ফিচার এলাটিং বেলাটিং

শৈশবের বৈশাখী মেলা

এম আব্দুল হালীম বাচ্চু »

ডেমরা- নামটা শুনলেই বুকের ভেতর কেমন এক নরম টান লাগে। কিশোর বয়সের সেই দিনগুলোতে এই ছোট্ট গ্রামটাই ছিল আমাদের পুরো পৃথিবী। বৈশাখ এলেই ডেমরা যেন অন্য এক রঙে রাঙিয়ে উঠত। শুধু বৈশাখী মেলা নয়, এখানে বহু হিন্দু পরিবার থাকায় চরক মেলাও ছিল এক অন্যরকম আকর্ষণ।
আমাদের বন্ধুবান্ধবের দলটা ছিল বেশ জমজমাট- আমির হোসেন নাসির, মোতাহার, রকিব, বিপ্লব, আলম আর ছোট্ট রহিম। বৈশাখের প্রথম দিনটা আসার আগেই আমরা পরিকল্পনা করে রাখতাম-কোথায় যাব, কী দেখব, কত টাকা খরচ করব!
বৈশাখের সকালে ঘুম ভাঙতেই মনে হতো—আজ একটা বিশেষ দিন। নতুন জামা পরে যখন বাইরে বের হতাম, তখন চারপাশে শুধু উৎসবের আমেজ। ডেমরার মাঠে বৈশাখী মেলা বসত, আর একটু দূরেই চরক মেলার আয়োজন। দুই মেলার টানেই আমরা দৌড়াতে থাকতাম এদিক-ওদিক।
বৈশাখী মেলায় ঢুকেই চোখ আটকে যেত রঙিন দোকানগুলোতে। কাগজের ফুল, বাঁশির সুর, রঙিন বেলুন- সবকিছুই যেন ডাক দিত। নাসির সবসময় বেলুন কিনতে চাইত, আর রকিবের পছন্দ ছিল খেলনা গাড়ি। আমি আর মোতাহার আবার নাগরদোলার দিকে বেশি ঝুঁকতাম।
নাগরদোলায় চড়ার অভিজ্ঞতা ছিল দারুণ রোমাঞ্চকর। উপরে উঠে পুরো ডেমরাকে ছোট্ট মনে হতো। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো পিঁপড়ার মতো লাগত। আলম তো ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে রাখত, আর আমরা তাকে নিয়ে হাসতাম।
এরপর আমরা চলে যেতাম চরক মেলার দিকে। সেখানে ঢুকলেই এক অন্যরকম পরিবেশ- ঢোলের তালে তালে ঘুরছে মানুষ, নানা রঙের সাজ, আর ভক্তদের ভিড়। যদিও ছোট ছিলাম, সবকিছু পুরো বুঝতাম না, তবুও সেই দৃশ্যগুলো মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। হিন্দু সম্প্রদায়ের এই উৎসব আমাদের কাছে ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা- সংস্কৃতির এক সুন্দর পরিচয়।
মেলার খাবারগুলোও ছিল আকর্ষণের কেন্দ্র। জিলাপি, বাতাসা, মুড়কি- যা পেতাম তাই খেতাম। কিন্তু টাকা কম থাকায় আমরা ভাগাভাগি করে খেতাম। রহিম তো সবসময় বলত, “একাই খেলে মজা নাই, সবাই মিলে খাই!”
একবার মেলায় গিয়ে আমরা এক জাদুর খেলা দেখেছিলাম। জাদুকর হঠাৎ করে খালি হাত থেকে রুমাল বের করলেন, আবার সেটা উধাও করে দিলেন! আমরা সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে শুধু ওই জাদুর কথাই আলোচনা করেছিলাম।
সন্ধ্যা হলে মেলার আসল সৌন্দর্য ফুটে উঠত। লাইট জ্বলে উঠত, চারপাশে গান বাজত, আর মানুষে মানুষে ভরে যেত পুরো এলাকা। কিন্তু যতই ভালো লাগুক, একসময় বাড়ি ফিরতেই হতো। তখন মনটা খারাপ হয়ে যেত, মনে হতো- এই আনন্দটা যদি আরেকটু থাকত!
আজ সময় অনেক বদলে গেছে। আমরা সবাই বড়ো হয়ে গেছি, কেউ কাজের জন্য শহরে, কেউ পড়াশোনায় ব্যস্ত। ডেমরার সেই মেলাও হয়তো আগের মতো নেই। কিন্তু স্মৃতির পাতায় বৈশাখী মেলা আর চরক মেলার সেই দিনগুলো আজও একদম জীবন্ত।
ডেমরা শুধু একটা জায়গা নয়- এটা আমাদের শৈশবের হাসি, বন্ধুত্ব আর মিলেমিশে থাকা নানা সংস্কৃতির এক সুন্দর অমলিন গল্প, যা কখনও পুরনো হবে না। কখনই না।