বরাদ্দের বৈষম্যে জলাতঙ্ক টিকা

আজ বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস

নিলা চাকমা »

হাতে গামছা পেঁচিয়ে ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এলেন ষাটোর্ধ্ব নুরী বেগম। কুকুরের কামড়ে তাঁর হাত থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে। ফটিকছড়ি থেকে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। চিকিৎসক দেখানোর পর অ্যান্টি র‌্যাবিজ ভ্যাকসিন (এআরভি) টিকা দেওয়া হয়। কিন্ত ব্যয়বহুল ইকুইন রেবিস ইমিউগ্লোবুলিন (ইআরআইজি) টিকাটি পাওয়া গেল না। বাইরে থেকে বাড়তি টাকা খরচ করে টিকাটি দেওয়া হয় নুরী বেগমকে। হাসপাতালগুলোর এ যেন এক নিয়মিত চিত্র। টিকার মজুদ না থাকায় বেশির ভাগ রোগী এই টিকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নুরী বেগমের ছেলে জয়নাল বলেন, ‘গতকাল (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ৭টার দিকে আমার মাকে কুকুরে কামড়ায়। ফটিছড়ির স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হলে তাঁকে আবার এখানে পাঠানো হয়। হাসপাতালে এলে চিকিৎসকেরা বললেন টিকা নিয়ে আসতে। ধারণা করেছিলাম টিকাটি ২-৩শ’ টাকার কী বেশি হবে?। কিন্ত দাম নিল ১ হাজার টাকা। টিকাটি আরও ৩-৪ বার দিতে হবে। আমরা গরিব। এত টাকা কোথায় পাবো! হাসপাতাল থেকেই টিকাটি পাওয়া গেলে খুব ভালো হয়।’

জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত পশুর কামড়ে ৮ হাজার ৪২৮ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তার মধ্যে কুকুরের কামড়ে আহতের সংখ্যা ৪ হাজার ২৫ জন, অন্য পশুর কামড়ে আহতের সংখ্যা ৪ হাজার ৪০৩ জন। হাসপাতালটি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত এআরভি টিকা বরাদ্দ পেয়েছে ৫ হাজার ২৩০টি, ইআরআইজি পেয়েছে মাত্র ৪৫০টি। জেনারেল হাসপাতাল ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস-এ (বিআইটিআইডি) এ রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয়। অন্য কোনো সরকারি হাসপাতালে এ সেবা নেই। জেনারেল হাসপাতালে শুধু আউডডোর সেবা এবং টিকা দেয়া হয়। বিআইটিআইডিতে রোগীভর্তি করানো এবং একই সাথে টিকাও দেয়া হয়। বিআইটিআইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে ৬ জন, ২০২১ সালে ৩ জন এবং ২০২২ সালে ২ জলাতঙ্ক রোগী চিকিৎসা নেন।

কুকুর বা অন্য পশু কামড় দিলেই টিকা দিতে হয় না। ঠিক কখন টিকা দেয়া জরুরি, এ নিয়ে কথা বললেন জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মোর্শেদ আলী। তিনি বলেন, যেকোনো প্রাণী কামড়ালেই প্রথমে বাংলা সাবান দিয়ে ক্ষতস্থান ৩০ মিনিট ধরে ধুতে হবে। তারপর চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসতে হবে। আক্রান্তদের আমরা তিনভাবে চিকিৎসা দিই।

ক্যাটাগরি ১ : যাদের কুকুর বা অন্য প্রাণী কেটেছে, কিন্ত কোনো ক্ষত বা রক্ত ঝরেনি, তারা ক্যাটাগরি ১-এর রোগী। তাদের কোনো টিকার প্রয়োজন নেই। শুধু সাবান দিয়ে ক্ষতস্থানটি ধুয়ে ফেলতে হবে কিংবা এন্টিসেপটিক দ্রবণ দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

ক্যাটাগরি ২ : পশুতে কাটার পর যাদের শরীরে আঁচড় বা কামড়ানোর দাগ দেখা দেয়, অথচ রক্তপাত হয়নি, তারা ক্যাটাগরি-২ এর রোগী। এসব রোগীর ক্ষতস্থান তৎক্ষণাৎ পরিষ্কার করার পাশাপাশি জলাতঙ্ক টিকা নিতে হবে। এ টিকা চামড়ার নিচে কিংবা মাংসে দেয়া হয়। কুকুর আঁচড়ে বা কামড়ে দেয়ার পর ৫ দিনের মধ্যে টিকাটি নিলে ভালো হয়। তা না হলে জলাতঙ্ক রোগ হওয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ক্যাটাগরি ৩ : পশুর আঁচড় বা কামড়ে যদি রক্ত বের হয় এবং তা যদি বন্ধ না হয়, তারা ক্যাটাগরি-৩ এর রোগী। এসব রোগীদের ক্ষতস্থানটি দ্রুত পরিষ্কারের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এ ধরনের রোগীদের এআরভি ও ব্যয়বহুল ইআরআইজি টিকা নিতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালে ইআরআইজি টিকার সংকট আছে। অথচ এই টিকাটি ক্যাটাগরি : ৩ রোগীদের ৪-৫বারও দিতে হতে পারে। অনেক রোগী এই টিকাটি দুয়েকবার নিয়ে আর নেন না। যার কারণে জলাতঙ্ক রোগের ঝুঁকি থেকে যায়।

টিকার সংকট নিয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বী বলেন, ‘এই টিকাটি শুধুমাত্র ক্যাটাগরি-৩ রোগীদের লাগে। এটি সরকারিভাবে মাঝমাঝে অল্প পাঠায়। এটি বেশির ভাগ বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমাদের প্রতিষ্ঠানে দেয়া হয় না। আমরা দেয়ার জন্য যোগাযোগ করি। টিকাটি ব্যয়বহুল হওয়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকেও অনেক গরিব রোগীকে দেয়া হয়।’

এ প্রসঙ্গে আরও কথা হয় বিআইটিআইডি’র ক্লিনিক্যাল ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পশুর কামড় আক্রান্ত রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড রয়েছে আমাদের। এখানে সবধরনের চিকিৎসা এবং টিকা পর্যাপ্ত রয়েছে। কোনো সংকট নেই। তবে উপজেলা থেকে যেসব রোগী আসেন তাদের টিকা দিতে হিমশিম খেতে হয়। কারণ একজন ক্যাটাগরি-৩ রোগীকে ৪-৫ বার টিকা নিতে হয়। অনেক সময় তারা বাইরে থেকে প্রথম-দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে আসেন। কিন্ত তারা বলতে পারেন না কোন ডোজ দেয়া হয়েছে। প্রেসক্রিপশনে তা সঠিকভাবে লেখা হয় না।’

উল্লেখ্য, আজ (২৮ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। এবারে এ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জলাতঙ্কের অবসান, সকলে মিলে সমাধান’। কিন্তু এ বছর একই দিনে কয়েকটি দিবস থাকায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালন করা হয়।