ফারুক হোসেন সজীব »
আকাশে শঙ্খচিল উড়লে এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। মনে হয়, পাখিটা যেন আকাশে নয়, সময়ের ওপর দিয়েও উড়ে উড়ে যাচ্ছে। গোল হয়ে পাক খাচ্ছে। তার ডানার ছায়া এক মুহূর্তের জন্য মাটিতে পড়ে আবার মিলিয়ে যায়। মানুষের জীবনও কি তেমনই নয়? রাশেদ প্রথম এই কথার অর্থ বুঝেছিল বাবার মৃত্যুর দিন। কবরস্থানে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছিল। দুটি শঙ্খচিল ধীরে ধীরে পাক খাচ্ছে। কেউ কাউকে তাড়া করছে না। কেউ আগে যেতে চাইছে না। তারা শুধু উড়ছে আর উড়ছে যেন জীবনের তাড়াহুড়ো তাদের ছুঁতে পারেনি।
শহরে ফিরে গিয়ে রাশেদ আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কাজ। মিটিং। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। সবই ঠিকঠাক চলছিল। তবু কোথাও যেন সে ভারী হয়ে যাচ্ছিল। যেন তার জীবন ডানায় পাথর বেঁধে সেও শহরের অলিতে গলিতে উড়ে বেড়াচ্ছে। যাহোক অনেকদিন পর রাশেদ গ্রামে ফিরল। বাবার ফেলে যাওয়া বাড়িটা যেন তার অপেক্ষায় ছিল। উঠোনে দাঁড়িয়ে রাশেদের মনে হলো, এই উঠোনেই সে হাঁটতে শিখেছিল। কথা বলতে শিখেছিল। আর বাবার কণ্ঠে শুনেছিল জীবনের প্রথম গল্প। বাবা মাঝে মাঝেই বলতেন, আকাশে ওই শঙ্খচিলের মতোই মানুষের জীবন। শুধু গোল হয়ে পাক খায়। মানুষও বার বার তার বিত্তের বিন্দুতে ফিরে ফিরে আসে। তখন বাবার কথাগুলো রাশেদের হাস্যকর মনে হতো। এখন সেটাই গভীর সত্য হয়ে বুকে বাজে। দুপুরের রোদে উঠোনে বসে সে আকাশের দিকে তাকাল। একটি শঙ্খচিল ডানা মেলে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাতাস তাকে বইয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে পড়ে যাচ্ছে না। কারণ সে বাতাসের সঙ্গে লড়ছে না। সে বাতাসকে মেনে নিচ্ছে। মানুষ সারাজীবন লড়াই করে। সময়ের সঙ্গে। পরিস্থিতির সঙ্গে। নিজের সঙ্গে। কখনো কখনো এত লড়াই করে যে বেঁচে থাকার আনন্দটাই হারিয়ে ফেলে।
রাশেদ বাবার পুরোনো খাতাটা খুলে পড়তে লাগল। এক জায়গায় লেখা ছিল- মানুষ ভাবে গন্তব্যই সব। কিন্তু পাখি জানে, ওড়াটাই জীবন! গন্তব্যের নাম তো- স্থিতি! আর কেন না জানেন স্থিতিতেই মৃত্যু। গতিতেই জীবন। এই একটি বাক্য তার ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, সে এতদিন শুধু পৌঁছাতে চেয়েছে। কোথাও পৌঁছাতে। কিন্তু পথে কী হারাচ্ছে, তা দেখেনি। বিকেলে রাশেদ নদীর ধারে গেল। নদীটাও শঙ্খচিলের মতো। থামে না। কিন্তু ছুটে চলে। বাঁক নেয়। পথ বদলায়। তবু নিজের স্রোত ছাড়ে না। মানুষের জীবনও কি এমন হওয়া উচিত নয়? হঠাৎ তার মনে হলো। জীবন মানে শুধু সংগ্রহ নয়! জীবন মানে মেনে নেওয়ার ক্ষমতাও । কোন বোঝা নামিয়ে রাখতে হবে সেটাও জীবনের সিদ্ধান্তে একটি অংশ। মানুষ যদি ক্রমশই অতীতের বোঝা বহন করে তবে সে নুয়ে পড়বেই। ভবিষ্যতের ভয়ে সে কাঁপবে। বর্তমান ভরসাও সে হারিয়ে ফেলবে। হঠাৎ সন্ধ্যার আকাশ লাল হয়ে এলো। শঙ্খচিলগুলো ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল। রাশেদের বুক হালকা হতে লাগল। সে বুঝতে পারল, জীবনের অর্থ খোঁজা কোনো বড় উত্তর নয়। প্রতিদিন নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া, প্রতিটি মুহূর্ত সুন্দর ও উপভোগ্য করে তোলাই জীবনের প্রকৃত অর্থ কারণ সৃষ্টিকর্তার এই সুন্দর নিয়ামত জীবন- কী করে এমন অর্থহীন হতে পারে?





















































