বিট পুলিশিং : জনসম্পৃক্তি ও জনসেবাই মুখ্য

0
409

মোহাম্মদ সারওয়ার আলম »

বর্তমান সময়ে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ একটি বিস্ময়কর সাফল্য। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা “আমার গ্রাম আমার শহর” কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামে নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারিত করে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। উন্নয়নের এ জয়যাত্রায় জনগণের পাশে থেকে পুলিশের সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়ে আধুনিক নগর সুবিধা তথা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে বাংলাদেশ পুলিশ অঙ্গীকারাবদ্ধ। উন্নয়নের এ অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে এবং টেকসই করতে হলে দেশের প্রধান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসাবে পুলিশকেও একইযোগে এগিয়ে যেতে হবে। আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশের সাথে তাল মিলিয়ে পুলিশের সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে বিট পুলিশিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে।
পুলিশকে কীভাবে জনমুখী ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা যায়, প্রতিটি থানা এলাকার দূরবর্তী অঞ্চলে কীভাবে পুলিশের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়, পুলিশের কার্যক্রমে কীভাবে আরও গতি আনা যায়, এবং সর্বোপরি বিদ্যমান জনবলের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে পুলিশকে কীভাবে অধিকতর গতিশীল ও জনসেবমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়- তারই একটি সমন্বিত প্রায়াস হলো বিট পুলিশিং কার্যক্রম। পিআরবি ৩৫৬(খ) এবং ১০৮৭ তে বিট পুলিশিং এর বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিট পুলিশিং এর শ্লোগান হলো ‘আপনার পুলিশ আপনার পাশে, তথ্য দিন সেবা নিন’ ও ‘বিট পুলিশিং বাড়ি বাড়ি, নিরাপদ সমাজ গড়ি’।
বিট পুলিশিং এর লক্ষ্য হলো পুলিশের সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। পুলিশের সেবাকে সরাসরি থানা থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃতকরণের মাধ্যমে ইউনিয়ন/ওয়ার্ড পর্যায়ে নিবিড় পুলিশিং করা যাবে। থানায় মোতায়েনকৃত জনবলের সর্বোত্তম ব্যবহার করা হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে জনসম্পৃক্তির মাধ্যমে এলাকায় উত্থিত বা বিরাজমান সমস্যার প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এলাকার আইন-শৃঙ্খলা ও অপরাধ সংক্রান্ত অগ্রিম গোপন সংবাদ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। সমাজ থেকে অপরাধ ভীতি দূরীকরণ পূর্বক জনমনে স্বস্তি ও আস্থা স্থাপন করা যাবে বলে বিশ্বাস করি।
বিট পুলিশিং এর গঠন জেলার অন্তর্গত থানা এলাকার প্রত্যেকটি ইউনিয়নে একটি বিট, পৌরসভার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে একটি বিট এলাকা গঠিত হবে। মেট্রোপলিটন বা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সাধারণভাবে একটি ওয়ার্ড নিয়ে একটি বিট গঠিত হবে। তবে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের আয়তন ও জনসংখ্যা, অপরাধের ধরণ ও প্রকৃতি বিবেচনায় একাধিক বিট গঠন করা যেতে পারে।
প্রতিটি বিটে একজন সাব-ইন্সপেক্টর বিট ইনচার্জ হিসাবে থাকবেন, যিনি বিট অফিসার নামে পরিচিত হবেন। প্রত্যেকটি বিটে একজন করে এএসআই সহকারী বিট অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বিটে তারসাথে সহযোগী হিসেবে সাধারণভাবে দুইজন কনস্টেবল থাকবেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার অধিভূক্ত বা আওতাধীন এলাকার বিটগুলোতে বিট অফিসার/সহকারী বিট অফিসারদের মোতায়েন ও দায়িত্ব বণ্টন করবেন, থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত/অপারেশনস) সহযোগী সমন্বয়কারী কর্মকর্তা হিসেবে থাকবেন। সার্কেল এ্যাডিশনাল এসপি/এএসপি বা জোনাল এডিসি/এসি তার আওতাধীন অঞ্চলে সকল বিটের কার্যক্রমে তদারকির দায়িত্ব পালন করবেন।
কর্মকৌশল হিসেবে বিট কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে বিট এলাকায় গমন করবেন এবং নির্ধারিত সময়কাল সেখানে অবস্থান করবেন এবং সময়কাল বিট কার্যালয়ে লিখিতভাবে নোটিশ/বিজ্ঞপ্তি আকারে জানিয়ে দিতে হবে। বিট কর্মকর্তারা বিট কার্যালয়ে আগত সেবাপ্রার্থীদের বক্তব্য শুনবেন এবং প্রয়োজনীয় পুলিশি সেবা প্রদান করবেন। স্থানীয়ভাবে বা এলাকায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে সে সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সেবাপ্রার্থীদের আইনগত পরামর্শ প্রদান করবেন। প্রয়োজনীয় মুহূর্তে এলাকাবাসী যেন বিট কর্মকর্তার সাথে দিনরাত্রি যে কোন সময়ে যোগাযোগ করতে পারেন সেজন্য বিটের অনুকূলে বরাদ্দকৃত মোবাইল সবসময় চালু রেখে কল গ্রহণ করতে হবে। দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদন পরবর্তী মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার/ডিসি (ক্রাইম ডিভিশন) বরাবর দাখিল করতে হবে।
বিট অফিসার সাধারণত যে সকল দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করবেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বিটের আওতাধীন পাড়া/গ্রাম/মহল্লার নাম উল্লেখ পূর্বক গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহ নির্ধারণসহ একটি ম্যাপ তৈরি করবেন। গুরুতর অপরাধ, বিশেষ করে খুন, ডাকাতি, দস্যুতা, ধর্ষণ ইত্যাদি সংবাদ প্রাপ্তির সাথে সাথে দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাবেন, ক্রাইম সিন সুরক্ষিত (চৎড়ঃবপঃ) করবেন, প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এছাড়া যেকোন অপরাধ সংঘটিত হলে উক্ত অপরাধ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করবেন এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সহযোগিতা করবেন। বিট এলাকায় রুজুকৃত মামলাসমূহ সাধারণভাবে বিট অফিসার তদন্ত করবেন। তবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যে কোন কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব অর্পণ করতে পারবেন। বিটের আওতাধীন এলাকার সকল জিআর/সিআর/সাজা ওয়ারেন্টের তালিকা প্রস্তুত এবং ওয়ারেন্ট তামিল করবেন। বিটের আওতাধীন এলাকার শীর্ষস্থানীয় অপরাধীর তালিকা প্রস্তুত করবেন। প্রতিটি বিট এলাকায় মাদকসেবী, ব্যবসায়ী, অর্থলগ্নীকারী, খুচরা বিক্রেতা ও পরিবহনকারীদের তালিকা প্রস্তুত করবেন। এছাড়াও চোরাচালানকারী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অপরাধী, চাঁদাবাজ, মানব পাচারকারী, অবৈধ ভূমি দখলকারী, নারীদের উত্ত্যক্তকারী, জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তি, চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অভ্যাসগত অপরাধীদের ও তাদের সহযোগীদের তালিকা প্রস্তুত করবেন। তাদের বাসস্থান ও অপরাধস্থল চিহ্নিত করবেন এবং তাদের উপর নজরদারি করবেন। বিটের আওতাধীন এলাকা সমূহের ভাড়াটিয়াদের তালিকা প্রস্তুত করবেন। বিটের আওতাধীন এলাকার প্রবাসীদের তালিকা প্রস্তুত করবেন। বিটের আওতাধীন এলাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির এবং সেসবের প্রধানদের তালিকা প্রস্তুত করবেন এবং স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পরিদর্শন করবেন। এছাড়াও ব্যবসায়ী সংগঠন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, বিদেশি সংস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবেন। বিটের আওতাধীন এলাকায় বহিরাগত লোকজনের যতদূর সম্ভব বি-রোল ইস্যু করতে হবে। চৌকিদার/দফাদার ও আনসার/ভিডিপি সদস্যদের বিট পুলিশিং এর কার্যক্রমের সাথে সমন্বয় করবেন। তাদের অপরাধ প্রতিরোধ ও পুলিশের সাথে সহযোগিতার জন্য বিশেষ পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন। বিট পুলিশিং কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত রেজিস্টার সংরক্ষণ করবেন।
তদারককারী অফিসার হিসেবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্রিফিং ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন। তিনি নিয়মিতভাবে সেবাগ্রহিতাদের মতামত নেবেন ও বিট অফিসারদের কাজের মূল্যায়ন করবেন। কাজের গুণগত ও সংখ্যাগত মান বিবেচনা করে তাদের পুরস্কার ও শাস্তির জন্য সুপারিশ করবেন। পাশাপাশি প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বিট অফিসারদের প্রেরিত তথ্যাদি সন্নিবেশিত করে জেলা পুলিশ সুপার/ডিসি (ক্রাইম ডিভিশন) বরাবর প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন। প্রতিবেদনের একটি কপি সার্কেল/জোনাল কর্মকর্তা বরাবর প্রেরণ করবেন।
অপরদিকে সার্কেল/জোনাল কর্মকর্তার সার্কেল/জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থানায় অনুষ্ঠিত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বিট অফিসারদের সাথে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত থাকবেন। বিট অফিসারদের সম্পাদিত কাজের গুণগত ও সংখ্যাগত মানের উপর মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কোন বিট অফিসারদের দায়িত্বে অবহেলা বা অন্যকোন বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হলে তাকে সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবেন। পরিদর্শনের ক্ষেত্রে দূরবর্তী বিট এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সর্বশেষে জেলা পুলিশ সুপার/ডিসি (ক্রাইম ডিভিশন) বিট পুলিশিং কার্যক্রম সংক্রান্তে প্রতিবেদন নির্ধারিত ফরমে পুলিশ সদর দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ/মেট্রোপলিটন অফিসে প্রেরণ করবেন।
পুরস্কারের জন্য প্রতি বছর প্রতিটি থানা থেকে একজন শ্রেষ্ঠ বিট অফিসার নির্বাচন করতে হবে। পুরস্কার হিসেবে ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট ও অর্থ প্রদান করা যাবে।
দেশে শান্তি শৃঙ্খলার প্রতি হুমকিস্বরূপ অপরাধ ও তার উৎস খুঁজে বের করা এবং উক্ত অপরাধের ব্যপ্তিকার ও উৎসসমূহের নিমূলকরণের অসীম দায়িত্বেই পুলিশ বাহিনী নিয়োজিত। পুলিশ বাহিনী যেন পেশাদারিত্বের সাথে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে তা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশই হবে জনগণের প্রথম ভরসাস্থল। পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করার সময় সদস্যদের যে শপথ নিয়ে যাত্রা শুরু তারা যেন তা ভুলে না যায়। ভুক্তভোগী এবং যারা আইনি সেবার প্রত্যাশী তারা যেন কোনভাবেই হয়রানি এবং অসদাচরণের শিকার না হয় সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে পারে। অপরাধীদের যেমন অপরাধ করলে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়, তেমনিভাবে কোন পুলিশ সদস্য অসদাচরণ এবং অপরাধে জড়ালে তাকেও আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোন পুলিশ সদস্য যদি অপরাধে জড়িয়ে যায় তার জন্য পুরো পুলিশ বাহিনী বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে, যারা বাহিনীর জন্য বদনাম বয়ে আনে তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করাই কাম্য। যাতে অন্যান্য সদস্যরা অনুধাবন করতে পারে যে, অপরাধ করে কোন ছাড় বা রেহাই পাওয়া যাবে না।

লেখক : প্রাবন্ধিক