ক্ষমা  

অরূপ পালিত »

ইট-পাথরের এই শহরের রাত কখনো গোলাপি আর কখনো এক অদ্ভুত মায়াবী আলোয় সাজে। সেই আলোয় হাঁটতে হাঁটতে মনের রূপকথার দরজা খুলে যায়, আবার কখনো বাস্তবের কঠিন সত্যও উন্মোচন হয়। ব্যস্ত এ শহরের অধিকাংশ মানুষদের গোলাপী আলোয় হাঁটার প্রয়োজন পড়ে না। ভোরের প্রথম আলো যখন গ্রামের ঘরগুলো ছুঁয়ে যায়, তখনো কোনো খবরের পাতা শহরের নৈশজীবনের গল্প তাদের সামনে আসে না।
গোলাপি আলো কেবল তাদের সঙ্গী, যারা রাতের সঙ্গে সহাবস্থান করতে বাধ্য-পরিশ্রমী শ্রমিক,সংসার-বিমুখ পথিক কিংবা নিঃসঙ্গ আত্মা। শীতল এমনই একজন সে কোথাও থেমে থাকে না। কল্পনাবিলাসী একজন মানুষ। মাঝরাতে স্টেশনে এসে কখনো উত্তর জনপদে না হয় দক্ষিণে চলে যায়। সে খুঁজে এক নারীর মুখ-যার মাঝে তার মায়ের ছায়া আছে। অপরূপ মায়ায় মোড়া সেই মুখ। যে সুরেলা কণ্ঠে মৃদু স্বরে গেয়ে উঠে”খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে”। আবার কখনো গুনগুন করে ”এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি”। গোলাপি আলোয় সত্যি এই সোনার বাংলাদেশ অনেক মায়াময়।
গভীর ঘুমে নিমগ্ন শহর। আজানের ধ্বনি উঠতে এখনও অনেক দেরি। হাসপাতালের করিডোরে নৈঃশব্দ্য যেন লেপটে আছে। দু-একজন ডাক্তার-নার্স এখনো ক্লান্ত দেহ নিয়ে আধো ঘুমে। সেই নীরবতার বুক চিরে হঠাৎ ছুটে আসে শীতল। বুকে আলতো করে জড়িয়ে ধরেছে একটি নবজাতক কন্যাশিশু। শিশুটির নিরবতায় মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত নিষ্ঠুরতাকে মোকাবিলা করে বেঁচে থাকার শেষ আর্তি।
তার শরীর থেকে এখনও ঝরে পড়ছিল মাতৃগর্ভের উষ্ণতা-আর দশ মাসের নিরাপদ অন্ধকারের অমোছনীয় চিহ্ন। নৃশংস পৃথিবীর আলোয় আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে যেন নিষিদ্ধতার ছোবল খেয়ে ফেলেছে। কে জানে কোন অভিজাতের ঘরে লুকিয়ে জন্ম নিয়েছিল? কিংবা কোনো ভয়, কোনো লজ্জা, বা কোনো পাপের আতঙ্কে তাকে রাস্তায় ফেলে যাওয়া হলো। তার কোমল দেহটি যেন সমাজের পচনকে বয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ তাকে অপরাধী বানানোর কোনো অধিকার মানুষের নেই। সে তো কেবল নিঃশ্বাস নেওয়া এক খণ্ড ঈশ্বরের আলো।
সৃষ্টিকর্তা সবকিছুর মধ্যে সীমারেখা টেনে দিয়েছে। তাই জাস্টিফাই না করে কোনো কিছু বলাও পাপ। আজকে এই পৃথিবীতে অনেক নারী গভীর রাতে একটি সন্তানের জন্য হাহাকার করে কাঁদে, আর অন্যনারী মেয়ে সন্তান জন্ম নেবার পর পৃথিবীর থেকে বিদায় করার চিন্তা করে।
চাল-চুলোহীন শীতলের হাঁড়ি চড়ানোর সামর্থ্য নেই ঠিক, কিন্তু বুকের ভেতর আছে অদ্ভুত মমতার ডালা। এই শহরের বেশ কয়েকটি মেডিকেলে সে কিন্তু পরিচিত মুখ। দরিদ্র এবং অচেনা সব মানুষই ওকে দেখে ভরসা পায়। সে হুমায়ূন আহমেদের অন্ধ ভক্ত, হিমুর নিঃসঙ্গতায় সে নিজেরই ছবি দেখে। তাই সে নিস্তব্ধ রাতে গোলাপি আলোয় হেঁটে যেতে যেতে পৃথিবীর লুকানো গল্পগুলো দেখতে পায়। যেগুলো অন্যরা সাধারণত চোখ বন্ধ করে এড়িয়ে যায়।
সেদিন রাতেও হাঁটছিল স্টেশনের দিকে পৌঁছাতে। ভোরের ট্রেনে উঠবে,তবে গন্তব্যে এখনো ঠিক হয়নি। কতো দিনের জন্য শহর ছাড়ছে বা শিতলকে এই শহর হারাচ্ছে কেউ বলতে পারবে না। হঠাৎ দেখল রাস্তার পাশে এক ছোট্ট দেহ-স্পন্দনহীন চাদরের উপর গোলাপী আলোয় পড়ে আছে। প্রথমদৃষ্টিতে মনে হলো মৃতদেহ। শীতল থমকে দাঁড়াল, তারপর আবার নিজের পথ ধরল। সেই মুহূর্তে পেছন থেকে একটি কুকুর উদ্বেগে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। কুকুরটি যেন মানুষের পরিবর্তে নিজে সব মানবিকতা ধরে রেখেছে। তার চোখের দৃষ্টি বলে দিচ্ছিল-“থামো, দেখো এখানে একটি জীবন আছে।”
শীতল ফিরে দেখল, হিমশীতল শিশুর দেহ, খুব ক্ষীণ, তবুও জেদি মুষ্টিবদ্ধ নিশ্বাস। পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা আর কুকুরের মানবিকতা একই মুহূর্তে তাকে অভিভূত করে। মনের ভেতর একটি প্রশ্ন জাগল আমরা “মানুষ কি সত্যিই সৃষ্টির সেরা জীব?”
শিশুটিকে কোলে নিয়ে শীতল ছুটে যায় হাসপাতালে। ডাক্তার আর নার্স কোনো প্রশ্ন ছাড়া শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা শুরু করলেন। শিশুটির শ্বাসটি যেন কেড়ে নিতে আজরাইল এসে হাজির। ডাক্তার আর নার্সের হাত থেকে ওকে অন্ধকারে নিতে টানাটানি করছে। শীতল পাশে বসে তার ক্ষুদ্র আঙুল আঁকড়ে ধরে বসে রইল। একটি অনাথ জীবনের পাশে দাঁড়ানোই সম্ভবত তার জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে উঠে।
তিন দিন ধরে চলল চিকিৎসা। সেই রাতের শীতের কুয়াশায় যেন শিশুটির ফুসফুসে বিষ হয়ে নিমোনিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। ডাক্তারদের পরিশ্রান্ত চোখে অসিদ্ধির ছায়া। শীতলের চোখে অবিরাম প্রার্থনা। কিন্তু সবাইকে কাঁদিয়ে অবশেষে গভীর রাতে শিশুটির জন্য সমস্ত লড়াই থেমে গেল। এই পৃথিবীর অসুস্থ বাতাস ছেড়ে সে যেন কোনো অপার্থিব শান্তির গন্তব্য পাড়ি দিল।
শেষ বিদায়ের সময় তার পাশে মা-বাবা কেউ ছিল না। ছিল কেবল শীতলের নিঃশব্দ কান্না, ডাক্তারদের অশ্রুসিক্ত চোখ, আর কয়েকশো মানুষ-যারা জানত না শিশুটির নাম। অথচ অশ্রুজলে তার মৃত্যুকে নিতে চেয়েছিল আমরাই তোমার আপন। মৃত্যু কখনো কখনো জীবনকে পরাজিত করে না-মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। সেই শিশুটি যেন জন্মের তিন দিনের মধ্যেই পৃথিবীকে শেখাতে চেয়েছিল করুণা কী, ভালোবাসা কত মূল্যবান।
শীতল যখন মেয়েটাকে কবর দিয়ে গন্তব্যে হীন পথে হাঁটছিল। গোলাপি আলোয় ডুবে থাকা শহরটা আর আগের মতো মনে হচ্ছে না তার কাছে। ওর মনে হচ্ছিল অনেক শিশু তার সাথে এই শহর ছেড়ে যাবার জন্য প্রস্তুত। নিস্তব্ধ বাতাসে যেন সে শুনতে পাচ্ছে হাজার অপত্যহীনমায়ের আর্তনাদ।
ভাবতে থাকে,একটি শিশুর পৃথিবীতে আসার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা তো মায়ের স্পর্শ। বাবার কাঁধে নিরাপদে মাথা রাখা। একটি নাম। একটি ঘর। কিন্তু সে কিছুই পেল না-শুধু শীতলকে, আর একটু মানবিকতার বাতাস।
শীতল মনে মনে আল্লাহর দিকে দু’হাত তোলে তাকায়“শিশুকে জান্নাতের কোলে নাও, সে তো পৃথিবীতে এসে কোনো অপরাধ করেনি। পারলে, আমাদের ক্ষমা করো। আমরাই তো এই নির্মম পৃথিবীর সহযাত্রী, নীরব অপরাধী।” গোলাপি আলোয় কুয়াশায় ঢাকা থাকা শহরের বুকে দাঁড়িয়ে শীতল বুঝতে পারে-এই গল্পের এখানেই সমাপ্তি নয়। তার সামনে অপেক্ষা করছে আরও অসংখ্য কান্না, আরও পরিত্যক্ত শৈশব, আরও অমানবিক রাত্রি। বাতাসের স্তব্ধতার ভেতর সে যেন শুনতে পায় অসংখ্য মাতৃহারা আর্তনাদ। যেসব শিশু কোনো হাসপাতালের করিডোরে, কোনো ফুটপাথে, কিংবা কোনো শীতল ডাস্টবিনের পাশে নিঃশব্দে শুয়ে আছে।
শীতল হাঁটতে-হাঁটতে নিজের ভেতরেই এক অদৃশ্য শপথ নেয়। যতদিন তার পা চলবে, শ্বাস থাকবে, ততদিন অন্তত একজন অসহায়ের পাশে দাঁড়াবে। কারণ কোনো এক স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকেই একদিন তার নিজের জীবন ভেঙে পড়েছিল। আজও তার চোখের সামনে ভাসে সেই দৃশ্য। হঠাৎ মায়ের হাত ছেড়ে দেওয়া মুহূর্ত। শীতলের মা বাবা মিউচুয়াল সেপারেশনে গিয়েছিল। ওর বাবা এই সর্ম্পকে অ্যাডজাস্ট করতে পারলেও ওর মা সেটাকে একসেপ্ট করতে পারেনি। ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকা একসময় ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে আত্মবিসর্জন দেয়।
শীতলের সেই ক্ষত কখনো আর শুকাবে না। হয়তো সেই কারণেই শীতল বারবার খুঁজে ফেরে পরিত্যক্ত জীবনগুলোকে। নিজের হারানো মায়ের ছায়া যেন তাদের মধ্যে খুঁজে পায়।
গোলাপি আলোয় দাঁড়িয়ে সে জানে, পৃথিবী বদলানো তার একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবু যদি একজন শিশুও তার স্পর্শে একটু নিরাপত্তা পায়, একটু মানবিক আশ্বাস পায়-তাহলেই এই নিষ্ঠুর শহরের বুকে তার হাঁটা সার্থক।