এক অপরিচিত সময়ের ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি মানুষ

0
37

রায়হান আহমেদ তপাদার »

সময়ের সাথে সাথে মানুষের মনমানসিকতার ও কাজের ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেকটা স্বার্থপর হয়ে গেছে। মানুষের লোভ বাড়ছে, বিবেক কমছে। মনুষ্যত্বকে মানুষ অবজ্ঞা করছে। সামাজিক পুঁজির যথাযথ ব্যবহার কমে যাওয়ায় মানুষের সামাজিক মূল্যবোধ ও সহভাগিতার বোধ অনেকটাই কমে এসেছে। মানুষ টাকা বা নিজস্বার্থ ছাড়া কোনো কাজ করতে চায় না। আমরা এখন এক অপরিচিত সময়ের ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কোভিড ১৯ এর জ্যামিতিক হারে স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক সংক্রমণের কারণে লক ডাউন শুরু হলেও মানুষকে ঘরে আটকে রাখা যাচ্ছে না। এখনো মানুষ কোভিড ১৯ সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নয় বিধায় লক ডাউন মানছে না। কর্মহীন ও বেকার হয়ে পড়া মানুষের অন্নের প্রয়োজনে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। এতে মানা হচ্ছে না নিরাপদ দূরত্ব ও প্রাসঙ্গিক বিধিনিষেধসমূহ। তাই লক ডাউন যতই দীর্ঘ হবে মানুষের পথে নামার তাড়না ততই বাড়বে। লক ডাউনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন, দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাওয়া মানুষদের। কোভিড ১৯ মোকাবেলায় ও পরিস্থিতির উন্নয়নে সামাজিক পুঁজিকে একটি ইতিবাচক সম্পদ হিসেবে দেখতে পারি। ইতিমধ্যে কোভিড ১৯ এর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তার জন্য এগিয়ে আসা ছোট ছোট ব্যক্তিগত বা সমন্বিত সহায়তার কিছু অনন্য উদাহরণ আমাদের আশাবাদী ও উৎসাহিত করছে। সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও পেশাদার উন্নয়ন সংস্থার সহায়তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত, সামাজিক ভাবে বিভিন্ন সহায়তা প্রদান এ বিপদের মধ্যে একটা ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা পালন করছে। সরকারকে এ প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে এবং মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহায়তা দানের ওপর আস্থা ও ভরসা রাখতে হবে।
বিগত একটি বছর ধরে করোনার তা-ব জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। গত বছরের মার্চ থেকে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ এ বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে কিছুটা কমে এলেও আমাদের আচরণগত কারণে মার্চ মাস থেকে আবার তীব্র আকার ধারণ করেছে। আমরা অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি না, মাস্ক ব্যবহার করি না। বাইরে ঘোরাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন না-করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। করোনার তীব্রতা এবং ভয়াবহতা উপলব্ধি করে সরকার আবারও লকডাউনে যেতে বাধ্য হয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতি আবার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, কে জানে। ক’দিন আগেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করা হলো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশেষজ্ঞরা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে বিবেচনা করেছেন।
কিন্তু বর্তমান করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা চিন্তা করে শঙ্কা বাড়ছে। লকডাউনের ফলে নি¤œআয়ের মানুষের জীবন- জীবিকা আবার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি আবর্তিত হয় বিশেষ বিশেষ দিনগুলোকে কেন্দ্র করে। পহেলা বৈশাখ, রমজান, ঈদ ইত্যাদি উপলক্ষে প্রচুর বেচাকেনা হয়। নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলো চাঙা হয়ে ওঠে তাদের আয়-রোজগার বাড়ানোর জন্য। ডিজাইনাররা নতুন নতুন ডিজাইন বাজারে নিয়ে আসে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য। এককথায়, বাজার গতি পায় ও চাঙা হয়ে ওঠে। কিন্তু এবারে অর্থনীতির এ চাঙা হয়ে ওঠার সময়টায় সবাই প্রায় গৃহবন্দি। এ পরিস্থিতিতে অনেকে ইতোমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন এবং অনেকে হয়তো হারাবেন। কর্মসংস্থান না-হলে মানুষের হাতে পয়সা আসবে কী করে? এর মধ্যে যদি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হয়, তাহলে সার্বিক অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
করোনাকালেই বছর ঘুরে আবার এসেছে পবিত্র রমজান মাস। গত বছর রমজানের আগে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দেশজুড়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এ বছরও একই সময়ে কোভিড রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু আকস্মিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। এ কারণে রমজানের আগে সরকার দেশজুড়ে সাময়িক লকডাউন ঘোষণা করেছে। এই মুহূর্তে মানুষের ব্যাপক চলাচল রোধ করতে পারলে সংক্রমণ কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এরই মধ্যে সংক্রমণ বিপজ্জনক হারে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সংক্রমণের রকমফের বুঝে হয়তো লকডাউনের মেয়াদ আরও বাড়বে। মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধির সব নিয়ম অবশ্যই মানতে হবে।অথচ এরই মধ্যে নিতে হচ্ছে রোজার প্রস্তুতি। রমজান উপলক্ষে আমাদের নিত্য জীবনযাত্রায় খাদ্যাভ্যাসে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। রমজানের পরপরই আসে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ, তারও কিছু প্রস্তুতি থাকে। এই সময় কাঁচাবাজার, রেস্তোরাঁ, বিপণিবিতানে বাড়ে ভিড়। গ্রাম ও শহরের মধ্যে মানুষের ভ্রমণ ও চলাচল বাড়ে। কিন্তু এ বছর নিতে হবে কঠোর সতর্কতা, নয়তো উৎসব বিষাদে পর্যবসিত হতে পারে।রমজান মাসে নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে রোজা পালন ও তারপর উৎসব উদযাপন হয়ে উঠবে অনিশ্চিত। সে জন্য এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। যেতে হলে অবশ্যই মাস্ক পরিধান করবেন। ভিড় ও জনসমাগম এড়িয়ে চলবেন। দূরত্ব বজায় রাখবেন।এক বছর ঈদের জামাকাপড় উপহার ও কেনা নিয়ে মাতামাতি না করলে কিছুই আসে যায় না। রোজা সংযমের মাস, আর এখন সংযমের পরীক্ষা দেওয়ার বছর। খাবারদাবার থেকে শুরু করে পোশাক-আষাক, উৎসব উদযাপন-সর্বত্র সংযম পালন করুন। আপনার ত্যাগ হয়তো আরও শত জীবন বাঁচিয়ে দেবে; বরং লকডাউনে যারা আয়-রোজগার নিয়ে বিপদে পড়বে, অর্থ সাহায্য নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ান।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে উৎসব না হয় নাই উদযাপন করলেন। আপনার অবিমৃশ্যকারিতার জন্য নিজের ও পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। তাই দূরপাল্লার ভ্রমণ বাদ দিতে পারলে ভালো। যদি বাড়ি যেতেই হয়, তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সতর্কতার সঙ্গে ভ্রমণ করুন। কোভিড-১৯ প্রতি মুহূর্তে তার চরিত্র বদলাচ্ছে। স্বাদ-গন্ধ না পাওয়া বা জ্বরের মতো উপসর্গ এখন অনেকেরই হচ্ছে না। কারও শুধু মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, অবসাদের মতো উপসর্গ আছে। যে কোনো সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই পরীক্ষা করান।এরই মধ্যে মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় নেতারা জানিয়েছেন, রোজা রেখে নাক থেকে পিসিআর পরীক্ষার জন্য সোয়াব দিতে কোনো বাধা নেই। তাই পরিবারে বা আশপাশে কারও শারীরিক সমস্যা বুঝতে পেলে দ্রুত পরীক্ষা করান। সেই সঙ্গে আইসোলেশন বজায় রাখুন। করোনা হলে প্রচুর পানি, তরল, ফলমূল, আমিষ খেতে হয়, তাই রোজা ভাঙতে হতে পারে। যাঁদের ডায়াবেটিস ও অন্যান্য রোগ আছে, তাঁরা বেশি সতর্ক থাকবেন। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে বা অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে হাসপাতালে ভর্তির দরকার হতে পারে। রমজান মাস বলে তাতে দেরি করা যাবে না। কারণ, সামান্য দেরিতে ফুসফুসসহ অন্যান্য অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। কোভিড ১৯ কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়। একটি অভিন্ন স্বার্থের জন্য একই সঙ্গে পাশাপাশি থেকে সেরকারি, বেসরকারি, বিভিন্ন পেশাজীবী, সুশীল সমাজ, কমিউনিটিকে সার্বিকভাবে সম্পৃক্ত করে কোভিড ১৯ প্রতিরোধে ও লক ডাউন সফল করতে স্ব স্ব অবস্থা ও অবস্থান থেকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।দুঃস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সমাজের প্রতিটি নাগরিকেরই কর্তব্য। রাজনৈতিক দলীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে প্রত্যেকের দায়বদ্ধতা থেকেই এসব বিপদগ্রস্ত লোকজনের পাশে দাঁড়াতে হবে।
অন্যদিকে পৃথিবীর বড় দেশ আমেরিকায় বাইডেন প্রশাসন ইতোমধ্যে তার মধ্যপ্রাচ্য নীতি অনেকখানি পরিবর্তন করেছে। তারা ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে আসতে চাচ্ছে। ওবামা ও ট্রাম্পের আমলের মধ্যপ্রাচ্য নীতি থেকে সরে আসারই ঈঙ্গিত দিচ্ছে বাইডেন প্রশাসন। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য হয়তো আগের থেকে অনেকখানি শান্ত হতে পারে। পাশাপাশি কোভিডপরবর্তী সময়ে সব দেশই নতুন করে তাদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চাইলে বিশ্বে আবার তেলের দাম একটু হলেও বাড়তে পারে। তাতে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি হয়তো খানিকটা চাঙ্গা হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি কিছুটা চাঙ্গা হলে সেখানে আবার বাংলাদেশের শ্রমিকদের কাজের সুযোগ বাড়তে পারে।অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের অর্থনীতির সুযোগ কোভিড পরবর্তী বাংলাদেশ যে বেশ কিছুটা পাবে, তাতে কোনো সন্দেহ থাকছে না। তবে ইউরোপীয় অর্থনীতি আগের অবস্থায় যেতে কিছুটা সময় লাগবে। এক দুই বছরে যেতে পারবে না। কারণ, কোভিডে তারাই সব থেকে বেশি ধাক্কা খেয়েছে। এ কারণে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদার পরিমাণ কোভিডের আগের অবস্থায় যেতে সময় লাগবে। তেমনি ইউরোপের শ্রম বাজারেও বাংলাদেশিদের সুযোগ কিছুটা হলেও সংকুচিত হতে পারে। এর পরে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি। যাইহোক আমাদের নিজেদের দেশ ও জাতির চিন্তা মাথায় রেখেই তাদের জন্য কাজ করা বা তাদের পাশে দাঁড়ানোর অনুভূতিটাই অন্তর থেকে অনুভব করতে হবে। অনন্য উদাহরণ হয়ে আরো ব্যক্তি বা সংগঠনগুলো এগিয়ে আসুক ও সমন্বিতভাবে কাজ করুক। মানুষ মানুষের জন্যই এগিয়ে আসুক, যথাযথভাবে দায়িত্ব নিক। এ মানবিকতা নিয়ে মানুষ বাঁচুক, সমাজ বাঁচুক ও রাষ্ট্র বাঁচুক। আমরা করোনা মুক্ত পৃথিবীতে নিরাপদে সকলে মিলে সুখী ও সমৃদ্ধশালী হতে চাই।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
ৎধরযধহ৫৬৭@ুধযড়ড়.পড়স