বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৩, ২০২৬
শৈল-সৈকত ও দেশগ্রাম

একসময় ক্ষমতার কেন্দ্র, এখন ভবঘুরের আস্তানা

বাঁশখালী প্রতিনিধি >>

একসময় যেখানে ছিল ক্ষমতার দাপট, নেতাকর্মীদের সরব আনাগোনা, সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—আজ সেখানেই নীরবতা। ক্ষমতার পালাবদলের পর বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সেই কার্যালয় এখন পরিত্যক্ত। ভবনের ভেতরে ময়লা-আবর্জনা, ভাঙা কাচ, মলমূত্র ও পোড়া দাগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে সেখানে ভবঘুরে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে। আর একসময়ের জনসভার মাঠ এখন ব্যবহৃত হচ্ছে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা হিসেবে।

---------

সরেজমিনে দেখা যায়, কার্যালয়ের মাঠজুড়ে ডজনখানেক মাইক্রোবাস পার্ক করা। বারান্দায় কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীদের আনাগোনা। ভবনের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে পরিত্যক্ত বোতল, কাপড়চোপড় ও নানা আবর্জনা। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মলমূত্র। দুর্গন্ধে ভেতরে প্রবেশ করাও কঠিন। দ্বিতীয় তলায় ভাঙা কাঁচ পড়ে আছে। সিঁড়ির রেলিং ক্ষতিগ্রস্ত। অগ্নিসংযোগের কারণে দেয়ালে পোড়া দাগ ও কালো ছোপ দেখা যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনতলা বিশিষ্ট বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি উদ্বোধন করেন। নিচতলা ‘বঙ্গবন্ধু হল’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দ্বিতীয় তলায় নিয়মিত অফিস করতেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। তখন কার্যালয়টিতে নেতাকর্মীদের নিয়মিত আনাগোনা ছিল। বিভিন্ন সময়ে সেখানে মিছিল, সভা ও সমাবেশও অনুষ্ঠিত হতো।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কার্যালয়টিতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। মাঠে থাকা শহীদ মিনার ছাড়া ভবনের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। এরপর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আর কার্যালয়ে দেখা যায়নি বলে স্থানীয়রা জানান।

স্থানীয়দের ভাষ্য, চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি সেখানে জাতীয় পতাকা ও ব্যানার উত্তোলন করেন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও কিছুক্ষণ পর পতাকা ও ব্যানার আর দেখা যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত হলে কার্যালয়ে মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে। ভবঘুরে যুবকদের কেউ কেউ সেখানে বিছানা পেতে রাতযাপন করেন। ফলে একসময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু থাকা ভবনটি এখন কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

কার্যালয়ের বারান্দায় কথা হয় পাঠাও কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যান সাগর মাহমুদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর এখানে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীর পদচারণা নেই। তাই আমরা মালামাল ডেলিভারির কাজে এই অফিসটি ব্যবহার করছি। কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়িতে মালামাল আসার পর এখানে আনলোড করি। পরে সেগুলো গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিই।’

কার্যালয়ের মাঠে মাইক্রোবাস পার্কিং করে রাখা চালক শাহাব উদ্দিন বলেন, আগে এই মাঠেই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সভা-সমাবেশ হতো। এখন গাড়ি রাখার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

অন্য পাশে একটি অ্যাম্বুলেন্সে ঘুমাচ্ছিলেন চালক মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘আমরা এখান থেকেই যাত্রীদের কাছ থেকে অর্ডার নিই। কেউ ফোন করলে গন্তব্যে চলে যাই। সারারাত গাড়ি চালিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। এখানে গাড়ি পার্কিং করলে কোনো ভাড়া দিতে হয় না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘এই অফিস জনগণের টাকা লুটপাট করে তৈরি করা হয়েছে। এখন জনস্বার্থে এটি সরকারি কোনো দপ্তরের স্থাপনা হিসেবে ব্যবহার করা হোক।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য জাওয়াদুল করিম বলেন, ‘স্বৈরাচারী হাসিনার দল আওয়ামী লীগের এই অফিস বহু অপকর্মের সাক্ষী। পুড়িয়ে দেওয়া ধ্বংসাবশেষ দেখে অন্তত অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এখান থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। এই ধ্বংসস্তূপ আমাদের শিক্ষা নেওয়ার বার্তা দিয়ে গেছে।’

বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলেন, ‘নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের ওই কার্যালয়ে রাতে অসামাজিক কার্যকলাপের বিষয়টি নিয়ে কেউ আমাদের কাছে আজ পর্যন্ত অভিযোগ করেনি। আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

একসময় যে কার্যালয় ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র, আজ সেটিই পড়ে আছে ভাঙচুর আর অব্যবস্থাপনার চিহ্ন নিয়ে। ক্ষমতার দাপট, নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি ও সভা-সমাবেশের সেই দিনগুলো এখন অতীত। সময়ের পালাবদলে কার্যালয়টির বর্তমান চিত্র যেন ক্ষমতার অপব্যবহারের পরিণতি ও রাজনীতিতে স্থায়িত্বহীনতার এক প্রতীকী উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।