সৈয়দ আবুল মকসুদ : আমাদের আলোকিত স্বজন

0
77

বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ (১৯৪৬-২০২১) গত মঙ্গলবার ৭৫ বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি ছিলেন মুক্তচৈতন্যের উদার সাধক। প্রাতিষ্ঠানিক সাহচর্য ব্যতিরেকে সৈয়দ আবুল মকসুদ এককভাবে নানাবিধ গবেষণার ক্ষেত্রে যে-স্বর্ণফসল রেখে গেছেন তার তুলনা নেই। তিনি মওলানা ভাসানী, সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মহাত্মা গান্ধীর কুমিল্লা পদযাত্রা, মুসলিম নারীশিক্ষা নিয়ে নিবিড় গবেষণা ও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থরচনা করেছেন। তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভা ও অন্বেষণ একজন রেনেসাঁ মানবের মুখাবয়ব স্পষ্ট করে তোলে। সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ ‘নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়’ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিককালে ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠা ও তাঁকে কেন্দ্রে রেখে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক জাগরণ সৃষ্টি হওয়ার প্রসঙ্গটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে। তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও লেখায় কবি নজরুলকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনী না-থাকার প্রসঙ্গটি তুলে প্রায়শ আক্ষেপ করতেন এবং নজরুলের একটি পূর্ণাঙ্গ রচনায় তাঁর নিজের অঙ্গীকারের কথা উচ্চারণ করতেন। যদ্দূর জানা যায়, এ নিয়ে তাঁর ব্যাপক প্রস্তুতির অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। হায়, তাঁর এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যু একজন যোগ্যতম মহতের হাতে জাতীয় কবির পূর্ণাঙ্গ জীবনীপ্রাপ্তিকে যেন থামিয়ে দিল।
সৈয়দ আবুল মকসুদ দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক ছিলেন, এ আমাদের জন্যে সবিশেষ শ্লাঘার বিষয়। তাঁর মতো দেশবরেণ্য সাংবাদিক, মানবদরদি ও মুক্তবাক মানুষের সান্নিধ্যে সুপ্রভাতের শৈশব কেটেছে, এ আজ আমাদের কাছে একই সঙ্গে গর্ব ও আনন্দের সঞ্চয়। নম্রভাষী, সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণকলায় সমৃদ্ধ এই মানুষটির সান্নিধ্যে আমাদের ঊষাকালীন সাংবাদিকতার দিনগুলো তথ্যে ঋদ্ধ হয়েছে, সাংবাদিকতার নতুন পথনির্মাণে পাথেয় হয়েছে। সৈয়দ আবুল মকসুদের উজ্জ্বল অভিজ্ঞতার আলোকচ্ছটা ও তার আনন্দময় বিস্তারে আমাদের তরুণ সাংবাদিকবন্ধুরা নানাভাবে শিক্ষিত হয়েছেন এবং সেই জ্যোতি সমাজে ছড়িয়ে দিতে অগ্রসর হয়েছেন। সুপ্রভাত পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে জানার আগ্রহ ছিল এবং তাঁদের কাছে টেনে রাখার এক দুর্বার ও দুর্লভ গুণে ভরপুর ছিলেন তিনি। এই স্নিগ্ধ অভিভাবকতা ও সাংবাদিকতার দিশারি সৈয়দ আবুল মকসুদ তাই চিরঅম্লান হয়ে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।
এটা নিঃসংশয়ে উচ্চারণ করা যায় যে, সৈয়দ আবুল মকসুদের মতো মানুষেরা আমাদের চারপাশ থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছেন কালের নিষ্ঠুর আচরণে। মানুষের সাধ্যের অতীত কালচক্রের এই শাসন থেকে আমাদের কারুরই মুক্তি নেই, এও সত্য। তবে সভ্য জাতিসমূহ তাঁদের কৃতীসন্তানদের চিন্তা ও জীবনধারা থেকে যে-অমৃতময় পথরেখার সন্ধান পায়, আমরা যেন সেসব গুণে যোগ্য হয়ে উঠি। মিথ্যা অহমিকা আর ততধিক বাগাড়ম্বরের নষ্ট গহ্বর থেকে উদ্ধারিত হয়ে আমরাও যেন জাতির সত্যিকারের নির্মাতা হয়ে উঠি। সৈয়দ আবুল মকসুদের আত্মা এই জাতি ও তার সন্তানদের কাছে এই যাচ্ঞাই প্রত্যাশা করছে। তাঁর চেতনার ধারা ও রচনাবলিতে এই আবেদনই সুন্দর ও বলিষ্ঠরূপে বিধৃত হয়ে আছে। মহান আল্লাহ তাঁকে বেহেশত দান করুন।