ওবায়দুল সমীর »
আর কতদূর বাবা?
‘ঐ বিশাল বটগাছটা দেখছো, ওখান পর্যন্ত যাব। ওটাই ভাটারা ঈদগাহ মাঠ। এখনো ঈদগাহ আছে কি না জানি না। দেখেই ফিরে যাবো। ছোটবেলায় ওখানে কত ঈদের নামাজ পড়তাম, কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানটায়!’
বৈশাখের বিকেল। বাপছেলে হাত ধরাধরি করে শুকনো নদীর পাড় দিয়ে হাঁটছে। সজিবের জন্মই শহরে। বড় দাদু মারা যাওয়ার পর তেমন আর গ্রামে আসা হয় না। নদীর পাড় ধরে হাটতে হাটতে সজিব জানতে চাইল, ‘বাবা, নদীটা কেমন যেন! পানি নেই, কেবল ধুধু বালুচর। নদী কি কখনও এমন হয়।’
বাবা বললেন, ‘একসময় নদীটা ছিল এ অঞ্চলের প্রাণের স্পন্দন। জেলে, মাঝি, কৃষক, ব্যবসায়ী সবার জীবিকা নির্ভর করত এই নদীর ওপর। পাড়ের বাজারে সারি সারি দোকান ছিল, বড় বড় নৌকায় আসত পাট, চাল, সরিষার বস্তা। কৃষকেরা ফসল তোলার পর নদীপথেই মাল নিয়ে যেত শহরে। কিন্তু এখন? নদীটা যেন নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে। ধুধু বালুচরে মাঝে মাঝে কচুরিপানার ঝোপ, শুকনো নৌকার কঙ্কাল পড়ে আছে।’
কথা বলতে বলতে ওরা ভাটারা বটতলায় চলে এসেছে। বটের ছায়ায় উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখে বাবা সালাম দিলেন। তিনি চিনতে পেরে বাবাকে বললেন, ‘তুমি মিয়া বাড়ির কিসলু ভাইয়ের ছেলে না?’
‘হা, গফুর চাচা।’ বাবা উত্তর দিয়ে সজিবকে পরিচয় করিয়ে দেন।
এককালে এই মিরগী নদীর খেয়াঘাটের সবচেয়ে চৌকস মাঝি ছিল সে। তখন তার বয়স ছিল চৌদ্দ কি পনেরো। শক্ত হাতে দাঁড় বাইত, মানুষ পার করত। ভরা বর্ষায় যখন নদী ফুলে উঠত, তখনও গফুরের নৌকা নির্ভয়ে ঘাট পারাপার করত।
‘কেমন আছো দাদাভাই’ বৃদ্ধ লোকটি সজিবকে বললেন।
‘আচ্ছা দাদাভাই, তুমি কি এখানকার লোক? বলতো দাদাভাই, এটা কেমন নদী! পানি নেই! নৌকা নেই!’
গফুর দাদা বললেন, “এই নদীর বুকেই কত পালতোলা নৌকা দেখেছি, নৌকায় ঢাকঢোল বাজিয়ে কত নববধূ ঘোমটা দিয়ে শ্বশুরবাড়ি গেছে। এখন কেউ আর নদীর দিকে ফিরেও তাকায় না।”
গফুর মাঝি ফ্যালফ্যাল করে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। সজিবকে দেখে হাসে, “জানো দাদাভাই, এই নদীর সাথে আমার কত স্মৃতি? খেয়াঘাটের পাশেই একটা পুরোনো পাকুড় গাছ ছিল। নৌকা পারাপারের ফাঁকে আমি আর আমার বন্ধুরা ওখানে বসে কত গল্প করতাম! ঘাটে তখন সারাদিন হাটবাজারের ভিড় লেগে থাকত। নৌকা ছাড়া কোনো পথই ছিল না। আর এখন? দাঁড়টা হাতে নিলেই মনে হয় সবকিছু একটা স্বপ্ন ছিল।”
গফুর মাঝি বলতে থাকেন, ‘যখন মিরগী নদী খরস্রোতা ছিল, তখন দুইপাড়ের গ্রামগুলোর জীবন ছিল আনন্দময়। পালতোলা নৌকায় ছিল এক বিশেষ চিহ্ন; সেগুলো দিয়ে পণ্য পরিবহন করা হত। বর্ষার সময় নদীর জল ফুলে-ফেঁপে ওঠার সাথে সাথে ব্যবসার গতিও বেড়ে যেত। গ্রামের নববধূরা নৌকায় চড়ে সংসারের নতুন অধ্যায় শুরু করত। মাঝিদের গাওয়া গান আর নদীর ঢেউয়ের সুর গ্রামে এক নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করত। নদী ছিল এখানকার সংস্কৃতি, ইতিহাস, এবং আত্মার একটি অংশ। কালের বিবর্তনে সব হারিয়ে গেছে। এখন বড় বড় রাস্তা হয়েছে, খুব সহজেই যাতায়াত আর মাল পরিবহন করা যায়। নদীকে আর কেইবা মনে রাখে!”
গফুর দাদা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
সজিব চুপ করে থাকে। তার বুকের ভেতর কেমন একটা কষ্ট দোলা দেয়।
বাবা বলেন, ‘সময়ের সাথে সাথে নদীর শীর্ণ ধারা গ্রামবাসীদের জীবনে এক শূন্যতা নিয়ে আসে। পানি সংকটের কারণে কৃষকরা তাদের জমি চাষ করতে পারে না, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। পালতোলা নৌকা এখন শুধুই স্মৃতি। পানির অভাবে মানুষ আর ঐতিহ্যবাহী জীবিকা ধরে রাখতে পারছে না। নদীর প্রবাহ মরে যাওয়ায় প্রভাব পড়েছে সমাজের অর্থনীতি ও পরিবেশের উপর।’
সজিব জানতে চায়, ‘বাবা, নদী কি আর কোনদিন আগের মতো হবে না?’
বাবা বললেন, ‘নদী পুনরুজ্জীবিত করার জন্য স্থানীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। নদীর পাড়ে গাছ লাগিয়ে মাটি ক্ষয় রোধ করা যায়। এটি নদীর পানিপ্রবাহের স্থায়িত্ব বাড়ায়। নদীর তলদেশ খনন করলে পানিধারণ ক্ষমতা বাড়বে এবং শুষ্ক মৌসুমেও পানির প্রবাহ বজায় থাকবে। তাছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততার পাশাপাশি শিক্ষা ও সচেতনতা তৈরি সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থাগুলো নদীর গুরুত্ব নিয়ে প্রচারণা চালাতে পারে। কিন্তু দূর্ভাগ্য এসব নিয়ে কেউ ভাবছে বলে মনে হয় না।’
গফুর মাঝি বললেন, ‘নদীর প্রতি ভালোবাসা ও যত্নই পারে একটি মৃতপ্রায় নদীকে নতুন প্রাণ দিতে। নদী যদি আবার বাঁচে, তার সাথে জীবনের সুখ-সমৃদ্ধিও ফিরে আসবে।’
সজিব লক্ষ্য করলো, বালুর ওপারে কয়েকটা পানকৌড়ি উদাস চোখে বসে আছে, যেন তারাও অপেক্ষায় আছে নদীর ফেরা দেখার।





















































