রঙিন ফড়িঙের খেলা

স্বপন শর্মা »

সকালের হাওয়া শীতল। উঠোনের চার দিকে আলো আর ছায়ার খেলা। রাতের শিশির ফোঁটাগুলো ঘাসে এখনো টলমল করছে। দুপুরে রোদের তাপে গরম লাগে, আবার রাতে হাওয়া শীতল হয়ে ওঠে। এই বদলানো হাওয়ার মাঝে আজও টুপুর বড় আপা পাঠশালায় গেছে। তখন উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকে টুপু। গায়ের জামা খুলে দিয়েছে দাদি। হালকা রোদের ছোঁয়ায় সে দাঁড়িয়ে রোদ পোহায়।
কচু পাতার ওপর টুপু দেখে তিনটা ফড়িং। তাদের ডানায় রঙিন ঝিলমিল- লাল, সবুজ আর নীল! যেন আকাশে ভাসমান ছোট ছোট রঙিন খেলনা। টুপু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। ফড়িংগুলো কখনো ঘাসে বসে, কখনো হঠাৎ ওপরে উড়ে যায়, আবার নিচে নামে। এক ফাঁকে একটা ফড়িং অনেক ওপরে উঠে কচু পাতার নিচে নেমে আসে। টুপুর মনে পড়ে দাদার কথা-‘এক দেশে এক উড়ান জিনিস ছিল, তার ডানায় ছিল নানা রঙ।’
টুপু হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ফড়িঙের দিকে। কাছে গেলে ফড়িংগুলো উড়ে যায়। টুপু চুপ করে বলে, ফড়িং ফড়িং, এসো না! আমি তোমায় ধরব না, শুধু বসে দেখব তোমাদের খেলা। এই সময় পাশের বাড়ির নাজু আপা এসে জানতে চায়- ‘কি করছ টুপু?’
টুপু বলে, ‘ফড়িং খেলা দেখি আপা! দেখো ওরা খেলছে মনে হয়। আমরা কি ওদের সাথে খেলতে পারি না?’
নাজু হেসে বলে, ‘ওরা আমাদের খেলায় নেবে না। চলো, আমরা ওদের ধরার খেলা খেলি!’ টুপুর মনে একটু ভয় আসে। তবু নাজু বড় আপা, তার কথা মানতে হয়। তারা পা টিপে টিপে ফড়িং ধরতে যায়। তবে ফড়িং গুলো খুব চালাক। একটু শব্দ হলেই তারা উড়ে যায়।
‘আর একটু হলেই ধরতাম!’- টুপু বলে।
নাজু খুব ধীরে বলে, ‘চুপ থাকো। তুমি লাল ফড়িং টা ধরো, আমি সবুজ টা ধরি।’
ফড়িংগুলো এমন জায়গায় বসে, যেখানে ধরা সহজ নয়। টুপু দেখে লাল ফড়িংটা ধুতরা পাতায় বসেছে। টুপুর মনে পড়ে যায় মায়ের কথা, ধুতরা পাতায় হাত দেবে না, ওটা খারাপ হতে পারে। টুপু ভয় পেয়ে যায়। ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসে। ভাবে, মায়ের কথা না শুনলে বিপদ হবে। এ দিকে নাজু দেখে এক ফড়িং উঠোনের পাশে গোবর রাখার খালের ধারে শুকনো বাঁশের ডালে বসেছে। সে ধীরে ধীরে এগোয়। হাতে এক টুকরো কাপড় নিয়ে ধরতে যায়। ঠিক তখনই- ‘ও মা!’ বলে নাজু চিৎকার করে ওঠে চিৎকার শুনে সবাই দৌড়ে আসে দাদা, কাকা, কাকি, দাদু সবাই জানতে চায়- ‘কি হল?’ নাজু চোখে জল নিয়ে বলে,- ‘ফড়িং কামড় দিয়েছে!’ দাদু হেসে বলেন, একটা ফড়িং নিয়ে এতো কাণ্ড?
তারপর দাদু টুপু আর নাজুকে কাছে ডেকে বলেন, ‘দেখো, ফড়িং বা অন্য পোকা ধরা ভালো কাজ নয়। ওরাও বাঁচে, ওরাও খেলে। ভয় পেলে ওরা কামড় দিতে পারে। আমরা যেমন খেলতে ভালোবাসি, ওরাও হাওয়ার মাঝে খেলতে ভালোবাসে। তাই দূর থেকে দেখাই ভালো।’ নাজু মাথা নিচু করে। টুপু চুপ করে থাকে আর শোনে।
দাদু আবার বলেন, ‘তোমরা কাগজ দিয়ে ফড়িং বানাতে পারো। সেটাই দিয়ে খেলো। ফড়িং এর পেছনে দৌড় মানে ওদের ভয় দেখানো।’
সেই দিনের পর টুপু আর নাজু ফড়িং ধরতে যায় না। তারা রোজ সকালে বিকালে উঠোনে দাঁড়িয়ে কচু বাগানের পাশে বসে ফড়িঙ ডানার নাচ দেখে। রোদ পড়লে ডানা ঝকঝক করে। তারা ভাবে- আমরাও যদি ডানা মেলে উড়তে পারতাম! আকাশে উঠে কচু পাতার পাশ দিয়ে উড়ে যেতাম।
এক দিন টুপু তার খাতা থেকে কাগজ ছিঁড়ে নাজু আপার সাথে কাগজের ফড়িং বানায়। লাল, সবুজ আর নীল রঙ দেয়। কাঠিতে জড়িয়ে ঘোরায় আর বলে, এই আমাদের ফড়িং। এটা ওড়ে না, তবে আমাদের সাথে খেলে।
তার পর তারা ভাবনার ফড়িং বানায়…
একটা যেটা রোদ কুড়িয়ে খেতে ভালোবাসে, একটা যেটা ভরা মেঘে বসে জল নামাতে চায়, আর একটা যেটা শুধু খেলে, হাসে আর সাথি খোঁজে।
ফড়িং এর মতোই এখন তাদের খেলা বদলে গেছে। ধরাধরি নয়- দেখা, শেখা আর ভাবনায় উড়ে চলাই তাদের নতুন খেলা।