চট্টগ্রামকে সচল নগরে পরিণত করতে হবে

0
210

চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। নগরবাসীর সেবায় কাজ করছে সংস্থাটি। একটি আধুনিক নগরের জন্য যেসব কার্যক্রম প্রয়োজন অন্যান্য সেবা সংস্থার সাথে সমন্বয় করে সেটি নিশ্চিতের প্রচেষ্টা রয়েছে চসিকের। একজন নির্বাচিত মেয়র চসিকের দায়িত্ব পালন করে এলেও করোনাকালীন সময়ে নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ায় বর্তমানে এই পদে প্রশাসক হিসেবে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা খোরশেদ আলম সুজন। উন্নত চট্টগ্রামক নগর বিনির্মাণ পরিকল্পনা জানতে তাঁর মুখোমুখি হন সুপ্রভাতের প্রধান প্রতিবেদক ভূঁইয়া নজরুল।

সুপ্রভাত বাংলাদেশ: বিশ্বের শীর্ষ বন্দরগুলোর মধ্যে ৫৮তম অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। এই বন্দরের সঙ্গে তাল মেলাতে আমাদের শহরটি কি সেই মানে রয়েছে?

খোরশেদ আলম সুজন: একটি বিশ্বমানের শহরকে সচল শহর হতে হয়। কিন্তু আমাদের এই শহরে একই সড়কে যান্ত্রিক দ্রতযানের সাথে রয়েছে অযান্ত্রিক যান (রিকশা)। বিশ্বের প্রধান শহরগুলোতে পণ্যবাহী গাড়ির জন্য পৃথক লেন বা সড়কের ব্যবস্থা থাকলেও এখানে তা নেই। একটি সচল শহরে আধুনিক বাস ও ট্রাক টার্মিনাল থাকে, কিন্তু এখানে তা নেই। এছাড়া একটি সচল শহরের শহরতলী এবং শহরের আশপাশের এলাকাগুলোর সাথে কমিউটার ট্রেন সার্ভিস থাকলেও এই শহরে তা নেই। রাস্তায় যানজটে নষ্ট হচ্ছে মানুষের শ্রমঘণ্টা, হচ্ছে যত্রতত্র পার্কিং, নেই আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থাসহ আরো অনেক কিছু। এসব সমস্যার সমাধান করে এই শহরকে সচল নগরে পরিণত করতে হবে।

সুপ্রভাত : আপনি বলছেন ট্রাক ও বাস টার্মিনাল নির্মাণের কথা। এতোবছর এই শহরে সেটি নির্মাণ করা হয়নি কেন?

সুজন : চট্টগ্রাম একটি বন্দর নগর। এই নগরে দিনে প্রায় আট হাজার পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি যাতায়াত করে থাকে। পণ্য নিয়ে আসা-যাওয়া করা এসব বাহনের জন্য একটি টার্মিনালের অপরিহার্যতা থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কেউ এই টার্মিনাল নির্মাণ করেনি। ফলে এসব ট্রাক রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে থাকে। একইভাবে চট্টগ্রামের সাথে দেশের ৬১ জেলায় প্রতিদিন যাতায়াতকারী দিনে ১০ হাজার বাসের জন্যও নির্মাণ করা হয়নি আধুনিক বাস টার্মিনাল।  টার্মিনালের অভাবে নগরজুড়েই এসব যান যত্রতত্রভাবে থাকছে এবং যানজটে ভোগান্তিতে পড়ছে মানুষ। তাই বাস ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

সুপ্রভাত: সড়কে নাগরিক দুর্ভোগের জন্য শুধু কি বাস ও ট্রাক টার্মিনালই না থাকাটাই দায়ী?

সুজন : বাস ও ট্রাক টার্মিনালের শুন্যতা অবশ্যই প্রধান কারণ। এর সাথে রয়েছে নগরীর শপিংমল, বাণিজ্যিক ভবন ও আবাসিক ভবনগুলোর বেইজমেন্ট বা নিচতলা পার্কিংয়ের জন্য বরাদ্দ থাকলেও সেখানে দোকান বা অন্য স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শাহ আমানত মার্কেটের পার্কিংয়ের জায়গায় যেমনভাবে দোকান নির্মাণ করা হয়েছে তেমনিভাবে বাণিজ্যিক ভবনগুলোর বেইজমেন্ট অন্য কাজে ভাড়া দেয়া হচ্ছে। এতে মানুষ রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে এবং নগরজুড়ে যানজট হচ্ছে।

সুপ্রভাত : পার্কিংয়ের এই সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়?

সুজন : এজন্য এলাকাভিত্তিক কোনো জায়গাকে পার্কিং স্পেস নির্ধারণ করতে হবে। যেমন- নিউমার্কেট এলাকার জন্য নতুন রেলওয়ে স্টেশনের সামনের জায়গাটি সাধারণের জন্য টাকা দিয়ে গাড়ি পার্ক রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একইভাবে সমগ্র শহরের যেখানে এমন খালি জায়গা কিংবা অব্যবহৃত জায়গা রয়েছে সেখানে পার্কিং স্পেস করা যেতে পারে। অর্থাৎ এলাকাভিত্তিক পার্কিং চালু করা যেতে পারে।

সুপ্রভাত : টার্মিনাল কিংবা পার্কিং সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব কার?

সুজন : অবশ্যই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। এই দুই সংস্থার কাউকে না কাউকে এই কাজটি করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংস্থাগুলো কেন করেনি তা জানি না। তবে অতি দ্রুত বাস ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে এবং এলাকাভিত্তিক পার্কিং স্পেস নির্ধারণ করতে হবে।

সুপ্রভাত : নগরীতে স্কুলভিত্তিক যানজটের বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

সুজন : স্কুলভিত্তিক যানজটের অন্যতম কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব স্কুল বাস না থাকা। এক্ষেত্রে নগরীর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমন্বয় করে একটি সমিতির মাধ্যমে স্কুল বাস কিনতে পারে। আর তা করা গেলে শিক্ষার্থীরা কেউ আর ব্যক্তিগত গাড়িতে স্কুল বা কলেজে আসবে না এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক যানজট নিয়ন্ত্রনে আসবে।

সুপ্রভাত : আপনি অযান্ত্রিক যানের (রিকশার) কথা বলছিলেন…

সুজন : একটি সচল নগরীতে দ্রুতযানের সাথে অযান্ত্রিক যান চলাচল করতে পারে না। প্রয়োজনে ব্যাটারি রিকশা চালু করা যেতে পারে। এখন আমরা বিদ্যুৎ শক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই সিএনজি  স্টেশনের মতো ব্যাটারি রিকশা চার্জের জন্য নির্ধারিত কিছু পয়েন্টও নির্মাণ করে দেয়া যেতে পারে। একইসাথে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলের জন্য পৃথক একটি লেন রাখা যেতে পারে। আর তা করা গেলে পণ্যবাহী গাড়ি ও যাত্রীবাহী গাড়ি বাধাহীনভাবে চলাচল করতে পারবে। এছাড়া শহরের উপর চাপ কমাতে কমিউটার ট্রেন সার্ভিস চালু করা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সুপ্রভাত : কমিউটার ট্রেন সার্ভিস বা মেট্রোরেল চালুর উপযোগিতা কতটা?

সুজন : অবশ্যই শহরের সাথে আশপাশের সীতাকু- ও মিরসরাই এবং হাটহাহাজারি, দোহাজারি ও নাজিরহাটের মধ্যে কমিউটার ট্রেন সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। এতে মানুষ নগরীর ভেতরে ভিড় না করে শহরের বাইরে থাকবে এবং কাজ শেষে আবার চলে যাবে। ফলে শহরের ভেতরে মানুষের চাপ কমবে। একইসাথে শহরে ভেতরে যাতায়াতের জন্য মেট্রোরেল এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা খুব প্রয়োজন। আমি বিআরটিসির মাধ্যমে কিছু বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। অপরদিকে নদীপথে সদরঘাট থেকে কাপ্তাই এবং সদরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত বোট সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। তা করা গেলে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ থেকে নিত্যপণ্য কাপ্তাই এলাকায় নিয়ে যাওয়া সহজ হবে।

সুপ্রভাত : নগরবাসীর সেবার মান কীভাবে বাড়ানো যায়?

সুজন : এজন্য সেবা সংস্থাগুলোকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। সকল সেবা ও উন্নয়ন সংস্থা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে সাপোর্ট দিতে হবে। অন্যথায় সমন্বয়হীনতা থাকবে এবং দুর্ভোগও বাড়বে। আবাসিক এলাকাগুলো থেকে গার্মেটন্স অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গার্মেন্টস ভিলেজ নির্মাণ করতে হবে। সেসব স্থানে বাচ্চাদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার এবং শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

সুপ্রভাত : প্ল্যানিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিটি করপোরেশনের কি আদৌ প্ল্যানিং বিভাগ রয়েছে?

সুজন : অবশ্যই প্ল্যানিং বিভাগ ছাড়া একটি পরিকল্পিত নগর কল্পনা করা যায় না। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের যে প্ল্যানিং বিভাগ রয়েছে তা সৌন্দর্যবর্ধনভিত্তিক প্ল্যানিং। কিন্তু নগরীর জন্য একটি যুগোপযোগী প্ল্যানিং বিভাগ গড়ে তুলতে হবে।

সুপ্রভাত : নগর হিসেবে চট্টগ্রামের গুরুত্ব কতখানি?

সুজন : চট্টগ্রাম দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ন শহর হিসেবে আর্বিভূত হতে যাচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল, বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ি বন্দর, কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন এবং তা ঘুমধুম পর্যন্ত বিস্তৃত। মিরসরাইতে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরসহ অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে চট্টগ্রামকে ঘিরে। তাই চট্টগ্রাম হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। এই শহরের পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।