ফিচার এলাটিং বেলাটিং

সেই বৈশাখী দিনগুলো

জনি সিদ্দিক »

পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। স্মৃতির পাতা ওল্টালে আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধুলোমাখা এক মফস্বল গ্রামের চিত্র, যেখানে একসময় মুখরিত থাকত আমাদের পদচারণায়। আমাদের সেই বড় হয়ে ওঠার দিনগুলো ছিল এখনকার চেয়ে একদম আলাদা। তখন হাতে কোনো স্মার্টফোন ছিল না, ঘরে ঘরে ছিল না রঙিন টেলিভিশন কিংবা অলিগলিতে মোটরবাইকের কানফাটানো শব্দ। স্কুল ছুটির দিন সকাল ও বিকেলে স্কুলের খেলার মাঠ ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা ডাঙ্গুলি নয়তো অন্য কোনো খেলায় ভরপুর হয়ে থাকত। জনসাধারণের চলাচলের ভরসা ছিল কেবল কাঁচা মেঠোপথ, আর সচ্ছল মধ্যবিত্তের আভিজাত্য বলতে ছিল একটি ‘হিরো’ অথবা ‘ফনিক্স’ বাইসাইকেল। সেই সাদামাটা যান্ত্রিকতাহীন দিনগুলোতেই লুকিয়ে ছিল এক অপার প্রশান্তি। সবার মাঝে ছিল ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ।
পহেলা বৈশাখ এলেই চারদিকে একটা সাজ সাজ রব পড়ে যেত। বাঙালির বর্ষবরণ উৎসব বলে কথা! যেহেতু জাতীয় ছুটি, তাই সবাই একসাথে মিলেমিশে মজা করত। তবে শৈশব থেকেই আমি ছিলাম একটু শান্ত আর ঘরকুনো স্বভাবের। সমবয়সীরা যখন হই-হুল্লোড় করে মেলায় যাওয়ার জন্য পাগল হতো, মাঠের ভেতর গান-বাজনা আর পিকনিক নিয়ে আনন্দে মেতে উঠত, তখন আমি ঘরের এক কোণে খাতা-কলম নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকতাম। কৈশোরের সেই দিনগুলো থেকেই ছড়া-কবিতা, গল্প আর প্রবন্ধ লেখার নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল। যখন বাইরের পৃথিবীতে নতুন বছর বরণের হৈ-চৈ চলত, আমি তখন নিভৃতে বসে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে নতুন এক জগৎ তৈরি করতাম। আমাদের বাড়িটার তিন পাশেই বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ; ছোটখাটো বিলও বলা যায়। সেই খোলা মাঠেই তখন বসত উৎসবের আসর। ছোট ছোট তাঁবু করে ৫-১০ জনের একেকটি দল পিকনিক করত। মাইক বেঁধে দিনরাত বৈশাখের বিখ্যাত গানগুলো বাজানো হতো। সেই গানের উচ্চশব্দে গ্রামের চিরচেনা নিস্তব্ধতা যেন খানখান হয়ে যেত। সারাদিন-রাত সেই একঘেয়ে শব্দদূষণ আমার নির্জনতাপ্রিয় মনে কিছুটা বিরক্তি জাগালেও এখন বুঝতে পারি তার মাঝেই মিশে ছিল এক অকৃত্রিম গ্রাম্যতা।
একেবারেই যে বৈশাখী পিকনিক করিনি, তা কিন্তু নয়! মাঝেমধ্যে বন্ধুদের অনুরোধে শামিল হতাম। খোলা মাঠের কোনো এক নির্জন জায়গায় তাঁবু টাঙিয়ে চলত রান্নার মহোৎসব। দুপুর বা বিকেলের দিকে গান-বাজনা আর খিচুড়ি রান্নার সুগন্ধে যখন চারপাশ ম-ম করত, ঠিক তখনই হয়তো আকাশের কোণে জমা হতো এক টুকরো কুচকুচে কালো মেঘ। বৈশাখী বিকেলের সেই রুদ্রমূর্তি বা কালবৈশাখীর ঝড়ো হাওয়া নিমেষেই সব আনন্দকে লণ্ডভণ্ড করে দিত। তাঁবু উড়ে যেত, হাঁড়ি-পাতিল উল্টে যেত সেই হুটোপুটি আর বৃষ্টির ঝাপটার মাঝেও লুকিয়ে ছিল এক অনন্য বুনো রোমাঞ্চ।
এখনও মনে পড়ে পাশের নগর গ্রামের সেই বৈশাখী মেলাটির কথা। পহেলা বৈশাখে গ্রাম-গঞ্জে মেলা বসত। মেলা মানেই ছিল রঙের মেলা, আনন্দের হাট। বিভিন্ন ধরনের রঙিন মাটির পুতুল, বেতের তৈরি ধামা, কাঠা (ফসল বহনের বড় ঝুড়ি), ছুরি, বটি, কাঠের খেলনাসহ আরও হরেক রকম জিনিস। মেলার সেই ধুলোবালির মাঝেও বাতাসা, কদমা, খাগরাই আর ঝাল চানাচুরের যে স্বাদ পাওয়া যেত, তা এখনকার যেকোনো দামি রেস্টুরেন্টের খাবারের চেয়েও বেশি তৃপ্তিদায়ক ছিল। মাটির ব্যাংক, নকশা করা হাতপাখা, বিভিন্ন রকম তৈজসপত্রসহ আরও কত কী যে মেলায় উঠত! কয়েক গ্রামের মানুষের কলতানে মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে থাকত। এখন আর আগের মতো সেই মেলা বসে না; প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে গেছে সেই মাটির সোঁদা গন্ধ আর বাঁশের বাঁশির সুর।
আজ যখন যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততায় হাঁপিয়ে উঠি, তখন স্মৃতির সেই সোনালী দুপুরগুলো বারবার ফিরে আসে। পড়াশোনার ফাঁকে ছড়া লেখার সেই সময়, মাইকের উচ্চ আওয়াজে মেশা বৈশাখী গান আর কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হওয়া সেই তাঁবু সবই আজ মনের গহীনে একেকটা মূল্যবান মণিমাণিক্য। আজ হিন্দি গানের কনসার্ট, মোবাইলের ইউটিউব কিংবা ফেসবুকের রিলস আগের মতো শান্তি দেয় না। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে সত্য, কিন্তু আমাদের সেই শান্ত ও প্রশান্তিময় নিভৃত বৈশাখগুলোকে চিরতরে কেড়ে নিয়েছে। সেই দিনগুলো হয়তো আর ফিরবে না, কিন্তু আমার কলমের আঁচড়ে তারা চিরকাল বেঁচে থাকবে অমলিন হয়ে।