গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি আরো অনেক দূর যেতে হবে

সম্পাদকীয়

গণতন্ত্রের সূচকে বাংলাদেশ আগের চাইতে ৪ ধাপ এগিয়েছে, ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস’ান এখন ৮৮তম। বাংলাদেশের স্কোর ৫.৫৭। গত বছর এই সূচক ছিল ৫.৪৩। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সমীড়্গায় বলা হয়েছে, দড়্গিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চাইতে ভালো অবস’ানে আছে ভারত ও শ্রীলংকা। দেশগুলির স্কোর ৭.২৩ এবং ৬.১৯। ইকোনমিস্ট ইন্টোলিজেন্স ইউনিট ৫টি মানদ-ের ভিত্তিতে এই সমীড়্গা চালায়। এগুলি হল নির্বাচনী ব্যবস’া ও বহুদলীয় অবস’ান, সরকারে সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার। মোট পয়েন্ট ১০। স্কোর ৮এর বেশি হলে সে দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র রয়েছে ধরা হয়। ৬ থেকে ৮ এর মধ্যে স্কোর হলে তা হয় ত্রম্নটিপূর্ণ গণতন্ত্র, ৪ থেকে ৬ এর মধ্যে স্কোর হলে মিশ্র শাসন এবং ৪ এর নিচে স্কোর হলে সেদেশে স্বৈরশাসন চলছে বলে ধরা হয়। তালিকার শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে, দেশটির স্কোর ৯.৮৭। আরো আছে আইসল্যান্ড, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক, কানাডা, ফিনল্যান্ড প্রভৃতি দেশ। যুক্তরাজ্য এবং জার্মানি পূর্ণ গণতন্ত্রের তালিকায় থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস’ান গতবারের মতোই ‘ত্রম্নটিপূর্ণ গণতন্ত্রে’।
বাংলাদেশ রয়েছে মিশ্র শাসনের তালিকায়, মন্দের ভালো। বিরোধীরা ‘দেশে গণতন্ত্র নেই’ এমন অভিযোগ করে এলেও ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স এর এই রিপোর্ট সরকারের জন্য স্বসিত্মকর। সম্প্রতি দেশে সকল দলের অংশগ্রহণে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে যদিও যথার্থ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ রয়েছে। এটি আশার কথা যে, বিশ্বের অনেক দেশে একদলীয়, দ্বিদলীয় কিংবা একেবারে সীমিত রাজনৈতিক দল থাকলেও বাংলাদেশে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস’া বিদ্যমান। দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯। তবে এটি বলা যায় যে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণতন্ত্রের বহুমাত্রিক চর্চা এবং নানা মত ও পথের চিনত্মা সমন্বয় করে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার ড়্গেত্রে অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে। আমাদের দেশ দীর্ঘসময় সামরিক ও স্বৈরশাসনে নিমজ্জিত ছিলো। গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলিকে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে দেওয়া হয়নি। রাজনীতিতে পেশাদার রাজনীতিকের সংখ্যা কমে গেছে। ব্যবসায়ী, সামরিক-বেসামরিক আমলাদের প্রাধান্য পরিলড়্গিত হচ্ছে রাজনীতিতে। এর ছাপ পড়ছে সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। আমরা মনে করি জনগণের নাগরিক অধিকার যত বিসত্মৃত হলে, সকল অংশের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সরকার পরিচালিত হলে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি বাধাহীনভাবে কাজ করতে পারলে গণতান্ত্রিক চেতনা শক্তিশালী হবে। আমাদের নাগরিক সমাজ এ লড়্গ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেন।
দেশে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও এর নেতৃত্বাধীন জোট একচেটিয়া জয় পেয়েছে। সংসদীয় ব্যবস’ায় শক্তিশালী বিরোধীদল অপরিহার্য। আর এজন্যে রাজনৈতিক দল, এদের গণসংগঠনগুলিকে বিকশিত হতে সুযোগ দেয়া উচিত। ভিন্ন মতের রাজনৈতিক দলসমূহের সাংগঠনিক কাজকর্মে গণতান্ত্রিক চেতনা শক্তিশালী হলে তার ছাপ সমাজ ও রাজনীতিতে পড়তে বাধ্য।
আমরা মনে করি প্রশাসন ও সরকার পরিচালনায় সংসদের ভেতরে ও সংসদের বাইরে রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন ও সমাজের নানা অংশের মতামত সরকার বিবেচনায় নেবে। গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে জনজীবনে নিরাপত্তা বিধান করতে সকল প্রকার সন্ত্রাস, উগ্র মতবাদ ও নৈরাজ্যের বিরম্নদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। জনজীবন সুসি’র ও নিরাপদ থাকলে, অর্থনৈতিক-সামজিক বৈষম্য হ্রাস পেলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে।