বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড বলা হয় চট্টগ্রামকে। দেশের সিংহভাগ রাজস্ব আসে এই শহর থেকে, আর সেই অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাকতাই-খাতুনগঞ্জ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং তীব্র যানজটের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আজ এই বাণিজ্যিক রাজধানীর স্বাভাবিক গতি থমকে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ ও কোরবানিগঞ্জ এলাকার যানজট এখন কেবল ভোগান্তি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিদিন হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং ঠেলাগাড়ি এই এলাকায় যাতায়াত করে। অথচ রাস্তাগুলোর প্রশস্ততা গত কয়েক দশকে এক ইঞ্চিও বাড়েনি। উল্টো ফুটপাত দখল এবং যত্রতত্র ট্রাক পার্কিংয়ের ফলে সরু গলিগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে যে পণ্য খালাস করতে এক ঘণ্টা সময় লাগার কথা, সেখানে ব্যয় হচ্ছে পুরো দিন। এতে পরিবহন খরচ বাড়ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের মূল্যের ওপর। দেশের সাধারণ মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন চট্টগ্রামের এই পরিবহন অব্যবস্থাপনা সেই সংকটকে আরও উসকে দিচ্ছে।
চট্টগ্রামের এই যানজট সমস্যার পেছনে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ এবং ট্রাফিক পুলিশ—এই তিন সংস্থার মধ্যে কাজের কোনো যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায় না। ফ্লাইওভার নির্মিত হলেও তার সুফল ব্যবসায়িক কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছায়নি। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এলাকা হওয়ার পরও নৌপথকে মালামাল পরিবহনের জন্য কার্যকরভাবে ব্যবহার করার কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এছাড়া চাক্তাই খালের ওপর যত্রতত্র ব্রিজ এবং অবৈধ দখলের ফলে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা সামান্য বৃষ্টিতেই খাতুনগঞ্জকে ডুবিয়ে দিচ্ছে। ফলে যানজটের সাথে জলজট মিলে এক নরকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থেই ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাতুনগঞ্জ-চাকতাই এলাকার যানজট নিরসন করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বিশেষায়িত ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ এবং নদীপথের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে রাস্তা ও খাল উদ্ধার করতে হবে।
চট্টগ্রাম থমকে যাওয়া মানে বাংলাদেশের অর্থনীতি থমকে যাওয়া। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, কেবল ফ্লাইওভার বা বড় বড় দালান দিয়ে আধুনিক শহর হয় না; যদি না সেই শহরের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্রগুলো সচল থাকে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জেগে উঠবে এবং চট্টগ্রামের এই স্থবিরতা কাটাতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মতামত সম্পাদকীয়


















































