রাশেদ এইচ চৌধুরী »
বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমি নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত সমুদ্রের মাছ, গ্যাস, খনিজ সম্পদ কিংবা পর্যটনের কথা সামনে আসে। সমুদ্রসীমা অর্জনের পর বঙ্গোপসাগরের বিপুল সম্ভাবনা নিয়েও আমরা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করছি। কিন্তু সমুদ্রের অর্থনীতিকে শুধু সমুদ্র থেকে সম্পদ আহরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাটিই হয়তো আমরা দেখতে পাব না।
বিশ্বব্যাংক বা জাতিসংঘের সংজ্ঞায় ব্লু ইকোনমি হলো সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম রক্ষা করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো। সামুদ্রিক পরিবহন, বন্দর ও লজিস্টিকস আন্তর্জাতিকভাবে ব্লু ইকোনমির অন্যতম প্রধান ভিত্তি স্তম্ভ।
সমুদ্রকে অর্থনীতিতে রূপান্তর করার প্রথম অবকাঠামো হলো বন্দর। সমুদ্রপথে পণ্য আসবে, যাবে, শিল্পের কাঁচামাল পৌঁছাবে, তৈরি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে যাবে, জাহাজ আসবে, লজিস্টিকস তৈরি হবে, গড়ে উঠবে গুদাম ও বিতরণকেন্দ্র, বাড়বে মেরিটাইম সেবা। অর্থাৎ সমুদ্রকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই অর্থনীতির প্রথম দরজার নাম চট্টগ্রাম বন্দর। এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমিকে নতুন করে দেখা দরকার। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর শুধু বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর নয়। দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ ও বহির্গমন পথও এটি। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর বাংলাদেশের শিল্প, আমদানি-রফতানি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অংশই নির্ভরশীল। দেশের কনটেইনার কার্গোর প্রায় পুরোটাই এই বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা আসলে শুধু বন্দর কর্তৃপক্ষের দক্ষতার প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, রফতানি বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক দক্ষতার প্রশ্ন। তাই বাংলাদেশ যখন ‘ব্লু ইকোনমি’র কথা বলবে, তখন প্রথমেই আমাদের দেখতে হবে, সমুদ্রের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির সংযোগ কতটা কার্যকর। আর সেই সংযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা চট্টগ্রাম বন্দর।
ব্লু ইকোনমির ধারণাটি আসলে সমুদ্রের সম্পদ আহরণের চেয়ে অনেক বড়। একটি দেশের সমুদ্রকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়, তার মধ্যে মৎস্য, পর্যটন, অফশোর জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ মেরামত, সমুদ্র পরিবহন, বন্দর, লজিস্টিকস, সামুদ্রিক সেবা, গবেষণা ও প্রযুক্তি সবই থাকতে পারে। কিন্তু এসব খাত আলাদা আলাদা করে দেখলে ব্লু ইকোনমির পূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি হবে না। সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি খাতকে একটি অর্থনৈতিক চেইনের মধ্যে আনতে হবে।
একটি জাহাজ বাংলাদেশে এলো। তার পণ্য খালাস হলো। পণ্য কাস্টমস পার হলো। কনটেইনার গেল ডিপোতে। সেখান থেকে শিল্পকারখানায় কাঁচামাল পৌঁছাল। পণ্য তৈরি হলো। আবার বন্দরে ফিরল। জাহাজে উঠল। বিদেশের বাজারে চলে গেল। এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হয়। তাই বন্দরকে শুধু জাহাজ ভেড়ানোর জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। বন্দর হলো একটি অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তনটি এখন জরুরি। কারণ প্রতিযোগিতা শুধু কোন বন্দরে কত কনটেইনার ওঠানামা করল, সেটি দিয়ে নির্ধারিত হবে না। বরং কোন বন্দর কত দ্রুত, কম খরচে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্যকে উৎপাদন ও ভোগের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে পারছে, সেটিই বড় বিষয় হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি কারখানায় কাঁচামাল দেরিতে পৌঁছালে উৎপাদন ব্যাহত হয়। তৈরি পণ্য সময়মতো জাহাজে উঠতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে সরবরাহের সময়সূচি ব্যাহত হয়। বন্দরে কনটেইনার বেশি সময় পড়ে থাকলে ব্যবসার অর্থ আটকে থাকে এবং অতিরিক্ত খরচ তৈরি হয়। অর্থাৎ বন্দরের দক্ষতা শেষ পর্যন্ত কারখানার খরচেও প্রভাব ফেলে। এই বাস্তবতা থেকেই বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমির প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত সমুদ্রপথে বাণিজ্যের সময় ও খরচ কমানো।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় স্ট্রেংথ তার অবস্থান। দেশের প্রধান শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এর দীর্ঘদিনের সংযোগ রয়েছে। বন্দরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যবসায়িক ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক। কিন্তু একই সঙ্গে বন্দরের একটি মৌলিক ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশকারী জাহাজের আকার ও ড্রাফটের ওপর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে আন্তর্জাতিক রুটের বড় জাহাজের ক্ষেত্রে ফিডার জাহাজ বা ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।
বিশ্ব বাণিজ্যে যখন জাহাজের আকার ক্রমেই বাড়ছে, তখন এই সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বন্দর অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী দুটিকে একই জাতীয় বন্দর ব্যবস্থার পরস্পর-সম্পূরক অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
চট্টগ্রাম বন্দর এরইমধ্যে বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তার চারপাশে অর্থনৈতিক ও লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম। অন্যদিকে মাতারবাড়ীর বড় শক্তি হবে গভীর সমুদ্রের সক্ষমতা এবং বড় জাহাজ গ্রহণের সুযোগ। এই দুই বন্দরের মধ্যে কার্যকর সড়ক, রেল ও নৌ সংযোগ তৈরি করা গেলে চট্টগ্রাম অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর পোর্ট ইকোসিস্টেমে রূপ দেওয়া সম্ভব। এখানেই ‘ব্লু ইকোনমি’র ধারণাটি আরও বাস্তব হয়ে ওঠে। কারণ তখন সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত হবে শিল্প। শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হবে লজিস্টিকস। লজিস্টিকস যুক্ত হবে বন্দর ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্গে। বাংলাদেশে বন্দর উন্নয়ন অনেকটাই প্রকল্পভিত্তিক। কোথাও নতুন টার্মিনাল হয়েছে, কোথাও নতুন জেটি, কোথাও নতুন ইয়ার্ড, কোথাও নতুন বন্দর। কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন থেকে গেছে।
দেশের সব বন্দর মিলিয়ে জাতীয় বন্দর ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে? ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি’ এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জাপানের ওভারসিজ কোস্টাল এরিয়া ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের সহায়তায় প্রণীত কৌশলকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রথম সমন্বিত বন্দর নীতি কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর সমুদ্রবন্দর অংশের কৌশলটির তাৎপর্য হলো, বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাকে আলাদা আলাদা অবকাঠামো হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক হিসেবে তুলে ধরা। এই সুযোগটি কাজে লাগানো জরুরি।
চট্টগ্রাম বহুদিন ধরেই বন্দরনগরী। কিন্তু বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতির পুরো সম্ভাবনা কি শহরটি পেয়েছে? একটি আধুনিক বন্দরকে ঘিরে শুধু জেটি ও ইয়ার্ড থাকে না। থাকে বিশাল লজিস্টিকস ব্যবস্থা, গুদাম, ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার, কোল্ড চেইন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, ট্রাকিং, রেল কার্গো, শিপিং সার্ভিস, বিমা, ট্রেড ফাইন্যান্স, মেরিটাইম আইন ও প্রযুক্তি। এসব খাত যত বড় হবে, বন্দরের অর্থনৈতিক প্রভাবও তত বিস্তৃত হবে। চট্টগ্রামের জন্য তাই শুধু বন্দরের ভেতরের সক্ষমতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়।
বন্দরকে ঘিরে একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করা দরকার। বন্দর থেকে পণ্য বের হয়ে যদি দীর্ঘ যানজটে আটকে যায়, তাহলে বন্দরের ভেতরে দ্রুততার কোনো অর্থ থাকে না। টার্মিনাল আধুনিক হলেও রেল সংযোগ দুর্বল হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। কাস্টমস প্রক্রিয়া ধীর হলে বড় জাহাজ গ্রহণের সক্ষমতাও পুরোপুরি কাজে লাগবে না। তাই বন্দর উন্নয়নকে বন্দরের সীমানার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। পোর্ট প্ল্যানিং ও সিটি প্ল্যানিংকে একই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
সমুদ্রপথের সঙ্গে সেবার অর্থনীতিও তৈরি করতে হবে । ব্লু ইকোনমির একটি বড় কিন্তু কম আলোচিত সম্ভাবনা হলো মেরিটাইম সার্ভিস। একটি বড় জাহাজ বন্দরে এলে শুধু পণ্য ওঠানামা করে না। প্রয়োজন হয় জাহাজের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নেভিগেশনাল সেবা, জরিপ, সার্টিফিকেশন, বিমা, আইনগত সহায়তা এবং বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত সেবা। বিশ্বের বড় বন্দরগুলোতে এসব সেবা নিজেই বড় অর্থনৈতিক খাত। বাংলাদেশেও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে এই বাজার তৈরি করা সম্ভব।
জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশ এরিমধ্যে সক্ষমতা দেখিয়েছে। পরবর্তী ধাপে জাহাজ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের আন্তর্জাতিক বাজারের একটি অংশ ধরার সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের সম্ভাবনা শুধু বাংলাদেশের বাজারে সীমাবদ্ধ নয়।
বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বাংলাদেশকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল, ভুটান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সংযোগের সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু গভীর সমুদ্রবন্দর করলেই হবে না। বন্দর থেকে সীমান্ত পর্যন্ত দ্রুত যোগাযোগ দরকার। দরকার রেল ও সড়ক অবকাঠামো। দরকার কাস্টমস ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন। দরকার নির্ভরযোগ্য লজিস্টিকস। তখন চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের পণ্য আমদানি-রফতানির গেটওয়ে থাকবে না। প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও বঙ্গোপসাগরের একটি বাণিজ্যিক দরজা হয়ে উঠতে পারে।
আগামী দিনের বন্দরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হবে ডেটা। একটি জাহাজ কখন আসবে, কোথায় অবস্থান করবে, কী কার্গো বহন করছে, কোন কনটেইনার কখন ছাড়বে, কোন সংস্থা কখন অনুমোদন দেবে, কোন ট্রাক বা রেলে পণ্য যাবে, এসব তথ্য যদি একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় পুরোপুরি না থাকে, তাহলে আধুনিক বন্দর তৈরি করেও পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাবে না। মেরিটাইম সিঙ্গেল উইন্ডো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই তথ্য বারবার বিভিন্ন সংস্থাকে না দিয়ে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে তথ্য ব্যবস্থাপনা করা গেলে সময় কমবে, প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং ব্যবসার ব্যয় কমবে। বিশ্বের বন্দরগুলো দ্রুত এই দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশেরও যেতে হবে। কারণ বন্দর প্রতিযোগিতা হবে শুধু ক্রেন, জেটি ও ইয়ার্ডের সক্ষমতার মধ্যে নয়। প্রতিযোগিতা হবে তথ্য ব্যবস্থাপনা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং সেবার গতির মধ্যেও। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। শুধু বড় অবকাঠামো তৈরি করলেই বড় অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে, এমন নয়। একটি টার্মিনাল তৈরি হলো, কিন্তু পর্যাপ্ত কার্গো নেই। একটি গভীর সমুদ্রবন্দর হলো, কিন্তু পর্যাপ্ত রেল-সড়ক সংযোগ নেই। বন্দর আধুনিক হলো, কিন্তু কাস্টমস প্রক্রিয়া ধীর। জাহাজ দ্রুত খালাস হলো, কিন্তু পণ্য শহরের বাইরে যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগল। তাহলে অবকাঠামো তার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারবে না। তাই ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা।
বন্দর, কাস্টমস, রেল, সড়ক, নৌপথ, শিল্প, লজিস্টিকস এবং বিনিয়োগনীতিকে একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। ব্লু ইকোনমি মানে সমুদ্র থেকে যত বেশি সম্ভব সম্পদ তুলে নেওয়া নয়। সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করাই এর মূল কথা। তাই ভবিষ্যতের চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ীকে একই সঙ্গে দক্ষ এবং পরিবেশবান্ধব হতে হবে। জাহাজের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নি:সরণ কমানো, পরিবেশবান্ধব কার্গো হ্যান্ডলিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা এখন বন্দর উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য বাস্তব ঝুঁকি।
আজ যে বন্দর বা টার্মিনাল তৈরি হচ্ছে, সেটি আগামী কয়েক দশক কাজ করবে। তাই তার নকশা ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে। বন্দর উন্নয়নের আলোচনায় প্রায়ই সিঙ্গাপুরের উদাহরণ আসে। কিন্তু বাংলাদেশের লক্ষ্য সিঙ্গাপুর হওয়া নয়। সিঙ্গাপুরের ভূগোল, রাষ্ট্রব্যবস্থা, বাজার ও ইতিহাস বাংলাদেশের থেকে ভিন্ন। বঙ্গোপসাগরের অবস্থান, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, রফতানিমুখী শিল্প, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা অর্থনীতি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান। এই উপকরণগুলো কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামের জন্য একটি নিজস্ব মডেল তৈরি করতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত না ‘সিঙ্গাপুর বানানো’। লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশের সবচেয়ে দক্ষ পোর্ট-ইকোনমি তৈরি করা।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় কতটা প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, তার পুরো সম্ভাবনা এখনো আমরা জানি না। মৎস্য, অফশোর জ্বালানি, সামুদ্রিক পর্যটন কিংবা অন্যান্য সম্পদের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এসব খাতের অনেকগুলোই দীর্ঘমেয়াদি। অন্যদিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে নিশ্চিত সামুদ্রিক সম্পদ হলো তার ভৌগোলিক অবস্থান। বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থান। বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার। দ্রুত পরিবর্তনশীল শিল্প অর্থনীতি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সংযোগ। এই ভৌগোলিক সুবিধাকে অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করার মাধ্যমই হলো বন্দর ও লজিস্টিকস। অর্থাৎ বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমির সবচেয়ে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য অংশ আছে সমুদ্রের ওপর দিয়ে চলা বাণিজ্যে।
অর্থনীতি তৈরি হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে। কোন বন্দরের কী ভূমিকা হবে, কোথায় বিনিয়োগ হবে, কীভাবে বেসরকারি খাত যুক্ত হবে, বিদেশি বিনিয়োগের কাঠামো কী হবে, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের মডেল কার্যকর হবে, কীভাবে কাস্টমস ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয় হবে, রেল ও সড়ক কোথায় সম্প্রসারণ করা হবে, আঞ্চলিক ট্রানজিট বাণিজ্য কীভাবে বাড়ানো হবে, পরিবেশ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সিদ্ধান্তগুলো যেন বিচ্ছিন্ন না হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে একটি নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করা হলো, কিন্তু তার সঙ্গে রেল সংযোগ নেই, এমন উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি হলো, কিন্তু তার সঙ্গে শিল্প ও লজিস্টিকস অঞ্চল তৈরি হলো না, তাতেও সম্ভাবনা পূর্ণ হবে না। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ীকে পাশাপাশি রেখে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরিকল্পনা করতে হবে। তখনই ব্লু ইকোনমি একটি ধারণা থেকে বাস্তব অর্থনীতিতে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমি নিয়ে এখন প্রশ্নটি একটু বদলানো দরকার। শুধু সমুদ্র থেকে আমরা কী পাব সেই প্রশ্ন করলে হবে না। প্রশ্ন করতে হবে, সমুদ্রকে ঘিরে আমরা কী তৈরি করতে পারব। আমরা কি একটি দক্ষ জাতীয় বন্দর নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারব? আমরা কি বন্দরকে ঘিরে একটি শক্তিশালী লজিস্টিকস ও মেরিটাইম সার্ভিস অর্থনীতি তৈরি করতে পারব? আমরা কি চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের জন্য একটি পোর্ট-ইকোনমি সিটিতে এবং বৃহত্তর অঞ্চলের জন্য একটি বাণিজ্যিক গেটওয়েতে পরিণত করতে পারব? কারণ ব্লু ইকোনমি শুধু সমুদ্রের সম্পদের গল্প নয়। এটি সমুদ্রকে ঘিরে বাণিজ্য, শিল্প, লজিস্টিকস, সেবা ও কর্মসংস্থানের নতুন অর্থনীতি তৈরির গল্প। এই গল্পে চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমিকা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, কেন্দ্রীয়। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ীকে ঘিরে তৈরি হতে পারে শিল্প ও লজিস্টিকসের নতুন বলয়। সেই বলয় যুক্ত হতে পারে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের সঙ্গে, আবার দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যপথের সঙ্গেও। তখন সমুদ্র শুধু বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্ত থাকবে না। সমুদ্র হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন উত্তর। আর সেই উত্তরের প্রথম দরজা চট্টগ্রাম বন্দরে।
লেখক: রাশেদ এইচ চৌধুরী, চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান, দৈনিক বণিক বার্তা


















































