রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকট, দুর্ভোগে যাত্রী

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যেখানে প্রতিদিন প্রয়োজন ১১৯টি ইঞ্জিন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৭৫ থেকে ৭৬টি।

এই সংকটের কারণে একদিকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও বিশ্রামের সুযোগ না পেয়ে দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ইঞ্জিনগুলো, অন্যদিকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে বিপর্যয়।
ইঞ্জিন সংকটের প্রভাবে গত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম-দোহাজারী, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট, চট্টগ্রাম-কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটসহ একাধিক লাইনে লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এই ধারাবাহিকতায় এবার বন্ধের মুখে চট্টগ্রাম-জামালপুরগামী নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস। ট্রেনটির প্রতি মাসে সাত-আট দিন করে যাত্রা বাতিল হচ্ছে। দিন দিন যাত্রা বাতিল বাড়ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনে ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভ সংকট এখন আর কেবল যান্ত্রিক কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি জনদুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকোমোটিভের তীব্র ঘাটতির ফলে এই রুটে নিয়মিত ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রী এবং দেশের পণ্য পরিবহন খাতের ওপর।
পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের অধিকাংশ ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। ২০ বছরের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হলেও অনেক ইঞ্জিন ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। ফলে মাঝপথেই ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়া বা সিডিউল বিপর্যয় এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় নতুন কোচ এলেও ট্রেন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, বরং অনেক গুরুত্বপূর্ণ রুটে ট্রেনের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
রেলপথকে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মনে করে সাধারণ মানুষ এই মাধ্যমটিকে বেছে নেয়। কিন্তু ইঞ্জিনের অভাবে সময়মতো ট্রেন না ছাড়ায় স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সিডিউল বিপর্যয়ের কারণে কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। এছাড়া জরাজীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালানোর ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও ক্রমেই বাড়ছে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারাদেশে পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হওয়া উচিত ছিল রেলওয়ে। কিন্তু ইঞ্জিন সংকটের কারণে কনটেইনার ও জ্বালানি তেলবাহী ওয়াগন চলাচলে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিচ্ছে। এর ফলে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, যা একদিকে যেমন ব্যয়বহুল, অন্যদিকে মহাসড়কে যানজটের চাপ বাড়াচ্ছে। পণ্য পরিবহনে রেলের এই অক্ষমতা প্রকারান্তরে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রেলওয়েকে আধুনিকায়নের জন্য গত এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, নতুন কোচ এবং ডাবল লাইন নির্মাণের সমান্তরালে কেন পর্যাপ্ত ইঞ্জিন সংগ্রহের বিষয়টি অবহেলিত রয়ে গেল? লোকোমোটিভ সংকটের সমাধানে কেবল জরুরি ভিত্তিতে ইঞ্জিন কেনা যথেষ্ট নয়, বরং বর্তমান ওয়ার্কশপগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
রেলওয়ে একটি রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থা। এই খাতকে পঙ্গু করে কোনো দেশ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকট কাটাতে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত ক্রয় প্রক্রিয়া এবং দক্ষ লোকবল নিয়োগের মাধ্যমে রেলওয়েকে আবার সচল করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের আস্থা হারানোর পাশাপাশি রেলওয়ে এক বিশাল লোকসানি সংস্থায় পরিণত হবে।