একজন আবদুল মান্নান সৈয়দ : তার কালজয়ী ছোটগল্প ‘সত্যের মতো বদমাশ’ ও অন্যান্য

0
425

মেহেরুন্নেছা মেরী :

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহিত্য সমালোচক ও সম্পাদক আবদুল মান্নান সৈয়দ  জীবনানন্দ ও  নজরুলসাহিত্যের অন্যতম গবেষক ছিলেন। তাছাড়া তিনি  ফররুখ আহমদ,  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,  মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়,  বিষ্ণু দে,  সমর সেন,  বেগম রোকেয়া,  আবদুল গনি হাজারী,  মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী,  প্রবোধচন্দ্র সেন প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদককে নিয়ে গবেষণা করেছেন।

সব্যসাচী লেখক মান্নান সৈয়দ কথাসাহিত্যেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে গেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি হলো- সত্যের মত বদমাশ, চল যাই পরোক্ষে এবং মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা। এরমধ্যে সত্যের মত বদমাশ প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে। অশ্লীতার অভিযোগে তৎকালীন সরকার কর্তৃক এ গ্রন্থটি নিষিদ্ধ হয়। তাঁর বহুল আলোচিত দুটি উপন্যাস হলো পরিপ্রেক্ষিতের দাসদাসী, অ-তে অজগর। তাঁর গল্প-উপন্যাসে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রাধ্যন্য পেযেছে। বলা হয়েছে, ‘ষাটের গল্পকারদের মধ্যে আবদুল মান্নান সৈয়দ সবচেয়ে বেশি প্রাতিস্বিকতাবিলাসী শিল্পী। আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার গল্পভাষ্য নির্মাণে তিনি সিদ্ধহস্ত। বিষয়াংশ এবং প্রকরণের অভিনবত্বে তাঁর গল্পসাহিত্য বিশিষ্টতার দাবিদার। তবে, প্রথম পর্বের গল্পে, কনটেন্ট ও ফর্মে, আরোপিত উপাদান গল্পের মূলস্রোতের সঙ্গে জৈবসমগ্রতায় একাত্ম হতে পারেনি। বিচ্ছিন্নতা ও নির্বেদের যন্ত্রণায় তাঁর অধিকাংশ নায়ক পীড়িত ও পর্যুদস্ত। প্রতীকী এবং পরাবাস্তববাদী পরিচর্যা আবদুল মান্নান সৈয়দের ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

আজকে আমি তার লেখা বিখ্যাত কিছু ছোট গল্প নিয়ে আলোচনা করবো বলে মনঃস্থির করে এসেছি। আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখা আসলেই মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন-আত্মকেন্দ্রিক মানুষের গল্প তিনি চমৎকারভাবে বলে যান।তার ছোটগল্প একটা ভিন্নতা পায়, উপমাপ্রতীক বা রূপকের কাজও স্পষ্ট দেখা যায় গল্পের শরীরের ভাঁজে-ভাঁজে। পরীক্ষামূলক-নিরীক্ষাধর্মী এবং বিচিত্রধর্মী ছোটগল্পের সাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘সত্যের মতো বদমাশ’ গল্পগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলাসাহিত্যে একটা তোলপার সৃষ্টি হয়। তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়েন, এবং পরবর্তীসময়ে গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত হয়।

ছোটগল্প সত্যের মতো বদমাশ (১৯৬৮) সালে তার লেখা প্রথম গল্প গ্রন্থ। এই গল্প গ্রন্থের একটি বহুল আলোচিত একটি গল্প ‘সত্যের মতো বদমাশ’।সত্যের মতো বদমাশ’ গল্পে কিশোরটি মায়ের সঙ্গে মেলায় গেছে, সেখানে সে যা দেখে তাই তাকে প্রলুব্ধ করে, একসময় তার মা ওই মেলায় হারিয়ে যায়, কিন্তু কীভাবে হারালো সে বোঝে না, সমাজে কতো মানুষের বাস, তার ভেতর থেকে ভালো-মন্দ বিচার করা কঠিন, যারা তাকে জোরজবরদস্তি নাগরদোলায় তুলে নিতে চেয়েছিলো তারাই তাহলে মাকে ছিনতাই করে, নাকি অন্য কেউ বা অন্য কোনো বদলোকের দল, মানুষ শয়তান, কারণ মানুষই বনের টিয়াকে কথা শেখায়, মানুষই বদমাশ কারণ তার ভেতর স্বার্থপরতার যে আগুন দাউ-দাউ প্রজ্বলিত হয়, তার মধ্যে খারাপের ইঙ্গিতই বেশি। সমাজের ভেতরের অনেক অসংগতি মান্নান সৈয়দ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে তার গল্পকে আরো শক্তিশালী অবস্থানে নিয়েছেন, মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ আছে আবার এই মানুষই সুন্দরের পূজারি। কিশোরকে ওরা চারজন বদমাশ কবরে যাবার খাটিয়ার চারটি পায়ার মতো বয়ে নিয়ে যায়, কারণ এই চারজন শয়তান কিশোরের মাকে পায়নি ভোগের জন্য হয়তো তাই কিশোরটিকে নিয়ে তার কামচরিতার্থ করবে। মানুষ এভাবেই হারিয়ে যায় সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে, কিন্তু এসব পাপাচার যারা অহরহ করে তাদের টিকির দেখা মেলে না, সমাজ তাদের চেনে কি চেনে না সেটা হয়তো ভুলে যায় কিন্তু মানুষের স্বরূপ এভাবেই উন্মেচিত হয়।

‘মাতৃহননের নান্দীপাঠ’ গল্পটি মান্নান সৈয়দের প্রথম দিকের রচনা, ষাটের দশকে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে, বিষয়ের অভিনবত্ব বা চিন্তার দ্যুতি তার গল্পের একটা গুরুত্মপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, আঙ্গিক ও প্রকরণের দিক থেকে নতুন ইঙ্গিতধর্মী, মানুষের জীবনের চরম অভিজ্ঞতার স্ফুলিঙ্গ, সেই সঙ্গে বিশ্লেষিত হয়েছে মনস্তত্ত্বের এক জটিল পরিস্থিতি, একমাত্র সন্তানের প্রতি মায়ের অনিঃশেষ ভালোবাসা, সে ভালোবাসা উদার-নিরবচ্ছিন্ন, স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর দীর্ঘ সতেরো বছর নিঃসঙ্গ, আটাশ বছরে বিধবা, বর্তমানে যার বয়স পঁয়তাল্লিশ, কিন্তু কাকতালীয়ভাবে ছেলের কাছে আবিষ্কৃত হলো, একদিন এক ভদ্রলোকের সঙ্গে তার মায়ের সুসম্পর্কের দৃশ্য, মায়ের কাছে বিষয়টি হয়তো তেমন কোনো দোষের না হলেও সন্তানের কাছে তা হয়ে ওঠে বিব্রতকর, মায়ের ওপর এক ব্যতিক্রমধর্মী বক্তব্য উপস্থাপন করে মানব চরিত্রের বিচিত্র রহস্য উদঘাটন করেছেন, মানব মনের ভালোবাসার স্বরূপ যে কতো বিচিত্রমুখী হতে পারে তা মান্নান সৈয়দ মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে এখানে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। মায়ের প্রতি বীতশ্রদ্ধ এবং তাকে হত্যা করতে আগ্রহী, কিন্তু পারে না, কারণ সে যুক্তিবাদী মাকে হত্যা করার পেছনে একটা কারণ দাঁড় করাতে চায়, গল্পে জীবনের একটা বড় মানে এসে দাঁড়ায়, একটা সময় মায়ের অতিরিক্ত স্নেহ আর খবরদারিতে অতিষ্ঠ ছিলো এবং মানসিকভাবে দলিত-মথিত ছেলের জন্য মায়ের যেন কোনো মায়া-মমতা ভালোবাসা নেই, সব কিছু একনিমেষে উবে গেছে, অন্য আরেকটা পুরুষমানুষ সেখানে বড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা ওই ছেলে মেনে নিতে পারে না। তাই সে চিরদিনের মতো সব কিছু শেষ করে দিতে চায়। আঙ্গিকগত দিক থেকে মান্নান সৈয়দ বাংলাসাহিত্যে নতুনের যে অভিসার করেছেন, তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত প্রকরণের অভিনবত্ব, গল্পের চিত্রকল্পে তিনি একটা নিজস্ব ভাবজগৎ বা কল্পজগৎ সৃষ্টি করেন, সেখানে পরাবাস্তব অবলীলায় উঠে আসে, আসে মেধার উজ্জ্বল উপস্থিতি, জীবনবোধের তীক্ষèতায় মান্নান সৈয়দ অনন্য, ভাষায় যেমন তিনি অবলীলায় সিদ্ধহস্ত তেমনি ভাবে বা বিষয়ের গভীরে জড়তাশূন্য-দ্যুতিময় ও প্রগাঢ়, জীবনের প্রতি বাঁকে তিনি সৃষ্টিশীলতার যে নবতর পরিচয় দিয়েছেন এবং নবতর জীবনের উন্মেষ ঘটিয়েছেন তা অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করা যায়। বদমাশ কাকে বলে, হয়তো তাও মনের ভুল, এমনই আরেকটি গল্প ‘ভয়’ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী গল্প, গল্পে ফ্রয়েডীয় অবচেতনা ও যৌনবোধকে বিষয়রূপে গ্রহণ করার যে প্রবণতা, তাও লক্ষ্য করা যায়। তারপর এসেছে আত্মহত্যা, মানুষ কেনো, কখন এমন একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, যখন সে দেখে তার সামনে-পেছনে কোনো চলার বা সরার রাস্তা নেই, তখনই সে নিজেকে একেবারে শেষ করতে চায়। ভয় নামের ভয়াবহ জন্তু বুকের ওপর চেপে বসে, সে তখন আর মানুষ থাকে না, শারীরিক সম্পর্কের কারণে মেয়েটি গর্ভবতী হয়েছে, যদিও সমাজ বা ধর্মের দিক বিবেচনা করলে, এ’ধরণের চিন্তা করাও পাপ, তারপরও তার গর্ভে যে সন্তান, তিলের মতো ছোট্ট বীজটি মেয়েটির অন্ধকারে বড় হচ্ছে, অথচ তাকে ইচ্ছে করলেও বিয়ে করতে পারে না, বিয়ে হলো সামাজিক একটা কালচার বা রীতি, শরীর দেয়া-নেওয়ার ছাড়পত্র, সে রাত্রে আরো একটা মেয়ের বিয়ে হচ্ছে কাছেপিঠে, সে সামাজিক ছাড়পত্র পাবে, ইচ্ছেমতো যৌনতা করার সুযোগ তাকে দেবে সমাজ-ধর্ম, মান্নান সৈয়দ এভাবেই গল্পে নিজের মুখ দিয়ে গল্পটি বলেছেন, ভয় কাজ করে মনের গহনে, যে ভয়ে ভীত দুটো কারণে, প্রথম পাপ, কুমারীর সর্বনাশ করা, আর দ্বিতীয় পাপ, ওর সঙ্গে যে সম্পর্ক, তাতে এই সংসর্গ সম্পূর্ণ অনুচিত ও অবৈধ। আত্মহত্যাপ্রত্যাশী যুবক নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না, নিজের ভেতরের তার এই হীনমন্যতা মানসিক বিকলনের এই মনোবিবাদ তার জীবনকে অতিষ্ঠ করেছে, তাই সে মুক্তি চায়, বাড়ির সবাই যখন বিয়ে খেতে গেছে সে কিন্তু নিজের জগতের মধ্যে নিজের সঙ্গে আরেক যুদ্ধে অবতীর্ণ, আত্মহত্যা করতে যাবার জন্য বারান্দা থেকে সিঁড়িতে পা রাখে তখন যুবকের মনে অন্য আরেক ছবি ফুটে ওঠে, তাদের কুকুরটি আরেকটি কুকুরের সঙ্গে সঙ্গম দৃশ্য, অর্থাৎ তিনটি ছবি উন্মাদ করে তোলে, একটি বিবাহ উৎসব, একটি কুকুর তার আপাতপ্রেয়সীতে মগ্ন, এবং আত্মহত্যা, পাশাপাশি তিনটি ছবি এক জায়গায় দাঁড় করাতে চাইলে, দেখা যাবে, এক ঘরে বিবাহোৎসব, এক ঘরে রতিক্রিয়া, আরেক ঘরে আত্মহত্যা। যুবক তারপর মানুষের ভয়ে এক হাতে দড়ি আরেক হাতে সাপের ভয়ে আঁধারের ভয়ে হারিকেন নিয়ে অন্ধকারে আত্মহত্যার জন্য মিশে যায়। মানুষ তার পাপের কাছে পরাজিত এভাবে হয়, সে নিজের কাছে পাপের কাছে ভয়ে আক্রান্ত হয়ে নিজেকে ফ্রেমেবন্দি করতে চায়।

‘অধঃপতন’ গল্পের প্রধানচরিত্র শাহেদ আলী, পেশায় সে অধ্যাপক, যে একদিন নিজ বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশে যাত্রা করে, সে অধঃপতনে পতিত হয় সামাজিক বৈষম্য থেকে, আলতাফ ডাক্তারকে সে খুন করতে চেয়েছে কারণ ডাক্তার বলেছে, তার জীবনের আয়ু বেশিদিন নেই, অর্থাৎ ক্রমে-ক্রমে ফুরিয়ে যাচ্ছে তার বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা, তাই সে এখন বাঁধনহারা, বিবেকের কাছে তার কোনো দায় নাই, বিবেক এখন অনেকটা নিস্তেজ যেন, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়, বাড়ির কাজের মেয়েটাকে এক চোখ মারলো, মনিবপুত্রের এমন ব্যবহারে চাকরাণীও হতবাক, তারপর রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে নিঃসঙ্কোচে মেয়েদের দেখলো ইচ্ছে মতো, সিনেমা হলে ঢুকে উর্দু ছবি দেখতে গিয়ে নায়িকার নিতম্ব দোলানো দেখে অন্যসব দর্শকদের মতো সেও শিস দিলো, রাস্তায় এক পতিতার সঙ্গে দেখা হলো, সেই পতিতা শাহেদ আলীকে তার বাড়ি নিয়ে গেলো, মদ খেয়ে মাতাল হলো, অথচ সে যে এসব করছে তা যেন কল্পনা করা যায় না। তাকে একটা ছায়া এসে ক্রমেই নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু তারপরও সে বুঝতে পারছে না। মানুষ যেন মৃত্যুর আগে একবার স্বাধীনতা পেয়ে যায়, আর তাই নিজেকে ইচ্ছে মতো স্বাধীনতার ভেতর ভাসিয়ে দিতে চায়। নিজের আসন্ন মৃত্যু মানে পৃথিবী থেকে চিরতরে সরে যাওয়া, জীবনকে শেষবারের মতো ভোগের সাগরে ভাসিয়ে দেয়া যেন অধ্যাপকের কামনা, কারণ সে সমাজের কোনো শাসন-বারণ মানে না, মানবে না, সমাজের অনুশাসিত রীতিনীতির বিরুদ্ধে সে আজ দাঁড় করিয়েছে নিজেকে, আর তাই সে স্বাধীন। এ’ গল্পে মান্নান সৈয়দ জীবনের অন্যরকম মানে খুঁজেছেন, মানুষ নিজেকে ধংসের দ্বারপ্রান্তে হয়তো এভাবেই নিয়ে যায়। তখন বিবেকবোধ হারিয়ে সে উন্মাদে পরিণত হয়।

‘সমীচীন মানব’ গল্পের প্রধান চরিত্র সিকান্দার, যে একটা বৃত্তের মধ্যে থাকতে চায় না, নিজেকে একটু খোলামেলাভাবে উপাস্থাপন করতে ইচ্ছে তার, হয়তো প্রতিটি মানুষ এভাবে নিজেকে আবিষ্কার করতে আগ্রহী যেমন সিকান্দার একদিন অফিস থেকে বের হয়ে সহকর্মীকে এড়িয়ে নিজেকে আবিষ্কার করে সাইফার কাছে, বিবাহিত মানুষ হয়েও সাইফাকে পছন্দ এবং সাইফাও দুর্বল ওর প্রতি, চেনা মানুষ অনেক সময় অপরিচিত হয়ে যায়, কিন্তু সিকান্দারকে ভালো লাগে, কেনো ভালো লাগে তা অবশ্যই জানে না, আইসক্রিম খেতে গিয়ে ওরা কথা বলছিলো, সিকান্দার কিছুসময় মোহিতের মতো সাইফার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকে, সে একটু অস্বস্তিবোধ করে অন্যদিকে তাকায় ক্ষাণিক, তখন নিজেই চকিত হয়ে ওঠে সিকান্দার সাইফার দৃষ্টি অনুসরণ করে, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি-শোভিত মসৃণ উজ্জ্বল ফর্সা ত্বকের এক যুবা, সাইফা মুখ ফিরিয়ে বলে, তোমার বউ কেমন আছে? সিকান্দার মারাত্মকভাবে আঘাত পায় রাফেজাকে নিয়ে ঠাট্টা করার জন্য, কারণ সে বউকে ভালোবাসে, সাইফাকেও ভালোবাসে। অনেকক্ষণ একসঙ্গে কাটালেও সিকান্দারের মন ভরে না, কি যেন একটু বাকি রয়ে গেলো, একসময় সাইফা চলে যায়, তারপর সে শব্দহীন বাঁধানো ঠোঁটের রূপালি হাসি, চোখের দুর্বোধ্য নক্ষত্র, সিকান্দার নিজেকে সংবরণ করে, তারপর বাড়ি চলে আসে, রাফেজার জায়গাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ সে স্ত্রী, একজন বেশ্যা বা সাইফার মতো প্রেমিকার চেয়েও রাফেজার মর্যাদা অনেক ওপরে, তাই মানুষের মন যতোই টালমাটাল হউক না কেনো আপন গৃহ বা সংসারই সত্য-সুন্দর, মনস্তাত্ত্বিক এ গল্পে জীবনের ব্যাখ্যা এভাবেই এসেছে, এভাবেই মানুষ নিজেকে ভেঙে-ভেঙে খুঁজে ফেরে, আত্মজিজ্ঞাসা-মনোকলহ-দুঃখবোধ তৈরি হয়, নিজের সঙ্গে তখন বৈরী পরিবেশটাও একাকার হয়ে যায়। মান্নান সৈয়দ জীবনের মানেটাই বদলে দিয়েছেন দার্শনিক বিচারে।

ফ্রয়েডীয় অবচেতনা ও যৌনবোধকে বিষয়রূপে গ্রহণ করার প্রবণতা ‘দ-িত খেলোয়াড়’ গল্পে লক্ষণীয়, বন্ধু না হলেও বন্ধুর মতো রেজা, বয়সে একটু ছোট, দুলালের সঙ্গে একটা মাখামাখা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, মহকুমা শহরে রেজারা নতুন এসেছে, রেজার বৃদ্ধ পিতা চাকরি থেকে অবসর নেয় তারপরই ওরা চলে আসে বাগানবাড়ি, রেজা একসময় দুলালকে বাড়িতে আনে এবং বাপ-মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, হাসিনা বেগম একটু-একটু অন্যরকম ব্যবহার দেখায়, রেজা না থাকলেও দুলাল এ’ বাড়িতে আসে কখনো-সখনো, হঠাৎ একদিন অনেক রোগে ভুগে রেজার বাবা মারা যায়, সেই থেকে দুলাল রাত্রিদিন রেজাদের বাড়িতে থাকে, কাকতালীয়ভাবে একদিন বাইরে থেকে ফিরে রেজা দেখে, দুলাল এবং তার মা আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় শুয়ে আছে, এর আগেও রেজা লক্ষ্য করেছে মায়ের শোবার ঘর থেকে দুলালকে বেরিয়ে যেতে, মানুষ বুঝি এভাবেই আত্মজা এর কাছে নিজের সত্যিকার পরিচয়টুকু তুলে দেয়, মায়ের সঙ্গে বন্ধুর মতো বড় ভাইয়ের সেক্স এই গল্পের মূল বিষয়বস্তু হলেও প্রতিবাদি কম্পাউন্ডারের বউকে ছেড়ে দেয়নি দুলাল, একটা মন্দ কাজকে ঢাকতে আরেকটা মন্দ কাজকে হাজির করতে হয়, ডালের আঘাত কতোটুকু শক্তিশালী ছিলো সেটা হয়তো মুখ্য নয়, কিন্তু দুলাল যে অবসন্ন ও ক্লান্ত, সে যে কতোদিন ঘুমোয়নি, তার শরীরে ভালোবাসা নয়, আছে ক্লেদের চিহ্ন, মানুষ কী এভাবে সত্যের কাছে বিশ্বাসের কাছে পরাজিত হয়, হয়ে যায় বদমাশ, মান্নান সৈয়দ এ গল্পের মাধ্যমে জীবনের একটা দিকের ছক এঁকেছেন, যা দেখা না গেলেও অনুভব করতে হয়।

আঙ্গিকগত দিক থেকে মান্নান সৈয়দ বাংলা সাহিত্যে নতুনের যে অভিসার করেছেন, তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত প্রকরণের অভিনবত্ব, গল্পের চিত্রকল্পে তিনি একটা নিজস্ব ভাবজগৎ বা কল্পজগৎ সৃষ্টি করেন। সেখানে পরাবাস্তব অবলীলায় উঠে আসে; আসে মেধার উজ্জ্বল উপস্থিতি, জীবনবোধের তীক্ষ্মষ্টতায় মান্নান সৈয়দ অনন্য। ভাষায় যেমন তিনি অবলীলায় সিদ্ধহস্ত তেমনি ভাবে বা বিষয়ের গভীরে জড়তাশূন্য-দ্যুতিময় ও প্রগাঢ়, জীবনের প্রতি বাঁকে তিনি সৃষ্টিশীলতার যে নবতর পরিচয় দিয়েছেন এবং নবতর জীবনের উন্মেষ ঘটিয়েছেন, তা অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করা যায়। মান্নান সৈয়দ এখানেই স্বতন্ত্র, তার গল্পের বিষয়-প্রকাশভঙ্গি বা আঙ্গিক সম্পূর্ণ নিজস্ব স্টাইলে বেগবান, ভাষায় যতখানি কাব্যিক আলোকছটা থাক না কেন,তারপরও জীবন-যন্ত্রণা,হাসি-আনন্দকে বাস্তবতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন চেতনায় অথবা অবচেতনায়।এবং এ জন্যই তিনি বাংলা সাহিত্যের পৃথক এক নক্ষত্র।