ফারুক হোসেন সজীব »
ছোট্ট একটি গ্রাম। সেই গ্রামের এক কোণে থাকত একটি অসুস্থ, কৌতূহলী আর স্বপ্নবাজ ছেলে। নাম তার অমল।
এই গল্পটি লিখেছিলেন বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ আমরা ডাকঘর নাটকের মূল কাহিনীটি শুনবো! এই নাটকের একটি চরিত্র অমল। অমল খুব বেশি বাইরে যেতে পারত না। তার শরীর ভালো ছিল না। তাই ডাক্তার তাকে ঘরের ভেতরেই থাকতে বলেছিল। জানালার পাশে বসে বসেই অমলের দিন কাটতে লাগল। কিন্তু তার মন? সেটা তো উড়ে বেড়াত পাখির মতো! অমল ভাবত, এই পৃথিবীটা কত বড়! কত মানুষ, কত পথ, কত নদী, পাহাড় সব তার দেখতে ইচ্ছে করে! একদিন সে তার কাকা মাধবকে জিজ্ঞেস করল, কাকা আমি কি কখনো বাইরে যেতে পারব? মাধব কাকা একটু হেসে বললেন, তুমি এখন বিশ্রাম নাও। বড় হলে সবই দেখতে পারবে। কিন্তু অমলের মন মানে না। সে জানালার ধারে বসে বাইরের পথের দিকে তাকিয়ে থাকত। কে যাচ্ছে, কে আসছে সব দেখত, আর তাদের সঙ্গে গল্প করত। একদিন গ্রামের এক দইওয়ালা সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। অমল দইওয়ালাকে ডেকে বলল, ও দইওয়ালা! তুমি কোথায় যাচ্ছ? দইওয়ালা বলল, আমি বাজারে যাচ্ছি। অমল বিস্ময়ে বলল, বাজার কেমন? সেখানে কি অনেক লোক? দইওয়ালা হেসে বলল, হ্যাঁ অনেক লোক। অনেক দোকান। অনেক রঙ! অমল চোখ বন্ধ করে কল্পনা করল। রঙিন বাজার। মানুষের ভিড় আর হাসির শব্দ। আরেকদিন এক ফুলওয়ালা এলো। অমল তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি প্রতিদিন এতো সুন্দর ফুল নিয়ে যাও? ফুলওয়ালা বলল, হ্যাঁ আমি মানুষের ঘরে আনন্দ নিয়ে যাই। অমল মনে মনে ভাবল, আমিও যদি ফুলের মতো আনন্দ নিয়ে যেতে পারতাম! এইভাবে অমল জানালার ধারে বসে বসে অনেক মানুষের সঙ্গে গল্প করত। ডাকপিয়ন। রাখাল ছেলে। পাহারাদারÑসবাই তার বন্ধু হয়ে গেল।
একদিন অমল শুনল, তার বাড়ির কাছে নতুন একটা ডাকঘর তৈরি হচ্ছে। সে খুব খুশি হলো। সে মাধব কাকাকে বলল, কাকা! ডাকঘর মানে কি? মাধব কাকা বললেন, ডাকঘর মানে যেখানে চিঠি আসে-যায়। অমল অবাক হয়ে বলল, তাহলে কি আমাকেও কেউ চিঠি পাঠাবে? সেই দিন থেকেই অমলের নতুন স্বপ্ন শুরু হলো। সে ভাবতে লাগল রাজা নিজে তাকে চিঠি পাঠাবেন! রাজা তার বন্ধু হবেন! অমল প্রতিদিন জানালার পাশে বসে থাকত, আর অপেক্ষা করতÑকখন সেই চিঠি আসবে। সে ডাকপিয়নকে ডেকে বলত, আমার জন্য কোনো চিঠি আছে? ডাকপিয়ন মজা করে বলত, হয়তো একদিন আসবেই! অমল বিশ্বাস করতÑএকদিন ঠিকই আসবে। গ্রামের মানুষজনও অমলকে খুব ভালোবাসত। তারা তার সঙ্গে গল্প করত, তাকে হাসাত। কিন্তু কেউ জানত না, অমলের মনে কত বড় স্বপ্ন খেলা করছে। একদিন গ্রামের প্রধান (মোড়ল) এসে অমলের সঙ্গে মজা করতে লাগল। সে বলল, রাজা নাকি তোমাকে চিঠি পাঠাবেন! অমল খুশি হয়ে বলল, হ্যাঁ! আমি অপেক্ষা করছি! মোড়ল একটু হাসল, কিন্তু অমলের সরল বিশ্বাস দেখে তার মন নরম হয়ে গেল। দিন কেটে যাচ্ছিল। অমল একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। কিন্তু তার চোখে তখনও স্বপ্নের আলো। হঠাৎ একদিন খবর এলো। রাজা সত্যিই অমলের জন্য একজন রাজদূত পাঠিয়েছেন! সবাই অবাক হয়ে গেল। একজন রাজকীয় চিকিৎসক এলেন। তিনি বললেন, আজ রাতে অমল ভালো করে বিশ্রাম নেবে। রাজা তাকে দেখতে আসবেন। অমল খুব খুশি হলো। সে বলল, আমি কি সত্যিই রাজাকে দেখতে পাব? চিকিৎসক মৃদু হেসে বললেন, হ্যাঁ! তুমি প্রস্তুত হও। রাত হলো। চারদিকে নীরবতা। অমল শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। তার চোখে আর কোনো কষ্ট নেইÑশুধু শান্তি। সে যেন অনুভব করছিল রাজা তার কাছে এসেছেন, তাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছেন এক নতুন, সুন্দর জগতে। যেখানে কোনো বাঁধা নেই। কোনো অসুখ নেই। শুধু মুক্তি আর আনন্দ। সেই রাতেই অমল ঘুমিয়ে পড়ল এক গভীর, শান্ত ঘুমে। পরদিন সবাই বুঝতে পালল, অমল আর নেই! সে মারা গেছে। কিন্তু তার গল্প, তার স্বপ্ন, তার হাসিÑসব রয়ে গেল মানুষের মনে। মানুষ বুঝতে পারল একটি ছোট্ট শরীরের ভিতরেও একটি বিশাল মন থাকতে পারে। অমল কখনো বাইরে যেতে পারেনি, কিন্তু তার কল্পনা তাকে পুরো পৃথিবী ঘুরিয়ে এনেছে। এই নাটকের মাধ্যমে শিশুদের জন্য এক গভীর সত্য তুলে ধরেছেন কবি Ñস্বাধীনতা শুধু শরীরের নয়, মনেরও। আর সত্যিকারের আনন্দ আসে স্বপ্ন দেখতে জানলে। জানালার বাইরে পৃথিবী যত বড়ই হোক, আমাদের মনের ভেতরের পৃথিবী তার থেকেও অনেক বড় হতে পারে!





















































