ভুল পিডিবির, মাশুল গ্রাহকের !

0
282

বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল#

মোহাম্মদ রফিক :
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর গত প্রায় তিনমাস যাবত কোন মিটার রিডার কারো বাসায় গিয়ে মিটার পর্যবেক্ষণ করেননি। তব্ওু চট্টগ্রামের বিপুল সংখ্যক গ্রাহককে দেওয়া হয়েছে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। করোনাকালে অতিরিক্ত অংকের বিল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন শত শত গ্রাহক। বিশেষ করে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।
হাটহাজারি ১ নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়াডের বাসিন্দা মোহাম্মদ সেলিমের অভিযোগ, গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে বিদ্যুৎ বিল দিয়েছিল ৫১৬ টাকা। পরবতী তিন মাসের (মার্চ-এপ্রিল, মে) তার বিল এসেছে চার হাজার ৩২১টাকা।
ফেব্রুয়ারির মাসে তিনি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন প্রায় ৮০ ইউনিট। তার বক্তব্য হল-তিন মাসে একসঙ্গে বিল আসলে সেটি দেড় হাজার টাকার কিছু বেশি আসত। এ তিন মাসে কোন মিটার রিডারও তার বাসায় যাননি। তবুও বিদ্যুৎ বিলে এতটা হেরফের কেন, প্রশ্ন সেলিমের ।
মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা নিজাম হায়দারের প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিল আসে ৮০০ টাকার মধ্যে। কিন্তু লকডাউনের পরিস্থিতির কারণে গত তিন মাসের বিল এসেছে ৬ হাজার টাকা। তার অভিযোগ, বাসায় ফ্রিজ আর টেলিভিশন, কয়েকটি ফ্যান ছাড়া অন্যকোন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নেই। কেন এতটাকা বিল তাকে ধরিয়ে দেওয়া হল, প্রশ্ন হায়দারের ।
শাহেদ আলী গত ১৫ বছর ধরে নগরের হামজারবাগ এলাকার ভাড়া বাসায় থাকছেন। ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে বিল দেয়া হয়েছে ১০০০ টাকা। তাকে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের বিল দিয়েছে ৯০০০ টাকা। চট্টগ্রাম শহরে গত ১৫ বছরে এত টাকার বিদ্যুৎ বিল চোখে দেখেননি বলে জানান তিনি। গড়ে প্রতিমাসে বিল করা হয়েছে তিন হাজার টাকা। এটা কীভাবে সম্ভব, প্রশ্ন শাহেদ আলীর।
শাহেদ আলী বলেন, ‘মিটার রিডার বাসায় না এসে তাকে অনুমান নির্ভর বিদ্যুৎ বিল দেয়া হলেও, ৯০০০ টাকার বিদ্যুৎ বিল তো হওয়ার কথা নয়। জানা গেছে, এ চিত্র শুধু চট্টগ্রামের নয়, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়ও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বিল পাওয়ার অভিযোগ সংক্রান্ত একাধিক সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
নগরের চকবাজার এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হক জানান, সাধারণত প্রতিমাসে তার কাছে বিদ্যুৎ বিল আসে ৬০০ টাকা। গত তিনমাসে তার চেয়ে ৭ গুণ বেশি বিদ্যুৎ বিল তাকে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আগ্রাবাদ বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় সুপ্রভাতের। তারা দাবি করেন, সাধারণত মিটার রিডাররা বাসায় গিয়ে মিটারের রিডিং নিয়ে আসেন। ওই রিডিং থেকে আগের মাসের প্রাপ্ত রিডিং বাদ দিলে এক মাসে ব্যবহৃত বিদ্যুতের একটি হিসাব পাওয়া যায়। নিয়ম অনুযায়ী হিসাব করে বিদ্যুৎ বিল করা হয়।

পিডিবি চট্টগ্রামের এক কর্মকর্তা জানান, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে গত তিন মাস মিটার রিডাররা গ্রাহকের বাসায় যাননি। অনুমানের ভিত্তিতে ওই তিন মাসের বিল তৈরি করা হয়েছে। এদিকে চলতি জুন মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। তার এ ঘোষণায় চিন্তিত গ্রাহকেরা।
তবে পিডিবি চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে মিটার রিডারদের গড়ে ২০-২৫ শতাংশ কমবেশি করে বিল করতে বলা হয়েছিল। সেখানে ‘ভুলক্রমে কিছু বিল অস্বাভাবিক বেশি হয়েছে। তিনি জানান, মিটার রিডাররা হাতে লিখে বিল তৈরি করে জমা দেন। পরে তা কম্পিউটারে পোস্টিং দেয়া হয়। সেখান থেকে বিল তৈরি হয়ে গ্রাহকদের কাছে যায়। অনুমানের ওপর বিল করা কিম্বা কম্পিউটারে পোস্টিং দেয়ার সময় ভুলের কারণেই বিলের অংক বেশি হয়ে গেছে।
গ্রাহকদের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল দেয়ার বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয়েছে বলে মন্তব্য করে পিডিবি চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী মো. শামসুল আলম বলেন, ‘কোন কোন ক্ষেত্রে গ্রাহকেরা অস্বাভাবিক বিল পেলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। অনেকেই নিকটস্থ বিদ্যুৎ বিভাগে যোগাযোগ করছেন। তাদের বিল ঠিক করে দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি চলতি মাসে (জুন) মিটারের রিডিং দেখে বিল করা হলে সেখানেও সমন্বয় করা হবে।’
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউর রহমান বলেন, ‘গত মে মাস থেকে তাদের মিটার রিডাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার দেখে বিল করা শুরু করেছেন। ফলে আগের বিলের সঙ্গে বর্তমান রিডিং মিলিয়ে নতুন বিল আসবে।’
পিডিবি চট্টগ্রামের আরেক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ বিল আসে মিটারের ইউনিট ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে। কেউ বেশি অংকের বিল পেলে আর ওই বিলের টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে থাকলে পরের মাসে তার ব্যবহৃত ইউনিটের সংখ্যা অনেক কম আসবে। ফলে স্বাভাবিকভাবে তার বিলও কম হবে। কেউ বিল জমা দিতে না চাইলে পরের মাসে গিয়ে তার আসল ব্যবহারের বিল আসবে।
নগরের পাথরঘাটা এলাকার বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘শহর এলাকার ১০ নম্বর রুটে বাস চালাই। করোনার কারণে গত প্রায় আড়াইমাস বেকার ছিলাম। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের ৬জন সদস্য নিয়ে কীভাবে আছি, সেটা ভাষায় বলতে পারব না। করোনা মহামারির মধ্যে ভুতুড়ে বিল। আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের প্রতি এটা সুবিচার হয়নি।’
জানা গেছে, শুধু আমজাদ নয়, গত তিন মাসের বাড়তি বিলের এ ধকল পোহাতে হচ্ছে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার হাজার হাজার গ্রাহককে। করোনাকালে বিত্তবানরা সংকট না পড়লেও বিপাকে পড়েছেন আমজাদের মতো আর্থিক টানাপড়েনে থাকা মানুষেরা।
ভুক্তভোগীরা জানান, করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শহরে ব্যবসা নেই। অনেকের চাকরি নেই। কারও চাকরি থাকলেও ঠিকমতো বেতনও পাচ্ছেন না। এরমধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ ভুতুড়ে বিল আদায় করছে। এটা নৈরাজ্য আর গাফিলতি। গ্রাহকদের বক্তব্য, ভুল করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ভুল যদি বিদ্যুৎ বিভাগ করে তাহলে বিল ঠিক করতে গ্রাহককেরা কেন দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে।