ডেঙ্গুর শঙ্কায় নগরবাসী

0
109

মশাময় বন্দরনগরী
রুমন ভট্টাচার্য <<
মশাময় বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। মশার উৎপাত বাড়ায় বন্দরনগরীর মানুষ এখন ডেঙ্গু শঙ্কায় ভুগছেন। ঘরে-বাইরে সবখানেই রক্তচোষা এই প্রাণীটির দাপট। কোথাও বসা কিংবার দাঁড়িয়ে থাকার জো নেই। মশা তাড়াতে অ্যারোসোল, কয়েল বিষাক্ত সব উপকরণই ব্যর্থ হচ্ছে। বন্দরনগরী যেন এক মশাময় নগরীতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। মশা নিধনে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে করোনাকালে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা চিকিৎসা ব্যবস্থায় সংকট আরো গভীর হতে পারে।
নগরবাসীর অভিযোগ, মশার ওষুধ ঠিকমত ছিটানো হচ্ছে না। শুধু নালা পরিষ্কারেই ব্যস্ত চসিক। বড় বড় খালগুলো আবর্জনায় ঠাসা। তবে চসিকের দাবি তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত মশার ওষুধ ছিটাচ্ছেন।
নগরীর পশ্চিম বাকলিয়া ডিসি রোডের বাসিন্দা ফোরকান এলাহী বলেন, ‘কয়েল জ্বালিয়ে, অ্যারোসোল স্প্রে করে ব্যর্থ হয়ে মশারি টাঙিয়ে বসতে হয় প্রতিদিন। মশার কামড়ে পরিবারের সকলেই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হই কি-না সেই ভয়ে দিনাতিপাত করছি। এলাকায় কাউকে কখনো মশার ওষুধ ছিটাতে দেখিনি।’
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা গৌরি বিশ্বাস বলেন, ‘আমার বাসা ষষ্ঠ তলায়। সন্ধ্যার আগেই ঘরে সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দেই। তারপরও মশা থেকে রক্ষা পাচ্ছি না।’
এদিকে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র পদে দায়িত্ব নেয়ার পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে মশক নিধনে ওষুধ ছিটিয়ে ১০০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি শুরু করেছেন। এছাড়া মেয়রের নির্দেশে ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরিদর্শন করে চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের একটি টিম। তারা ঢাকায় মশক নিধন কার্যক্রমের সঙ্গে চসিকের তুলনামূলক পার্থক্য চিহ্নিত করেন। এরপরও তেমন একটা সুফল মিলছে না। মশার ওষুধের মান নিয়ে খোদ মেয়র নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন। এজন্য তিনি সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সহায়তা চেয়েছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম সুপ্রভাতকে বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ৪১টি ওয়ার্ডকে চারভাগে ভাগ করে প্রতিওয়ার্ডে ৪ জন স্প্রে ম্যান প্রতিদিন ওষুধ ছিটাচ্ছেন। এছাড়া ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মেয়রের নির্দেশক্রমে ১০০ দিনের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চলছে। ২৩৩ জন সেবক এর মধ্যে ৫০ জন নর্দমা পরিষ্কারক এবং ৭ জন স্প্রে ম্যান প্রতিদিন ৫৭ জন করে ৪ ওয়ার্ডে কাজ করছে। এক ওয়ার্ডে উপর্যুপরি টানা ২দিন কাজ চলবে।
ওষুধের কার্যকারিতা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বর্তমান ছিটানো মশার ওষুধ আইইডিসিআর থেকে পরীক্ষিত। মশা নিধনে বর্তমানে তিন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে এর মধ্যে লার্ভিসাইড, এলডিও ও এডালটিসাইট।’
তিনি আরো বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় জরুরি। এখানে অন্য সংস্থার সাথে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সম্প্রতি সিডিএ চেয়ারম্যানের সাথে মেয়রের বৈঠক হয়েছে। তিন ফুট অর্থাৎ এক মিটারের অধিক প্রস্থতার নালা পরিষ্কারের দায়িত্ব চসিকের। এরপর নগরবাসীর কথা চিন্তা করে সবখানেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে যাচ্ছি।’
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস সুপ্রভাতকে বলেন, ‘এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া হয়। করোনাকালে যদি ডেঙ্গুরোগ ছড়িয়ে পড়ে, তবে করোনার চিকিৎসাসহ স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সংকট গভীর হতে পারে। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরি।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী সুপ্রভাতকে বলেন, ‘চসিকের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থায় সজাগ থাকতে হবে নগরবাসীকেও। কারণ বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার উৎপত্তি ঘটে পরিষ্কার পানিতে। তাই নিজের বাড়ির আঙ্গিনা ও আশপাশ নিজেদেরই পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। মশামুক্ত নগরী গড়তে হলে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমেই এডিস মশার উৎপত্তি ঘটে। তখন জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এই মশার বংশবৃদ্ধি ঘটবে। মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকেই। কাজেই মশার নিধন খুবই জরুরি। তবে একটি সার্ভে করেছি সেখানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়নি, কিউলেক্স মশার পাওয়া গেছে। এছাড়া চট্টগ্রামে এখনও কোনো ডেঙ্গু রোগীও পাওয়া যায়নি। মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’