বাংলার ছড়াসম্রাট সুকুমার বড়ুয়া শুক্রবার ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
একুশে পদকপ্রাপ্ত এই মহান লেখকের প্রতি এলাটিং বেলাটিং-এর পক্ষ থেকে
গভীর শ্রদ্ধা
উৎপলকান্তি বড়ুয়া »
সুকুমার বড়ুয়া। এপার-ওপার বাংলার ছড়ার রাজ্যে মুকুটহীন সম্রাটের নাম। জীবন্ত কিংবদন্তি এই ছড়া সম্রাটের সঙ্গতকারণেই সুনাম ও খ্যাতি আকাশ ছোঁয়া। তিনি রচনা করেছেন হাজার হাজার ছড়া। তাঁর ভাষ্য মতে, ‘হিসাব করে বলা মুশকিল, অগুনিত ছড়া লেখা হয়েছে।’
তাঁর ছড়ায় রয়েছে সহজ, সরল, গতি, সাবলীলতা, ছন্দের নির্মল অপূর্ব দোলা।
বাংলাদেশের পাঠ্যসূচিতে সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া-কবিতা এমন যদি হতো, মুক্তি সেনা, শব্দদূষণ, ঠিক আছে ঠিক আছে, অন্তর্ভূক্ত রয়েছে প্রাথমিকের বিভিন্ন শ্রেণিতে। এক কথায় বলতে গেলে সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া বাংলাসাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন।
জন্মসূত্রে তিনি চট্টগ্রামের অধিবাসী। রাউজান উপজেলার সবুজ-শ্যামল সজীব মায়ায় ঘেরা বিনাজুরি তাঁর জন্মগ্রাম। সঙ্গতকারণেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার প্রতি রয়েছে তাঁর একান্ত ভালোবাসা ও বাড়তি টান। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তাঁর লেখা ছড়াগ্রন্থ ‘কোয়াল খাইয়ে’ প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে একুশের বইমেলায়। প্রকাশ করেছেন, চট্টগ্রামের স্বনামধন্য বলাকা প্রকাশন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার প্রথম ছড়াগ্রন্থ এটি। ২০২১ সালে এই গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় আবারো বলাকা প্রকাশন থেকে। আঞ্চলিক ভাষার ছড়ায়ও সুকুমার বড়ুয়া বাজিমাত করেছেন বলতে গেলে। প্রতিটি ছড়ায় রয়েছে চমকপদ ভালোলাগা।
চট্টগ্রামের প্রান্তিক আঞ্চলিক ভাষাগুলোর ব্যবহার তাঁর ছড়ায় উঠে এসেছে অত্যন্ত সাবলীল ভাবে। তাঁর ‘নেতা’ শিরোনাম ছড়ায় এর প্রতিফলন স্পষ্ট।
লাল মিয়া তো বিরাট নেতা
রাস্তা ঘাডে ফালমারে
দিনৎ বড় ভালামানুষ
রাইত দুপুরে জাল মারে
গরীবরলাই কাঁদি কাঁদি
টেঁয়া পইসার টাল মারে
জাল কবলা দলিল বানাই
পরর ক্ষেতৎ হাল মারে,
পরর মাথাত খিয়া ভাঙি
পরর ভাতর তাল মারে
খালকুলে যাই মাল টানে আর
আফুডাইংগা গাল মারে।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় নিত্য ব্যবহার্য নানান কথনের একটি হালকা শব্দেরও ব্যবহার তাঁর ছড়ায় যে এতো মহিমান্বিত হয়ে ওঠে ‘সুখ’ শিরোনাম ছড়ায় তা প্রতীয়মান-
দেয়ানা হাডর দেয়ানা
মস্ত বড় সেয়ানা,
গরু বেচের বাড়ি কিনের
এই টেঁয়া সেই টেঁয়া না?
বেডার মতো বেডা হইয়ে
তোরার মত গেয়া-না?
‘গেয়া’ শব্দটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাভাষী সব মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। প্রমিত বাংলার ‘ইয়ে’ শব্দের চাটগাঁ ভাষার রূপ হলো গেয়া। এই ছড়ায় গেয়া শব্দের অর্থটা এতই তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছেন তিনি, যা সত্যি চমকপ্রদ!
মানুষের আশা- ইচ্ছের কোনো শেষ নেই। দোষ নেই স্বপ্ন দেখতে, দোষ নেই ইচ্ছে পোষণ করতে। তিনি যেই হোন, যেমনটি শ্রেণির মানুষ হোন। তারপরও বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে চায় কেউ কেউ। যার নুন তেল জিরা কেনার সামর্থ্য নেই সে মানুষ মনে মনে সিনেমার নায়িকা বিয়ে করার স্বপ্নে বিভোর হয়। ‘মাছ’ শিরোনাম ছড়ায় আমরা তা লক্ষ্য করি-
মাছ নিবো ফন্যা
বড় কালি ঘন্যা
নুন নাই তেল নাই
নাই জিয়া ধন্যা,
মনে মনে বিয়া করে
সিনেমার কন্যা।
আমাদের সমাজের কিছু বিপরীত অসম চিত্র যা প্রায়ই সবাই অবলোকন করি, প্রত্যক্ষ করি, সেই নষ্ট কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন সুকুমার বড়ুয়া তাঁর আঞ্চলিক ভাষার ছড়ায় অত্যন্ত সরল উপস্থাপনার তুলিতে চিত্র এঁকেছেন ‘ঝাপটাবাজ’ ছড়ায়-
খরোবাইয়ুন ছঁইয়র বীচি
কেঁচা মরিচ লই,
বেচিবারলাই বুড়া জেডা
হাডৎ গেইয়েগই।
জিনিস বেচি বাজার গরি
বউ পোয়ারলাই আনে,
পথর মাঝে ঝাপটা বাজে
গাট্টি ধরে টানে।
পারিপার্শ্বিক, সমাজ সচেতন সুকুমার বড়ুয়া বরাবরই সফল তাঁর ছড়ায়। তিনি বক্তব্য উপস্থাপনে, শব্দের দ্যোতনায়, ছন্দের ব্যঞ্জনায়, কাহিনী বিন্যাসে ইশ্বরপ্রদত্ত বললে অত্যুক্তি হবে না। আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে সুকুমার বড়ুয়ার সময়ে জন্মেছি বলে। তাঁর অসাধারণ আর একটি বহুল পঠিত ‘চম্পাবতীর জামাইয়ে’ ছড়াটা।
যেটা অনেক পাঠকের-লেখকের মুখে মুখে ঘোরে ফেরে।
চম্পাবতীর জামাইয়ে
পইসা দু‘য়া কামাইয়ে
গরম গরম টেঁয়া ঢালি
ট্যাম্পু দুইয়ান নামাইয়ে।
মনত বড় আশা গরি
চকবাজারত বাসা গরি
চেয়ারম্যানত খাড়াইবারলাই
এবার মাথা ঘামাইয়ে।
২০২২ সালে সুকুমার বড়ুয়ার এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, তিনি ২০১৭ সালের পরে আর কোনো নতুন ছড়া বা কবিতা লিখেননি। বলতে গেলে ‘১৭ সালেই তাঁর লেখালেখি একপ্রকার একবারে শ্লথ হয়ে গেছে। সাক্ষাৎকারে আরো উল্লেখ করেন, ‘আগের কয়েকটা লেখা খুঁজে নিয়ে ঘষা মাজা করে দু‘একটা জায়গায় চাইলে কেউ ছাপাতে দেই।’
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ছড়া হাতে গোনা দু‘চারটে ‘২৪ এবং ২৫ সালে। সেই কয়েকটা ছড়া উল্লেখ করতে চাই-
নাম কি তোঁয়ার?
গুড়া বুইজ্যা
কন দেশত্যা?
বিনা জুইজ্যা।
ভাত কি দি খাইয়ো?
নাদাম পুইজ্যা।
আর কি খাইয়ো?
মরিচ পুইজ্যা।
বউ কডেয়ারর
ইদিল পুইজ্যা
গর্বা কডেয়ার
নানুপুইজ্যা।
কি নিতা আইস্য
খেড়র কুইজ্যা।
-আঞ্চলিক ছড়া/ রচনা-২৫ মার্চ ২০২৪
নিজের চারপাশের গ্রামাঞ্চলের নাম উল্লেখপূর্বক এমন ঝলমলে দ্যোতনা সৃষ্টিকারী ছড়া সুকুমার বড়ুয়াকে দিয়েই সম্ভব!
বজ্জি রে বজ্জি
এক্কান ত গজ্জি
খাডির পাড়ত টাই মাছ
মুড মাডি ধজ্জি।
হাতাই তোয়াই কিছু ন পাই
ভাঙা ডুলাত ভজ্জি
বজ্জি রে বজ্জি-
টাই মাছ ধাবাইয়েরে
কঅন জ্বালাত পজ্জি
বজ্জি রে বজ্জি-!
-আঞ্চলিক ছড়া/ ০৫ জানুয়ারি ২০২৫
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার বিশেষত্ব হলো চমকপ্রদতা। তা ছড়ার বিষয়ে, উপস্থাপনে, বক্তব্যে, ছড়ার অন্তমিলে এককথায় সবদিক দিয়ে। তিনি ছড়া লিখেন না, ছড়া-ই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেন। বাংলা ছড়ার অন্যতম যে ক‘জন স্বতঃস্ফূর্ত লেখক আছেন সুকুমার বড়ুয়ার তাদের অন্যতম একজন।
বার বার তাঁর ছড়াই সেই প্রমাণ বহন করে। তাঁর
‘গর্বা ধা’ ছড়াটি লক্ষ্য করলেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়-
থৈলার ভিতর মাডি ভরি
গর্বা গেলো লাডিছরি
চিয়ন চইলর ভাত দিয়েরে
মাংস দিয়ে বাডি ভরি
গর্বা খা- খা-
থৈলা খুলি পাইয়ে মাডি
হাতৎ দিয়ে বেতর লাডি
গর্বা ধা-ধা-!
-গর্বা ধা / ০৬ মার্চ ২০২৫
কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি, কিম্বা কোনটা রেখে কোনটা পড়ি! সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া বলে কথা। একদম লোভনীয় খাবারের মতো অসাধারণ ব্যাপার স্যাপার। এ যাবৎ তাঁর সর্বশেষ লেখা ছড়া (অবশ্যই আঞ্চলিক ছড়া) ‘বদপাত্র’ শিরোনামের এই ছড়াও অত্যন্ত পাঠসমাদৃত হবে আশা করি সবার কাছে। এই জন্যই বলছি, এই ছড়াটা এখনো প্রকাশিত হয়নি বা কারোর নজরেও আসেনি। অন্যান্য আঞ্চলিক ছড়াগুলোর মতো এই ছড়াটা অতি সম্প্রতি আমার হাতে এসেছে। ‘বদপাত্র’ ছড়াটা এবার পড়া যাক-
খবর পাইলাম সাতবাড়িয়া
তোঁয়ার বলে ঝিয়র বিয়া
হাড্ডি মাংস পোঁচাইয়ারে
পাত্র পালি বোচাইয়ারে?
পোয়ার বাড়ি নজরটিলা
মাথার বেয়াক ইসকুরু ঢিলা
আডারো বার মেট্রিক দিয়ে
কিয়ৎ লাগের আই-এ বি-এ
হেরোইন আর বাংলা গিলে
ইয়াবা গাঁজা ফেনসিডিলে
গণ্ডা গণ্ডা বোতলর যম
চোর হইলেয়ো পোয়াউয়া গম।
-বদপাত্র /০৯ মার্চ ২০২৫
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া মানেই আনন্দ, হাসি খুশি বিনোদন। তাঁর ছড়ায় প্রচুর রসবোধ, হাস্যরস, বা সূক্ষ্মভাবে মানুষকে হাসানোর ক্ষমতা ও কৌশল, যা কথা বা লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং এতে বুদ্ধিমত্তা ও পর্যবেক্ষণের ছোঁয়া থাকে, যেটা কমেডি বা ভাঁড়ামির চেয়ে ভিন্ন ও গভীর। এক কথায় বলতে গেলে ছড়ায় হিউমার’ (Humour) সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার বিশেষত্ব।























































