রক্তপিপাসু

34

তাপসকুমার বর :

সেদিন আমি আর শুভ অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎ বিবেকের সাথে দেখা। অনেকদিন পর। প্রায় পাঁচ বছর পর। বিবেক বলল, ভাবতে পারিনি তোদের সাথে দেখা হয়ে যাবে আজ। আমরা দুজন বিবেককে পেয়ে সেই ছেলেবেলার স্মৃতিতে হারিয়ে গেলাম। কত কথা হলো তিনজনে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এতদিন তুই কোথায় ছিলি? কোনো উত্তর নেই! শেষে বললো, সে অনেক কথা। একদিন আমার বাড়িতে আয়। সব বলবো তোদের। আর কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না আমি।

হঠাৎ অনুভব করলাম, কিছু একটা আতঙ্ক আমাদের চারপাশে ঘুরছে। মনে হলো, শুভকে বলবো। ও তো ভূতপ্রেত, পিশাচ, ভ্যাম্পায়ার, ডাইনি এসবে বিশ্বাস করে না। এরা যে রাতের অন্ধকারে তাদের সাম্রাজ্যে বিরাজ করে, এ কথা শুভ কখনো বিশ্বাস করতে চায় না। ও তো বলে যত সব ভ-ামির ডিপো। ওগুলো কিছু না। মানুষের ভুল ধারণা। এ বিষয়ে কয়েকবার শুভর সঙ্গে বাগদ্বন্দ্ব বেধে গিয়েছিল। তবুও নিজেদের প্রতি একটা গভীর ভালোবাসা আছে।

বিবেক বললো, আমার বাড়িতে তোরা দুজন একদিন ঘুরতে আয়। তোরা এলে ভালো লাগবে। না বলতে পারিনি। দুজনে অনেকদিন পর দেখা। তাই বলেছিলাম অফিসে গরমের ছুটি পড়লে তোর ওখানে গিয়ে দুজনে ঘুরে আসবো। তখন বিবেকের সে কি অট্টহাসি।  সেই হাসির মধ্যে একটা ঘৃণ্য দৃষ্টি লুকানো ছিল।

বাড়ি ফিরতে হবে দুজনকে। ৬ : ২০ এ  ট্রেন। বিবেককে বললাম, ট্রেন এসে পড়বে। বিবেক সাদা কাগজে ঠিকানা লিখে দিয়ে বললো, আসিস তোরা। ভুলে যাস না কিন্তু। তোদের জন্য আমি অপেক্ষায় থাকবো। সত্যি বিবেকের জন্য কষ্ট হচ্ছিল দুজনের। শুভ বিবেককে বললো, ভাবিস না। আমরা যাবো। তবে ভালো খাওয়াতে হবে, বন্ধু। এ কথা বলতে বলতে ট্রেন এসে পড়লো। বিবেককে বিদায় জানিয়ে আমরা দুজন ট্রেনের পথে রওনা দিলাম।

বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। বিবেকের কথা মাথায় ছিল না। আর কয়েকদিন পর অফিসে গরমের ছুটি পড়বে। আমি আর শুভ ভাবলাম, বিবেকের ওখানে এক সপ্তাহের জন্য ঘুরে আসবো। অফিসে ছুটি পড়ার একদিন আগে বিবেককে জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমরা দুজন ওর ওখানে যাচ্ছি। কথার মধ্যে বিবেকের সে কি অট্টহাসি। ভালোলাগলো না মোটেও।

সূর্যোদয়ে দুবন্ধু শহর থেকে পলাশপুর গ্রামের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলাম। সেদিন রবিবার ট্রেনে প্রচুর ভিড়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ট্রেনে বসে আমি আর শুভ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। পলাশপুরে পৌঁছাতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। ঘড়িতে তখন পৌনে সাতটা। দুজনে একটা হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে বিবেকের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। একটা দোকানে গিয়ে বিবেকের বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞাসা করতে দোকানদার অবাক হয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। পরে বললেন, ওই জঙ্গলের পাশ দিয়ে কুড়ি মিনিটের হাঁটাপথ। ওখানে একটা শ্মশান দেখতে পাবেন। ওই শ্মশান ফেলে একটা ভাঙা বাড়ি। ওটাই বিবেকের বাড়ি। দোকানদার আর কিছু বললো না। যা হোক অনেক পথ জার্নি করে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম দুজনে। তাড়াতাড়ি রওনা দিলাম। তখন ঘড়িতে আটটা বাজে। জঙ্গলের পাশ দিয়ে দুজনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো পেছনে কেউ আমাদের ধাওয়া করছে। শুভকে বলতেই ও বললো, কোথায় কে? যতসব।

শুভ যাই বলুক না কেন রকউ আমাদের পিছু ধাওয়া করছে সেটা আমি  বেশ বুঝতে পারছি। শ্মশানের কাছে একটা বটগাছ। সেখান থেকে একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্ক ভেসে আসছে মনে হলো। এদিকে জঙ্গলে শিয়ালের কোরাস, প্যাঁচার ডাক। সব মিলেমিশে হাড়হিম করা একটা ভয় বুকের মধ্যে চেপে বসেছে। আমি আর শুভ ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। বাঁক ঘুরতে যাবো হঠাৎ একটা মানুষকে দেখে চিৎকার করে উঠলাম দুজন। বিবেক তখন বললো, কেমন ভয় দেখালাম। শুভ রেগে গিয়ে বিবেককে দুচার কথা শুনিয়ে দিল। আমি শুভকে চুপ করতে বললাম। বিবেক তার বাড়িতে আমাদের নিয়ে গেল। বাড়িতে ইলেকট্রিসটি নেই। মোমের আলোয় বাড়িটাও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। বাড়ির এমন ভগ্নদশা দেখে মনে হয়, হাজার বছরের রাক্ষুসে জীর্ণতা নিয়ে ভ্যাম্পায়ারের মতো তাকিয়ে আছে।

ক্লান্ত শরীর আর অবসন্ন মনে ভালো লাগছে না কোনো কিছু।

বিবেককে বললাম, আমাদের এখন একটু শয্যার ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হয়,  ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। বিবেক হেসে বললো, এখানে রাতে  কেউ ঘুমোয় না, সবাই জেগে থাকে।

কারা জেগে থাকে? প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বিবেকের সেই বিদ্রƒপভরা হাসি মোটেও ভালো লাগছিল না। চোখের কোণে ঘুম নেমে আসছিল দুজনের। বিবেক ওপরের ছাদে আমাদের শয্যার ব্যবস্থা করে দিল। শয্যা পেয়ে আমরা দুজনে ঢুলু ঢুলু চোখে বিছানায় গেরাম। তখন হঠাৎ ঘড়িতে ঢং ঢং করে  বারোটা বেজে উঠলো। কোথা থেকে একটা আতঙ্ক সারাবাড়িতে ছড়িয়ে পড়লো। দেখলাম,হাড় হিম করা মু-ুকাটা ধড়, রক্তপিপাসু দৃষ্টি চকচকে রাক্ষুসে দাঁত’।

এই ভয়ঙ্কর দৃশ্যে  দুজনের হৃৎপি- বেরিয়ে আসতে চাইছে। রক্ত হিমকরা এক শীতল ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়ায়। ঘাম ঝরছে। চিৎকার করে উঠলাম। বিবেক ছুটে এসে বললো, কি হয়েছে? কিছুক্ষণ চুপ থেকে সববললাম। সেই বিদ্রƒপভরা হাসি হেসে বললো, এটা  তোদের মনের ভুল। ঠিক আছে,শুয়ে পড়। কাল সকালে কথা হবে। এখন রাতে আমাকে একটু বেরোতে হবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম  রকাথায়? কোনো উত্তর নেই। বিবেক চলে গেল।

সেদিন রাতে ভালো ঘুম হয়নি। ঘুম থেকে উঠতে  পৌনে আটটা বেজে গিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখি বিবেক খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। থালিতে সাজানো ফুলকো লুচি আর আলুর তরকারি। আমি আর শুভ হাতমুখ ধুয়ে সোজা খাবার আসরে বসে গেলাম। বিবেক খেলো না। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আগের রাতের ঘটনার কথা। বিবেক কিছু বললো না…।  তার সেই অট্টহাসি মোটেও ভালো লাগছিল না। বিবেক বললো চল, শ্মশান থেকে ঘুরে আসি। শুভ রাজি হচ্ছিল না। ও বলল,  এই বেলা আমরা বাড়ি ফিরতে চাই। এ কথার বিবেকের একটা হিংস্র দৃিিষ্ট লক্ষ করলাম। বুঝতে পারছিলাম না, কি সব হচ্ছে এখানে। বিবেক এতো অনুনয় করলো। কথা রাখতে হলো শেষ পর্যন্ত। দুপুরে মাংসের  ঝোল, গরম গরম দুটো রুটি, ভাত, ডাল ও চার রকমের মিষ্টি পেয়ে আগের রাতের ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা প্রায় মাথা থেকে মুছে গিয়েছিল। চারিদিকে গাছের সারি। যেন জীবনান্দের কবিতার বনভূমির রাজত্বে এসে পড়েছি। বনের প্রাকৃতিক শোভা শুভকে পাগল করে দিয়েছিল। শুভ বললো, এক নতুন প্রকৃতির রূপ রাতের অন্ধকারে হয়ে ওঠে কখনো এক রক্তপিপাসু রাক্ষুসে মানবী।

সত্যি তো এমন প্রকৃতি কার না ভালো লাগে। কিন্তু একটা অজানা হিংস্র হায়নার হাত লুকিয়ে আছে যেন এই জঙ্গলে। সেদিন সূর্যটা যেন তাড়াতাড়ি অস্ত গেল মনে হলো। সেই রাতের বিভীষিকা কথা মনে বারবার আঘাত হানছে।

সেদিন বিবেক রাতের খাবার দিয়ে কোথায় যেন বেরিয়ে গেল। সাড়া আমরা দটি প্রাণী। আমি আর শুভ। খাওয়াদাওয়া করে দুজন ঘুমুতে যাবো। চাঁদের আলোটা জানলা থেকে সোজা মুখে এসে পড়েছে। জানলাটা বন্ধ করার জন্য যেই জানলার পাশে গেলাম;  সেখানে দেখতে  পেলাম বিবেককে। দূর থেকে ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছে না। সবকিছু অস্পষ্ট। শুভকে ডাকলাম। দুজনে চুপিসারে দরজা খুলে পাশের বারান্দা দেখতে গেলাম। যা দেখলাম, বলার ভাষা নেই। এক পৈশাচিক দৃশ্য। বিবেক আর মানুষ নেই। একটা নরকঙ্কালরূপী ভ্যাম্পায়ার। একটা মানুষের গলার নলি ছিঁড়ে গোগ্রাসে রক্তপান করছে। এই দৃশ্য দেখে শুভ চিৎকার করে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে নরকঙ্কালরূপী দানব বিবেকের চোখ আমাদের  দিকে এসে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে দৌড় দিলাম ভেতরে। দুজনের পিছু ধাওয়া করলো সেই নরকঙ্কাল, সে এক ভয়ঙ্কর হুঙ্কার :

চোখে ফসফরাসের মতো প্রতিশোধের তীব্র জ্বালা।

তখন রাত প্রায় বারোটা। মাথা কিছু কাজ করছে না। শুভ আর আমি ভাবলাম, আগে এই বাড়ি থেকে যেমন করে হোক আমাদের বের হতে হবে। তা না হলে এই নরকঙ্কাল আমাদের ছিঁড়ে খাবে। একদিকে জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে হায়নাদের চিৎকার। সারা বাড়ি অন্ধকারে থৈ থৈ করছে। শেয়ালের কোরাস। প্যাঁচার ডাক। সব মিলে ভয়ংকর  পৈশাচিক দৃশ্য।

মনে হয় মিশরীয় সভ্যতার আদিম মমি ঘুম থেকে জেগে উঠেছে।

ওই হাজার হাজার নরকঙ্কালরূপী মমি সঙ্গে নিয়ে।

পালাবার পথ নেই। যা হয় হবে। সাহস করে দরজা খুলতেই সামনে নরকঙ্কাল। হাড় হিম করা ভয়। চোখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। দাঁতগুলো হিংস্র। পেছনে আরো কত কঙ্কাল। মনে হয়, শিকারের গন্ধ পেয়েছে।

সঙ্গে সঙ্গে আমি আর শুভ পেছনের বেলকনি দিয়ে প্রাণপণে দৌড় মারলাম।  মনে হচ্ছে, হাজার নরকঙ্কাল রক্তের নেশায় জন্য তেড়ে আসছে। মাথা কাজ করছে না দুজনের। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাগলের মতো দুজনে ছুটছি। ছুটতে ছুটতে কখন যে ভোর হয়ে গেছে, খেয়াল  নেই। এক কাঠুরে আমাদের পাগলের মতো ছুটতে দেখে ডেকে আমাদের তার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

উনার কাছ থেকে সব জানতে পারি…. বিবেক প্রায় আট বছর আগে মারা গেছে। কেউ ওকে শ্মশানের পাশে একটা বটগাছে মৃত অবস্থায় ঝুলিয়ে দিয়েছিল। তার সারা শরীরের মাংস কেউ যেন খুবলে খেয়েছিল এ ঘটনার দুমাস পর ওই এলাকা থেকে গরু-মোষ ছাগল, মানুষের মৃতদেহ পাওয়া যেত গলার কাছে কাটা। তারপর থেকে ওখানে এওই এলাকার কাউকে খুব একটা দেখা যেতো না। আমরা কিছু বললাম না। কাঠুরিয়া আমাদের লোকালয় পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এসেছিল। কাঠুরিয়াকে প্রণাম জানিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম।