আবুল মনসুর আহমদের গল্পে প্রথাবিরোধী ধারা

0
114

মেহেদি হাসান :

তামাশা নিয়ে তামাশা করার মানুষ এ সমাজে অভাব না থাকলেও সিরিয়াস বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক প্রক্রিয়ায় সমাজের অসঙ্গতি ও অনৈতিক কার্যকলাপ তামাশার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার মানুষ বিরল। যে সমাজে নেতাদের পা চেটে বড় হওয়ার প্রতিযোগিতা, যেখানে ধর্মীয় অপসংস্কৃতি প্রধান সমস্যা, যে দেশে রাজনীতির নামে নেতাদের উদর বড় করা হয়, যেখানে ধর্মের নামে হালাল কাজের দোহাই দিয়ে মাজারের দানবাক্স ভরতি করা হয়, ঠিক সেই সমাজেই প্রয়োজন পড়ে প্রথাবিরোধী লেখক আবুল মনসুর আহমদের মতো রম্যরচয়িতাদের।
আপনি যে বিষয়টা সিরিয়াস ভাবে বলতে পারবেন না, যে কথাটা গুরুত্ব দিয়ে জনসভা বসিয়ে নেতানেত্রীদের সম্মুখে কোকিলকণ্ঠে মার্জিত ভাষায় আলোকপাত করেও ঠাঁই পাবে না, ঠিক সেই বিষয়টাই যখন হাসির ছলে ব্যঙ্গ করে উপস্থাপন করবেন; আপনার কথায় সত্য প্রকাশিত হলেও তথাকথিত অসাধু নেতানেত্রীগণ রাগ দেখাতে পারবেন না। হাসির ছলে কথার জালে কাউকে খুন করে ফেললেও সেটা গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছায় না। সে কারণেই বলা হয়ে থাকে, ‘হাসি এমন একটি অস্ত্র; যা আপনাকে যেমন খুশি করতে পারে, তেমনি জ্বলন ধরাতে পারে প্রতিপক্ষের মনে।’
একটা মানুষ কত চমৎকারভাবে হাসির ছলে সত্যপ্রকাশ করতে পারেন, তা ‘আয়না’ গল্পগ্রন্থটি না পড়লে আমার জানা হতো না। আয়নায় যেমন মানুষ তার প্রকৃত রূপ দেখতে পায়, দেহের রঙ কালো হলে কালো আর সাদা হলে সাদাই ভেসে ওঠে, তদ্রƒপ আবুল মনসুর আহমদের ‘আয়না’য় ফুটে উঠেছে তৎকালীন সমাজের বিভিন্ন অপসংস্কৃতিমূলক চিত্রকর্ম।
অনেক সময় মনে হতে পারে, লেখকের বোধ হয় বিশেষ কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের ুপর তুমুল রাগ আছে, যার ফলে গ্রন্থটির সৃষ্টি। আসলে তা নয়, তাঁর সমস্ত রাগ-অভিমান অজ্ঞতা, কুসংস্কার আর ভ-ামির বিরুদ্ধে। নিউটনের তৃতীয় সূত্রের ক্রিয়া- প্রকিক্রিয়ার মতো তাঁর সরস লেখাগুলো পড়তে হাসতে হাসতে যেমন গড়াগড়ি খেতে হয়, পরক্ষণেই সে হাসির আড়ালে থাকা কঠিন কথাগুলোও ভাবতে বাধ্য হতে হয়। মনে হবে ঠিকই তো! এমনই তো হচ্ছে আমাদের সমাজ। যদিও গ্রন্থটি ১৯৩৫ সালের দিকে তৎকালীন সমাজের প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রকাশিত হয়, তবুও গ্রন্থটি পড়ার পর বর্তমান সমাজের চিত্রই ফুটে উঠবে মানসপটে।
গ্রন্থটি সাতটি ছোটগল্পের সংকলন : হুযুরকেবলা, গো-দেওতা-কা দেশ, নায়েবে নবী, লীডরে কওম, মুজাহেদীন, বিদ্রোহী সংঘ, ধর্মরাজ্য। মূল বিষয়বস্তু বলতে ধর্মের নামে ভ-ামি (যা পূর্বেও ছিল, এখনও আছে), সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অজ্ঞতা, কুসংস্কার ইত্যাদি। আবুল মনসুর আহমদের ‘আয়না’ দিয়ে আমরা যেন তৎকালীন সমাজের চিত্রই দেখতে পাই। কিছু কিছু জায়গায় চরিত্রায়ণ কিংবা ডায়ালগের ক্ষেত্রে লেখক বেশ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। দুঃখকে পরিহাস হিসেবে, তখনকার রাজনীতি, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ত্রুটি, সে সময়কার বাঙালিসমাজ ও অসাধু ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের মন-মানসিকতা তুলে ধরেছেন আশ্চর্য দক্ষতায়।
স্বার্থের জন্যে মানুষ কীভাবে পশু হয়ে যায়, ধর্মের দোহাই দিয়ে স্বার্থ হাসিল করার তাগিদে মানুষে-মানুষে কীভাবে হাঙ্গামা সৃষ্টি করা যায়, তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, অপসংস্কৃতি, নোংরা রাজনীতি সবকিছুই যেন হাস্যরসাত্মক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। তাই অনায়াসেই বলা যায়, আবুল মনসুর আহমদ সমকাল, সমাজ, জনগণ ও রাজনীতিসচেতন গল্পকার। সমাজের অতিনিকটে কথকের বসবাস। কঠিন বাস্তবতায় হেঁটে চলায় নানা অণুঘটনা ভিড় করেছে তাঁর অভিজ্ঞতার ডালিতে। আর খোলা চোখে দেখাএসব ঘটনাপুঞ্জ ও চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটেছে তাঁর সাহিত্যকর্মে। ‘আয়নার ফ্রেম’ নামক ভূমিকায় কবি নজরুল স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন, ‘এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায়। কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোস পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপমূর্তি মন্দিরে, মসজিদে, বক্তৃতার মঞ্চে, পলিটিকসের আখড়ায়, সাহিত্যসমাজে বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।’ [সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার]
লেখকের ‘ফুড কনফারেন্স’, ‘আসমানি পর্দা’ ও ‘গালিভরের সফরনামা’ গ্রন্থগুলো যেন এ সমাজের চরম বাস্তবতার চিত্র ফুটিয়ে তোলে। হয়তোবা শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে গেলেও তাঁর গল্পের বাস্তব কথাগুলো থেকে যাবে সবার অন্তরে। লেখক যে অসাধারণ দক্ষতায় ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিমায় হাসির ছলে সত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে গিয়েছেন,তা হয়তো-বা চিরকাল অমর থেকে যাবে ভক্তহৃদয়ে। লেখকের ‘ফুডকনফারেন্স’ গ্রন্থের প্রতি মুগ্ধ হয়ে সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছেন, ‘ফুড কনফারেন্স’ গ্রন্থটির মাধ্যমে আবুল মনসুর আহমদ অমর হয়েছেন।’
লেখকের রচনাশৈলী যেমন মুগ্ধ করেছে সবাইকে, তেমনি সমাজের অনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়েছে।
নয়টি গল্পের সমন্বয়ে ‘ফুড কনফারেন্স‘। যেখানে ফুটে উঠেছে হিন্দু-মুসলিম সভ্যতা, সংস্কৃতি, বেহায়াপনা, সামাজিক বৈষম্য, অসাধুদের অনৈতিক কার্যকলাপ, বাঙালিজাতির হীনমন্যতা, নীচু মন-মানসিকতা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি। লেখক ব্যঙ্গ করে বাঙালি জাতির চলমান অপসংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলেছেন বিরল সাহসিকতায়।
বাঙালি ব্যবসায়ীদের অসাধু কার্যকলাপের মাধ্যমে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বিনাশ, তাদের প্রতিবেশী ও এক সময় তারা নিজেরাই কীভাবে নিজেদের বিপদ ডেকে আনে তার চমৎকার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে ‘সায়েন্টিফিক বিজনেস’ নামক গল্পটিতে। যেখানে বাঙালিদের ধূর্ততা তাদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল; এবং এক সময় তাদের এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, তাদের মৃত্যুর পর কান্না করার জন্যেও অবশিষ্ট থাকে না কেউ। তাদের প্রতি বিরক্ত হয়ে স্রষ্টা পুরো জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেন পৃথিবী থেকে। তাদের অপকর্মের ছাপ এতটাই নিকৃষ্ট ছিল যে, তাদের গ্রহণ করার মতো অবশিষ্ট ছিল না কেউ ধরণীতে। প্রথাবিরোধী এমন অসংখ্য চিত্র অসাধারণভাবে আবুল মনসুর আহমদ তাঁর গল্পগ্রন্থে ফুটিয়ে তুলেছেন হাসির ছলে। যা তৎকালীন সমাজের দুর্দশাগ্রস্ত সংস্কৃতির বিপরীতে বিপ্লবের ধ্বনি সৃষ্টি করে। দলবাজি, বিভেদ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভেদাভেদ ইত্যাদি অসভ্যতার জগত থেকে বেরিয়ে এসে সভ্যতার বাতি জ্বালাতে আবুল মনসুর আহমদের জুড়ি নেই।
আবুল মনসুর আহমদ একসময় লালতুর্কি টুপি পরে মোহাম্মদীদের পক্ষে তর্কে শামিল হয়েছেন। অতঃপর নিজের ভুল বুঝতে পেরে ধর্মের নামে সকল ভ-ামি উচ্ছেদ করতে সাহসিকতার সাথে এগিয়ে যান সত্যের পথে। ব্যক্তিগত জীবনে সত্যের পথে চলমান প্রথার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হলেও পিছপা হননি কিছুতেই। তাঁর রচনাবলিতে পিরপূজারী, মাজারপূজারী, ধর্মব্যবসায়ী ও মানুষে-মানুষে বিভেদকারীদের বিপক্ষে হাস্যরসাত্মকভাবে আক্রমণাত্মক ও প্রতিবাদী সেøাগান ভেসে উঠেছে। তিনি যে চলমান নোংরা প্রথার ঘোরবিরোধী, তা তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে বারবার।
তাঁর গল্পে আবুল মনসুর আহমদ ব্যঙ্গ করে গরু-মহিষ, ছাগল, কুকুর ইত্যাদি পশুর চরিত্রায়ন ঘটিয়েছেন বহুরূপে। তাঁর লেখনির জাদুকরি কৌশলে পশুচরিত্রের মাধ্যমে যেমন পশুজীবনের আর্তনাদ ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি সমাজের কিছু মানুষ যে পশুর চেয়েও অধম হয়ে গিয়েছে তার রূপরেখা চমৎকারভাবে অঙ্কন করেছেন। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মানুষের লোভ-লালসা, অহংকার-দাম্ভিকতা ও নীচু মন-মানসিকতা তাদেরকে যে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট করে তোলে তার চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায় আবুল মনসুর আহমদের রচনায়। মাওলানা সেজে সমাজের সমস্ত ভালো কাজের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে স্বার্থ হাসিল করার যে নোংরা ধর্মব্যবসার প্রচলন, তার বিরুদ্ধে লেখকের ব্যঙ্গ গল্পগুলো আজও ধর্মব্যবসায়ীদের আঘাত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যারা জনমানবকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে লেখক প্রতিবাদ করে গিয়েছেন আজীবন। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি গঠনে, ধর্মের নামে অরাজকতা বন্ধকরণে, মুসলিম সমাজের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূরীকরণে আবুল মনসুর আহমদ কাজ করেছেন। পেশায় আইনজীবী হয়েও ব্যক্তিগত জীবন ছাপিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন রম্যরচয়িতা হিসেবে। তাঁর প্রতিটি লেখায় পরিহাসের সুরে অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। সমাজের সমস্ত অন্যায়, অত্যাচার, দুঃখ-দুর্দশা, পাপাচার, নোংরা রাজনীতি ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কথা হাস্যরসাত্মকভাবে ফুটিয়ে তোলার দিক দিয়ে তাঁর মতো অবদান রাখতে পারেনি কেউ। একজন সৎ ও আদর্শ সাংবাদিক হওয়ার পাশাপাশি কলমের আঁচড়ে, গল্পের বাহানায় হাসির ছলে সত্যপ্রকাশে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর লেখনি তৎকালীন প্রথার বিরুদ্ধে জাগরণ সৃষ্টি করলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটকেও যেন ইঙ্গিত করছে। মনে হয়, তিনি যেন বর্তমান সমাজে বিচরণ করছেন। তাঁর গল্প পড়লে সমাজের চিত্র ভেসে ওঠে। সমাজে চলমান অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি, নোংরা রাজনীতি আর ধর্মব্যবসার চিত্রগুলো সামনে আসলে মনে পড়ে আবুল মনসুর আহমদের কথা। মনে হয়, লেখক যদি বর্তমান যুগে জন্মাতেন তাহলে হয়তোবা তাঁর সৃষ্টিশীল রচনার মাধ্যমে ভেঙে দিতেন অপকর্মের তালা, উন্মোচন করতেন অসাধুদের মুখোশ, আর রুখে দিতেন সকল অরাজকতা। আবুল মনসুর আহমদ ১৮৯৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের ত্রিশালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮ মার্চ ১৯৭৯ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।