মিয়ানমার সীমান্তে মাইন আতঙ্কে বিপন্ন জনপদ

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এখন এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইন ও বিস্ফোরক দ্রব্যের কারণে স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিক ও সীমান্ত অতিক্রমকারী রোহিঙ্গাদের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমান্তে এ ধরনের মাইন বিস্ফোরণ আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং মানবাধিকারের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে এ পর্যন্ত বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ। বিশেষ করে জিরো লাইনের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের জন্য কৃষি কাজ বা গবাদি পশু চড়ানো এখন এক আতঙ্কের নাম। মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) ও সে দেশের জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে সুপরিকল্পিতভাবে এই মাইন পুঁতে রাখছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত করা এবং সীমান্তে একটি স্থায়ী অস্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক ‘অটোয়া কনভেনশন’ অনুযায়ী ল্যান্ডমাইনের ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও মিয়ানমার এই চুক্তিতে সই করেনি। তবে চুক্তি সই না করার অর্থ এই নয় যে, তারা প্রতিবেশী দেশের জানমালের ক্ষতি করার অধিকার রাখে। বারবার বিজিবি এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পতাকা বৈঠক ও কূটনৈতিক বার্তার মাধ্যমে উদ্বেগ জানানো হলেও মিয়ানমার পক্ষ বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে। এই উদাসীনতা কেবল দাম্ভিকতা নয়, বরং প্রতিবেশী দেশের প্রতি চরম অবজ্ঞার শামিল।
সীমান্তে এই মাইন আতঙ্ক কেবল জীবনের ঝুঁকি নয়, এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তা বাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে যে গৃহযুদ্ধ চলছে, তার রেশ এসে পড়ছে বাংলাদেশের ভেতরে। প্রায়ই ওপার থেকে ভেসে আসছে কামানের গোলা আর ভারী অস্ত্রের আওয়াজ। এর মধ্যে এই ল্যান্ডমাইনগুলো সাধারণ মানুষের মনে এক মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করেছে।
এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক মহলে এই বিষয়টি আরও জোরালোভাবে উত্থাপন করা। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে সীমান্তে সরেজমিনে তদন্তের জন্য আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্তে বিজিবির টহল ও নজরদারি আরও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন যাতে কোনো অবস্থাতেই মিয়ানমার পক্ষ নতুন করে মাইন স্থাপন করতে না পারে।
সীমান্তের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা কেবল বাংলাদেশের দায়িত্ব নয়, এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের এই অমানবিক ও বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায়, এই মাইন আতঙ্ক অদূর ভবিষ্যতে এক বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিতে পারে।