একটি দেশের ভবিষ্যৎ নিহিত থাকে তার শিশুদের মধ্যে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই ভবিষ্যৎ প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে বেপরোয়া গতির চাকায়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশের সড়কগুলোতে প্রাণ হারিয়েছে এক হাজারেরও বেশি শিশু। একটি স্বাধীন দেশে এক বছরে এত বিপুল সংখ্যক শিশুর অপমৃত্যু কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় ব্যর্থতার এক চরম প্রতিফলন।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিহত শিশুদের একটি বড় অংশ প্রাণ হারিয়েছে রাস্তা পার হওয়ার সময়, যানবাহনের ধাক্কায় কিংবা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। অনেক শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে কিংবা বাড়ির পাশে খেলার সময় ঘাতক যানের কবলে পড়ছে। এই প্রতিটি মৃত্যু এক একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ এবং রাষ্ট্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
সড়কে শিশুদের এই অনিরাপদ অবস্থার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ দায়ী। প্রথমত, আমাদের সড়ক অবকাঠামো মোটেও শিশুবান্ধব নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে গতিরোধক বা জেব্রা ক্রসিংয়ের অনুপস্থিতি এবং ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় শিশুরা বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে আসছে। দ্বিতীয়ত, চালকদের অদক্ষতা এবং বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর মানসিকতা। বিশেষ করে অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের হাতে মোটরসাইকেল বা থ্রি-হুইলারের স্টিয়ারিং থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। তৃতীয়ত, ট্রাফিক আইনের শিথিল প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া এই পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী।
অভিভাবকদের অসচেতনতাও এখানে একটি বিষয়। ছোট শিশুদের একা রাস্তা পার হতে দেওয়া বা হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেলে বহন করার ঝুঁকি অনেক সময় আমরা এড়িয়ে যাই। তবে মূল দায়ভার রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। নিরাপদ সড়ক কেবল একটি স্লোগান হয়ে থাকলে চলবে না, এর বাস্তব প্রয়োগ প্রয়োজন।
সড়কে এই শিশু মৃত্যু রোধে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে ‘স্পিড জোন’ কার্যকর করা, শিশুদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি গণপরিবহন চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।
সড়কে আর একটি শিশুও যেন ঝরে না যায়, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। আমরা যদি আজ আমাদের শিশুদের জন্য নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে না পারি, তবে আধুনিক ও উন্নত জাতি গঠনের স্বপ্ন অর্থহীন হয়ে পড়বে। সড়কের এই রক্তপাত বন্ধ হোক, নিরাপদ থাকুক প্রতিটি শিশু।


















































