বইগুলোর লেখক আদৌ তিনি নন। বাধ্য হয়ে তাকে বিশেষ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঘোষণা করতে হয়েছিল যে, একমাত্র ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ ছাড়া সব উপন্যাসে তার নিজের সই আছে। এই উপন্যাসের জন্যই তিনি পেয়েছিলেন রবীন্দ্র পুরস্কার। ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ যখন ধারাবাহিক হিসেবে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল তখন বইয়ের স্টলে দাঁড়িয়ে মানুষ সেই উপন্যাস পড়ে নিত, এমনই ছিল এর জনপ্রিয়তা। তার গল্প বা উপন্যাস ভারতের যতগুলো ভাষায় অনূদিত হয়েছিল একমাত্র শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছাড়া আর কোনো লেখকেরই সৃষ্টি অতগুলো ভাষায় অনূদিত হয়নি। তার রচিত উপন্যাসগুলো হচ্ছে- ‘ছাই’, ‘একক দশক শতক’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, ‘বেগম মেরী বিশ্বাস’, ‘চলো কলকাতা’, ‘পতি পরম গুরু’, ‘এই নরদেহ’, ‘এরই নাম সংসার’, ‘মালা’, ‘দেওয়া নেওয়া’, ‘তোমরা দুজনে মিলে’, ‘গুলমোহর’, ‘যা দেবী’, ‘আসামী হাজির’। নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘সত্যিই আমার কিছু হয়নি। অবশ্য তা নিয়ে আমি দুঃখও করি না। কারণ জীবনে যে কিছু হতেই হবে তারই বা কী মানে আছে। তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় চেতলা স্কুলে। তার পরে আশুতোষ কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পিতা সতীশচন্দ্র মিত্র ফতেপুরের বাসিন্দা হলেও কর্মসূত্রে তিনি কলকাতা ও তার বাইরে থাকতেন। গ্রামের জমিজমা, ফলের বাগান দেখাশুনা করতে বছরে কয়েকবার তাঁর বাবকে সপরিবারে এখানে আসতে হত। এভাবে বাবার সাথে যাতায়াত করে পৈতৃক গ্রামের প্রতি শৈশব থেকেই তাঁর নাড়ীর টান দৃঢ় হাতে থাকে। এভাবেই ফতেপুরের মাঠ, ঘাট আর জন জীবন তাঁর নখদর্পণ হয়ে গিয়েছিল। তারই ফল স্বরূপ তাঁর বিখ্যাত কালোত্তীর্ণ উপন্যাস ‘সাহেব বিবি গোলাম’। পরাধীন সমাজ ব্যবস্থা এবং সরল গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে শহরে কৃত্রিমতার তারতম্য এই উপন্যাসটিতে তিনি নিপুণতাভাবে গ্রন্থিত করেছেন ‘সাহেব বিবি গোলাম’ সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। কয়েক কিস্তি প্রকাশের পরপরই নিন্দুকেরা অপপ্রচার, কুৎসাভরা চিঠি এমন কি প্রাণনাশের হুমকিও তিনি পেয়েছেন। আর তিনি ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বসে নির্বিকার সাধকের মত এই উপন্যাসের পরবর্তী কিস্তিগুলি লিখে গেছেন। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার পর এটিই আবার বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।‘দেশ সম্পাদক সাগরময় ঘোষ উচ্ছসিত প্রশংসা করে’ বলেছিলেন ‘আমার ধারনা এ গ্রন্থ একটি কালোত্তীর্ণ ক্লাসিক । এ ধরনের উপন্যাস একশো বছরে মাত্র একটি রচিত হওয়ায় যথেষ্ট।’ প্রায় পাঁচশোটি গল্প ও শতাধিক উপন্যাসের লেখক বিমল মিত্র। এছাড়াও বহু পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেন। তাঁর রচনা ভারতের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার হিসাবে তিনি ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন।
বিমল মিত্র ছিলেন লেখক হিসাবে অন্তর্মুখী, জেদ আবার রসিক প্রকৃতির। কোনো প্রকাশ্য সাহিত্য সভায় কিংবা সংবর্ধনা অনুষ্ঠান যাওয়া একদম পছন্দ করতেন না। নিজের সম্পর্কে বিমল মিত্র নিজেই মূল্যায়ন করেছেন এভাবে “ৃসত্যিই আমার কিছু হয়নি। অবশ্য তা নিয়ে আমি দুঃখও করি না। কারণ জীবনে যে কিছু হতেই হবে তারই বা কী মানে আছে। আকাশের আকাশ হওয়া কিংবা সমুদ্রের সমুদ্র হওয়াটাই তো যথেষ্ট। লেখক আমি হতে না-ই বা পারলাম, মূলতঃ আমি একজন মানুষ। মানুষ হওয়াটাই তো আমার কাছে যথেষ্ট ছিল। কারণ তরুলতা অরি সহজেই তরুলতা, পশু-পাখি অতি সহজেই পশু-পাখি, কিন্তু মানুষ অনেক কষ্টে অনেক দুঃখে অনেক যন্ত্রণায় অনেক সাধনায় আর অনেক তপস্যায় তবে মানুষ। আমি কি সেই মানুষই হতে পেরেছি?” ১৯৯১ সালের ২ ডিসেম্বর দক্ষিন কোলকাতার চেতলার নিজ বাড়ীতে মৃত্যুবরণ করেন বিমল মিত্র। তাঁর চেতলার বাড়িতেই এখন একটি সংগ্রহশালা ও আর্ট গ্যালারি গড়ে উঠেছে।