মতামত সম্পাদকীয়

নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : দরকার টেকসই ও বাস্তব পরিকল্পনা

সিডিএ’র মাস্টার প্ল্যানের তথ্য বলছে, আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরে শহরের বর্জ্য রাখতে প্রয়োজন হবে ৪০০ থেকে ৫০০ একর জমি। মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, বর্তমান প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জন্য আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত ল্যান্ডফিলের জন্য ৪০০ থেকে ৫০০ একর জমি প্রয়োজন। প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য একই সময়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ একর জমি।

তার মানে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্য নগরী এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড চট্টগ্রাম আজ এক মারাত্মক বর্জ্য ও জলাবদ্ধতা সংকটের মুখোমুখি। দৈনিক ৩ হাজার টনেরও বেশি বর্জ্য উৎপাদিত হওয়া এই নগরীতে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য অপসারণের চিত্রটি চরম উদ্বেগজনক। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) খসড়া মাস্টার প্ল্যানে আগামী ২০-২৫ বছরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৪০০ থেকে ৫০০ একর জমির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা এবং সিডিএ-র মহাপরিকল্পনার মধ্যকার ফারাক বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, প্রথাগত ভূমিভিত্তিক ডাম্পিং নয়, বরং প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর সমন্বিত পরিকল্পনা।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নগরে প্রতিদিন উৎপাদিত বর্জ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশই (২৬%) সরাসরি নালা-খাল এবং খোলা স্থানে পড়ে থাকে। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেন এবং খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ পুরোপুরি রুদ্ধ করে দিচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই যে জলজট ও জলাবদ্ধতায় নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়, তার মূলে রয়েছে চাক্তাই খালসহ ৫২টি খাল ও নালার এই করুণ অবস্থা। উপরন্তু, প্রতিদিন ২২ টন কঠিন বর্জ্য, কসাইখানার অপরিশোধিত আবর্জনা এবং ৭২০টি শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে। কর্ণফুলীর নাব্য হ্রাস এবং পরিবেশগত ধ্বংস কেবল কোনো আঞ্চলিক সংকট নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও এক তীব্র হুমকি।
সিডিএ তাদের প্রস্তাবিত মাস্টার প্ল্যানে বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য পাঁচটি সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করলেও কোনোটিরই আয়তন ৮০ একরের বেশি নয়। বড় আয়তনের একক ল্যান্ডফিলের অভাব এবং উত্তর পাহাড়তলীর মতো সম্ভাব্য সাইটে জমিসংক্রান্ত আইনি জটিলতা প্রমাণ করে যে, কেবল জায়গা দখল বা ল্যান্ডফিল বানিয়ে এই সুবিশাল বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, শুধু বর্জ্যের স্তূপ গড়ে তোলা আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার লক্ষণ হতে পারে না।
এ অবস্থায় সিডিএ-র প্রস্তাবিত ‘হাইব্রিড মডেল’—অর্থাৎ দুটি ছোট নিয়ন্ত্রিত ল্যান্ডফিলের সাথে বর্জ্য রিসাইক্লিং, কম্পোস্টিং এবং আবর্জনাভিত্তিক জ্বালানি (আরডিএফ) উৎপাদনের পরিকল্পনাটি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত। বিশ্বজুড়ে আধুনিক মেগাসিটিগুলো এখন বর্জ্যকে সমস্যা না ভেবে সম্পদে পরিণত করছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন এবং প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে চট্টগ্রাম কেন পিছিয়ে থাকবে?
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সক্ষমতার ঘাটতি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যকার দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতাই এই সংকটের প্রধান কারণ। মাস্টার প্ল্যান কাগজ-কলমে যতই সুসংহত হোক না কেন, বাস্তব রূপায়ণে আন্তরিকতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা না থাকলে তা পূর্বের ব্যর্থ প্রকল্পগুলোর মতোই ধূলিসাৎ হবে।
চট্টগ্রামকে একটি সুস্থ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চসিক ও সিডিএ-কে যৌথভাবে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি চালু করতে হবে। বাসাবাড়ি ও বাণিজ্য কেন্দ্র থেকেই বর্জ্য পৃথকীকরণ, চাক্তাই খালসহ অন্যান্য নালার মুখ রক্ষায় বর্জ্য-ছাঁকনি স্থাপন এবং আধুনিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট দ্রুত স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি।

---------