একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছে, তখন আমাদের সেই সোনালি ভবিষ্যতের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই মরণনেশা কেবল ব্যক্তিকেই ধ্বংস করছে না, বরং একটি প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিয়ে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম, শিক্ষাঙ্গন থেকে বস্তি—সর্বত্রই এখন মাদকের নীল দংশন স্পষ্ট।
বর্তমানে মাদক ও পাচারের ধরণ আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। ফেন্সিডিল বা গাঁজার যুগ পেরিয়ে এখন ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ) ও বিভিন্ন রাসায়নিক ড্রাগের রমরমা ব্যবসা চলছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ মাদক পাচারের একটি ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে মাদকের সহজলভ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে। সস্তা বিনোদন, বেকারত্বের হতাশা, কৌতূহল এবং অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক অশান্তি তরুণ সমাজকে এই অন্ধকার পথে ধাবিত করছে। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে তারা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই ও খুনের মতো জঘন্য অপরাধে।
সাধারণভাবে ‘মাদক’ বলতে আমরা যা বুঝি, তার কোনো মানবিক বা সামাজিক উপকারিতা নেই। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিছু নির্দিষ্ট মাদকজাতীয় দ্রব্য (যেমন: মরফিন বা ক্যানাবিনয়েডস) অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় তীব্র ব্যথা উপশমকারী বা চেতনানাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের হাতে যখন এগুলো নেশার সামগ্রী হিসেবে পৌঁছায়, তখন সেটি আর জীবন রক্ষাকারী থাকে না; হয়ে ওঠে জীবন সংহারী। নেশার ছলে যারা সাময়িক প্রশান্তি বা আনন্দের কথা ভাবেন, তারা আসলে নিজের মস্তিষ্ক ও লিভারকে স্থায়ীভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেন।
মাদকের বিস্তার রোধে কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, তাই এর সমাধানও হতে হবে সর্বজনীন। প্রথমত, পরিবারকে সচেতন হতে হবে; সন্তানের সঙ্গ এবং আচরণের দিকে গভীর নজর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মাদকের উৎস ও পাচারের রুটগুলো কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
মাদক কোনো সমাধান নয়, বরং এটি সকল সমস্যার মূল। একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে তরুণদের এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচাতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে আমরা একটি মাদকমুক্ত সুন্দর পৃথিবী নিশ্চিত করে আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে পারি।

















































