দেখোনি কভু, নিকটেই আরাধ্য প্রভু

0
57

হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান »

আল্লাহ্ তাআলাই সমস্ত প্রশংসার মালিক, যিনি সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে লালন-পালন করছেন। তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তাঁর পবিত্রতা ও প্রশংসার শক্তি দিয়েছেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, যিনি মানবজাতির থেকেই নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও অলিÑআওতাদ তাঁর নেয়ামতের জন্য বেছে নিয়েছেন।
আল্লাহ্ এক অদ্বিতীয়, লাÑশরীক। তিনি আহাদ, তিনি সামাদ। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তাঁর কোন শরীক নাই। আমাদেও রাহ্বার, নবীকুল সর্দার, সৃষ্টির সেরা, আল্লাহ্র পেয়ারা হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ্র নিকটতম বান্দা ও তাঁর শ্রেষ্ঠতম রাসুল।
কায়মনোবাক্যে আল্লাহ্ তাআলাকে ডাকাডাকি করলে আল্লাহ্ তাঁর বান্দার ডাকে অবশ্যই সাড়া দেন। সাহাবায়ে রাসূল’র একটি দল খোদাপ্রেমের আতিশয্যে আল্লাহ্র রাসূলের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আমাদের পালনকর্তা প্রভু কোথায় আছেন, কোথায় পাবো তাঁরে? ‘তখন তাঁদেরকে একান্ত নৈকট্যে ধন্য করে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তাআলা স্থানÑকালের সীমাবদ্ধতা থেকে পবিত্র। স্থানগত নৈকট্য যে রাখে, সে দূরের কারো সাথে অবশ্যই দূরত্ব রাখবে। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের নিকটেই রয়েছেন। স্থানিক সীমারেখায় সীমায়িত কারো কাছে এ নৈকট্য নেই। আল্লাহ্র দিকে কাক্সিক্ষত নৈকট্যেও মনযিল (বা ধাপ) গুলো অতিক্রম করা গাফেলতি বর্জন করার মাধ্যমেই বান্দার পক্ষে সম্ভব হতে পারে। এ মর্মে তিনি ইরশাদ করছেন, ‘হে আমার প্রিয়তম, আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার সন্ধান চাইবে, তবে (তাদের উদ্দেশ্যে জানাই যে) আমি তো নিকটেই। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখনই সে আমাকে ডাকে। তাই, তাদের উচিত আমার নির্দেশ পালন করা, আর আমার ওপর বিশ^াস রাখা, যেন সঠিক পথে থাকে। (সুরা বাকারা : আয়াত নং-১৮৬)
এ আয়াতে আল্লাহ্র সন্ধানরত বান্দাদের নিজ প্রভুর অন্বেষার বর্ণনা রয়েছে, যাঁরা ইশকে ইলাহীর নেশায় নিজেদের সকল আশাÑআকাক্সক্ষাকে বিসর্জন দিয়েছেন, যাঁরা প্রেমাস্পদ প্রভুরই অনুসন্ধানে বিভোর। আল্লাহ্ তাআলা পূর্বোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করে তাঁরই নৈকট্য আর মিলনের সুসংবাদ দানে তাঁদেরকে আনন্দিত করেছেন। (খাযাইনুল ইরফান)
নবীকুলÑস¤্রাট, আল্লাহ্র হাবীব, সমগ্র সৃষ্টজগতের মূর্ত করুণা হুযূর সায়্যিদে আলম হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)’র শুভ আবির্ভাবের পুণ্য স্মৃতির অনাবিল আনন্দের অবগাহনে বিশ^¯œাত যে পবিত্র চাঁদ সে মাহে রবিউল আউয়াল বিগত হয়ে আমাদের আকাশে উদিত হয়েছে আরেকটি পবিত্র চাঁদ তা হল ‘রবিউল আখের’ চাঁদ। এটিও রবি’। যার অর্থ বসন্ত। ফুলেÑফলে বিকশিত সমৃদ্ধির বর্ণাঢ্য মাস। সৃষ্টির কাছে মহান ¯্রষ্টার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘বর’ রূপে তাঁর মূর্ত করুণা হয়ে রবিউল আউয়াল শরীফে এ ধরাধামে মহাসমারোহে আবির্ভূত হয়েছিলেন প্রিয়নবী রহমতুল্লিল আলামীন। গোটা সৃষ্টিকুল খুশি উতরোল। হবে নাÑই বা কেন? তাঁর আগমনের সম্মানে অগণিত পাপীÑতাপী ক্ষমা পেয়ে যায়, এ দুনিয়া হতে জোরÑজুলুম, বেÑইনসাফী দূরীভূত হয়েছে। সেই খুশির সুর মূর্চ্ছনা ব্যঞ্জনা পেয়েছে জাতীয় কবির লেখনীতে, ‘আজকে যত পাপী ও তাপী, সব গুনাহের পেল মা’ফি/দুনিয়া হতে বে ইনসাফী, জুলুম নিল বিদায়’। এরপর পরবর্তী বসন্ত ‘রবিউল আখের’ এল। এ বসন্তে আমাদের জন্য শুভ যোগ ওলীকুল স¤্রাট, বড়পীর, গাউসুল আ’যম সায়্যিদুনা হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাদ্বি.)’র তিরোধান স্মৃতির ভক্তিরস উৎসরিত পবিত্র ফাতেহায়ে ইয়াযদহমের মহান মাস। তাঁর ভক্তÑঅনুরক্ত বিশ^জুড়ে পালন করেন পবিত্র এ ফাতেহা। ভক্তি, শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন তরীক্বতের উচ্চ নীলিমায় সমুন্নত যাঁর গাউসিয়তের বিজয় নিশান, সে মহান আধ্যাত্মিক স¤্রাট, শাহিনশাহে বাগদাদ, অলি দিগের মহারাজ সায়্যিদুনা গাউসে বাগদাদ (রাদ্বি.) কে। ‘অলিদিগের রাজা মহারাজ, লও মোদের সালাম খানি, আব্দুল কাদের জীলানী’।
রবিউল আখের মাসের এটি প্রথম জুমা। মাসটির এগারো তারিখে অনুষ্ঠেয় ‘ফাতেহায়ে ইয়ায দাহম’। হিসাব মতে, এ ফাতেহা আগামী সপ্তাহে পালনীয়। তবে এ চাঁদে তারিখটি হওয়ায় সংক্ষিপ্ত ভূমিকার মত গাউসে পাককে স্মরণ করা হল। আবার এ প্রসঙ্গে আরেকটি তথ্যও এখানে উল্লেখযোগ্য। গাউসে পাক শাহিনশাহে বাগদাদ (রাদ্বি.)র ভক্তবৃন্দ এ ফাতেহার আয়োজন এ মাসে বিশেষভাবে তাঁর বার্ষিক ওরস শরীফ হিসাবে যেমন পালন করে থাকেন, তেমনি প্রতি মাসের এ তারিখও ‘গিয়ারভী শরীফ’ পালনের মাধ্যমে বছরব্যাপী এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে যতœবান হন। ‘গিয়ারভী’ অর্থ এগার তারিখ। এটি ছিল স্বয়ং গাউসে পাকের আমল। তিনি এটা রাতে বারভী বা মাসিক ঈদে মিলাদুন্নবী হিসাবে পালন করতেন। এগার’র সূর্যাস্তের পর চাঁদের নিয়ম বার তারিখ শুরু হয়। বার্ষিক ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) পালিত হয় বারই রবিউল আউয়াল। ‘বার’ সংখ্যার দিকে সম্পর্কিত বলে ‘বারভী’ বলা হয়। এ অনুষ্ঠানে কর্মসূচি হিসাবে থাকত খতমে কুরআন, না’ত পরিবেশন, ওয়ায-নসীহত ও দুআÑমুনাজাত। শেষে মাহফিলে উপস্থিত অভ্যাগতদের মাঝে এ উপলক্ষে পাকানো খানাÑপিনা বণ্টন করা হোত। আল্লামা ইয়াফেয়ী (রহ.)’র বর্ণনামতে, গাউসে বাগদাদ এ আয়োজন রাসূলে আকরাম (দ.)র সম্মানে বার তারিখ উদযাপনের লক্ষ্যে করেছিলেন। ওই ফাতেহা নেয়ায আল্লাহ্র রাসূলের কাছে পছন্দনীয় হওয়ায় তিনি প্রতি মাসের এগার তারিখ তা পালন করে যান। পর্যায়ক্রমে এ আমল তাঁর প্রতি সম্পর্কিত হয়ে যায়। লোকমুখে খ্যাত হয়, ‘এটা গাউসে বাগদাদ’র গিয়ারভী’। অর্থাৎ যা তিনি পালন করতেন। পরবর্তীতে ভক্তেরা এগার তারিখ তাঁর ওরসে পাক হিসাবেই পালন করতে শুরু করে। অথচ তার বেসালের তারিখ সতেরো রবিউল আখের। (কুররাতুল নাযেরা) শায়খ আব্দুল হক দেহলভী (রাদ্বি.) বলেন, ‘গিয়ারভীর এ পবিত্র দিনটি আমাদের ভারতবর্ষে প্রসিদ্ধ, আমাদের মাশায়েখে কেরামের নিকট উত্তম আমল রূপে পালিত হয়। (মা সাবাতা বিসুন্নাহ্) এটা গাউসে পাকের প্রতি আল্লাহ্র রাসূলের ¯েœহের দান।
গাউসে পাক (রাদ্বি.) তাঁর ‘কাসীদায়ে গাউসিয়া’ শরীফে লিখেছেনÑ ‘সাকাÑনিল হুব্বু কাÑসাÑতিল ওয়েসালী/ফাকুলতু লিখামরাতী নাহ্ভীতাআলী’।
কাব্যানুবাদÑ ভরপেয়ালার মিলন শরাব পান করালো আমায় প্রেম/শুদাই ডেকে আমার সুধায়, মোর পানে আয়, আয়রে শ্যাম’। [হাফেজ আনিসুজ্জমানকৃত] যে ঐশি প্রেমের দুর্বার আকর্ষণে অস্থির, উতলা সাহাবাদের ব্যাকুল জিজ্ঞাসার উত্তরে স্বয়ং আল্লাহ্ ওহী যোগে তাদের প্রশান্তি দিতে আয়াত নাযিল করেন যে, ‘আমি তো নিকটেই’Ñ সে অনুভূতি নিয়ে গাউসে পাক ও তাঁর ঐশী প্রেমজাত বেদনা প্রশমিত করতে কাসীদা রচনায় ব্রতী হয়েছেন। এতে ইঙ্গিত মিলে যে গাউসে পাকও সে খোদায়ী প্রেমে বিভোর সত্তা।
মহাপুরুষগণের পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়া, তাঁদেও তিরোধান প্রভৃতি সৃষ্টিজগতের স্মরণীয় ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কর্মজীবন শেষে তাঁদের তিরোধান সময়ের বাসিন্দারা তিলেÑতিলে অনুভব, উপলব্ধি করেন। তবে জন্মলগ্নে সকলের কাছে তাঁদের বৈশিষ্ট্য সমানভাবে চোখে পড়ে না। গাউসে পাক (রাদ্বি.) এদিক দিয়ে অনন্য স্বকীয়তায় দীপ্তিমান। তাঁর শুভজন্মের বিষয়টিও রহস্যামোদিদের হতবাক করে রেখেছে। তাঁর শুভ আবির্ভাবের প্রাক্কালে পিতা হযরত আবু মুসা সালেহ্ জঙ্গিদোস্ত (রহ.) স্বপ্নযোগে প্রিয়নবী (দ.)’র কাছে থেকে সুসংবাদ পান যে, ‘ তোমার ঘর আলো করে যে সন্তানের শুভাগমন হবে, সে আমার প্রিয় আওলাদ, আল্লাহ্র পরম বন্ধু। নবীগণের মাঝে আমার যে রূপ মর্যাদা, আউলিয়ায়ে কেরামের মাঝে তাঁর মর্যাদাও তেমনই হবে’। তাঁর পবিত্র জন্মের রাত বাগদাদে এগারশত পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছে, যাঁরা সকলে পরিণত বয়সে ওলীয়ে কামেল হয়েছেন। সমকালের শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মসাধকগণ তাঁর আগমনের ভবিষ্যতদ্বাণী ও কামালিয়তের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। শা’বানের শেষ রাতের সুবহে সাদিক ১লা রমাদ্বান ৪৭০ হি. তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সুবহে সাদিকের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মায়ের দুধ গ্রহণ না করে, একদিকে শিশু গাউসের যেমন রোযা পালন, তাঁর পূর্বরাতের সন্ধ্যায় মেঘাচ্ছন্ন আকাশে চাঁদ দেখা না যাওয়ায় রমযানের প্রথম তারিখ ও তাঁর শৈশবের কারামতে সংশয়মুক্ত হয়। অসংখ্য কারামত’র অধিকারী ক্ষণজন্মা এ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ৫৬১ হি. ১৭ রবিউল আখের লোকান্তরিত হন।

লেখক : আরবী প্রভাষক,
জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদ্রাসা।
খতিব : হযরত খাজা গরীব উল্লাহ শাহ (র.) মাজার জামে মসজিদ।