চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা নিরসন জরুরি

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘প্রবেশদ্বার’ এবং সার্বভৌমত্বের অন্যতম প্রতীক। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী এই বন্দরকে ঘিরে বর্তমানে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয় বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী। বিশেষ করে, বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলো বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে যে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট চলছে, তা দেশের সরবরাহ চেইনকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে।
বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে বিদেশি বিনিয়োগ বা আধুনিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন দেশের মালিকানাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে। আন্দোলনকারীদের মূল আশঙ্কা হলো, গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল অংশ বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দিলে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হারাবে দেশ, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হতে পারে। একটি কৌশলগত সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অভাব এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের আস্থায় না নিয়ে ইজারা দেওয়ার একতরফা সিদ্ধান্তই আজ এই সংঘাতের পথ প্রশস্ত করেছে।
অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ফলে বন্দরে কন্টেইনার জট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর প্রভাব বহুমুখী: তৈরি পোশাক শিল্পের শিপমেন্ট বাতিল হচ্ছে, ফলে বিদেশি ক্রেতারা আস্থা হারাচ্ছেন। রমজান ও পরবর্তী সময়ের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কাঁচামাল খালাস আটকে যাওয়ায় বাজারে অগ্নিমূল্য দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। সময়মতো রপ্তানি আয় না এলে ডলার সংকটে থাকা দেশের অর্থনীতি আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।
জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। একদিকে বন্দরকে সচল রাখা যেমন জরুরি, তেমনি বন্দর ব্যবহারকারী এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি ও শঙ্কাকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ইজারা চুক্তির শর্তাবলি জনসমক্ষে স্পষ্ট করা এবং দেশীয় স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পেশিশক্তি বা একগুয়েমি দিয়ে বন্দর সচল করা সম্ভব হলেও, তাতে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প স্থিতি বজায় থাকবে না।
চট্টগ্রাম বন্দর কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের টিকে থাকার ভিত্তি। ধর্মঘট যত দীর্ঘ হবে, অর্থনীতির ক্ষত তত গভীর হবে। তাই অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে ফলপ্রসূ সংলাপে বসতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক মূল অগ্রাধিকার। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অচলাবস্থা নিরসন করে বন্দরের চাকা সচল করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।