স্বপন শর্মা »
গ্রামের নাম ছিল বজরা। পাশে বয়ে গেছে তিস্তা নদী। কাশফুলে ভরা মাঠ, আর শিউলি গাছের নিচে সকালগুলো যেন নিজেই গল্প বলত। সেই গ্রামেই বড় হচ্ছিল আরিফ। বয়স বারো। চোখে তার কৌতূহল আর মনে হাজার প্রশ্ন।
আরিফের সবচেয়ে প্রিয় সময় ছিল সন্ধ্যা। তখন তাদের ঘরের কোণে রাখা পুরোনো টিভিটা চালু হতো। বিটিভি। আটটার খবরের আগে যে গানটা বাজত সেটাই তার মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন তুলত। “সব কটা জানালা খুলে দাও না”। গানটা শুনলেই মনে হতো যেন কেউ তাকে ডাকছে। কোথাও থেকে। দূরের কোনো স্মৃতি থেকে। একদিন সে দাদুকে জিজ্ঞেস করল, দাদু এই গানটা এত সুন্দর কেন লাগে। দাদু একটু হেসে বললেন, কারণ এই গান শুধু গান না রে আরিফ। এটা একটা সময়ের দরজা। আরিফ বুঝল না। সে আরও কাছে গিয়ে বসল। দাদু চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। বাইরে তখন হালকা বাতাস। দূরে বাঁশবনে শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, যে সময় আমরা ভয় পেয়েছিলাম। আবার স্বপ্নও দেখেছিলাম। আরিফের চোখ বড় হয়ে গেল। ভয় আর স্বপ্ন একসাথে হয় নাকি। দাদু মাথা নেড়ে বললেন-
হয়। খুব হয়। তুই শুনতে চাস। আরিফ মাথা ঝাঁকাল। তার বুকের ভেতর কেমন যেন কাঁপুনি। দাদু বলতে শুরু করলেন। সাল ছিল উনিশ শ একাত্তর। মার্চ মাস। দিনগুলো তখন অদ্ভুত ছিল। মানুষজন ফিসফিস করে কথা বলত। রাত হলেই সবাই দরজা জানালা বন্ধ করে দিত। তবে মনে মনে সবাই অপেক্ষা করত। কিছু একটা ঘটবে। বড় কিছু। পঁচিশে মার্চের রাতটা ছিল অন্যরকম। আকাশ ছিল অন্ধকার। হঠাৎ করে চারদিক থেকে গুলির শব্দ। আগুন। চিৎকার। আমরা বুঝে গেলাম ভয়ংকর কিছু শুরু হয়েছে। আরিফ নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছে। তখন আপনি কি করেছিলেন? দাদুর চোখে যেন পুরোনো দিনের ছায়া নেমে এল। আমরা লুকিয়ে ছিলাম। মা আমাকে আর আমার ছোট ভাইকে আঁকড়ে ধরেছিল। বাইরে আগুনের আলো। মানুষ দৌড়াচ্ছে। কেউ বাঁচার জন্য চিৎকার করছে। সেই রাতটা আমরা শুধু ভয় পেয়েছি না। আমরা বুঝেছি আমাদের কিছু একটা করতে হবে।
আরিফ ধীরে বলল, তারপর। দাদু বললেন,
পরের দিন ভোরে খবর এল স্বাধীনতার ডাক এসেছে। তখন মনে হলো ভয়টা আর আগের মতো নেই। তার সাথে একটা সাহস এসে গেছে। আমরা জানতাম পথ কঠিন হবে। কিন্তু আমরা হাঁটব।
আরিফ চুপ করে রইল। তার মনে হচ্ছিল সে যেন সেই রাতটা দেখতে পাচ্ছে। আগুন। অন্ধকার। আর মানুষের চোখে জ্বলছে এক অদ্ভুত আলো।
দাদু আবার বললেন, যুদ্ধ শুরু হলো। অনেকেই ঘর ছেড়ে গেল। কেউ লড়াই করতে। কেউ বাঁচতে। আমরা যারা ছিলাম তারা একে অপরকে সাহায্য করতাম। ভয় ছিল। কিন্তু তার থেকেও বড় ছিল স্বপ্ন। আরিফ বলল, স্বপ্নটা কেমন ছিল? দাদু হেসে বললেন, স্বপ্ন ছিল নিজের দেশ। নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার। নিজের মতো বাঁচার অধিকার। সেই রাতে টিভিতে আবার গানটা বাজল। সব কটা জানালা খুলে দাও না
আরিফ হঠাৎ বুঝতে পারল গানটা কেন তাকে ডাকত। যেন সেই জানালাগুলো শুধু ঘরের না। মনেরও। পরদিন স্কুলে গিয়ে সে তার বন্ধুদের বলল, তোরা জানিস পঁচিশে মার্চ কী হয়েছিল? বন্ধুরা কেউ জানত না পুরোটা। কেউ বইয়ে পড়েছে একটু। কিন্তু তেমন অনুভব করেনি।
আরিফ বলল, চল আমরা একটা কিছু করি। তারা ঠিক করল গ্রামের লাইব্রেরিতে গিয়ে সবাই মিলে গল্প শোনার আয়োজন করবে। বয়স্ক মানুষদের ডাকবে। তারা বলবে তাদের অভিজ্ঞতা।
কয়েকদিন পর সেই আয়োজন হলো। গ্রামের অনেক বৃদ্ধ এলেন। কেউ কাঁপা গলায় বললেন কীভাবে তারা পালিয়েছিলেন। কেউ বললেন কীভাবে লড়াই করেছেন। কেউ শুধু চুপ করে কেঁদে ফেললেন। আরিফ সবার কথা শুনে বুঝল ইতিহাস শুধু বইয়ের মধ্যে থাকে না। মানুষের মনে থাকে। এক বৃদ্ধ বললেন, আমরা তখন জানতাম না আমরা বাঁচব কিনা। জানতাম আমাদের লড়তে হবে। আরিফের বুক কেঁপে উঠল। সে ভাবল সে কি পারত এমন করতে। সেই রাতে বাড়ি ফিরে সে আবার দাদুর পাশে বসে বলল, দাদু আমরা কি সত্যি বুঝতে পারি সেই সময়টা!
দাদু ধীরে বললেন, পুরোটা হয়তো না। চেষ্টা করতে পারি। মনে রাখতে পারি। আর নিজেদের দায়িত্বটা বুঝতে পারি। আরিফ বলল, দায়িত্ব মানে? দাদু বললেন, এই দেশকে ভালো রাখা। সত্য কথা বলা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। আর ভুলে না যাওয়া কত কষ্টে এই স্বাধীনতা এসেছে।
আরিফ জানালার দিকে তাকাল। বাইরে আকাশে তারা। সে মনে মনে ভাবল তারও কিছু করার আছে। পরদিন সে খাতায় লিখতে শুরু করল। সে লিখল সেই রাতের কথা। আগুনের কথা। মানুষের সাহসের কথা। সে লিখল গানটার কথা। জানালা খোলার কথা। তার লেখা ধীরে ধীরে গল্প হয়ে উঠল। একদিন স্কুলে সে তার গল্প পড়ল। সবাই চুপ করে শুনল। শেষে শিক্ষক বললেন, তুই শুধু গল্প বলিসনি। তুই একটা অনুভব তুলে এনেছিস।
আরিফ লজ্জা পেল। তবে তার মনে হলো সে যেন একটু বুঝতে পেরেছে। সন্ধ্যায় আবার সেই গান বাজল। সব কটা জানালা খুলে দাও না। এবার আরিফ চোখ বন্ধ করল। তার মনে হলো সে শুধু গান শুনছে না। সে একটা সময়ের দরজা খুলছে। যেখানে ভয় আছে। কষ্ট আছে। তার থেকেও বড় কিছু আছে। স্বপ্ন।
আর সে বুঝল স্বাধীনতা শুধু একটি দিনের নাম না। এটা একটা চলমান পথ। যেখানে প্রতিটি প্রজন্মকে নিজের মতো করে হাঁটতে হয়। আরিফ জানালার দিকে এগিয়ে গেল। আস্তে করে খুলে দিল। বাতাস ঢুকে পড়ল ঘরে। সঙ্গে নিয়ে এল অজানা এক শক্তি। সে মনে মনে বলল, আমি ভুলব না। আমি চেষ্টা করব বুঝতে। আর আমি আমার জানালাগুলো খোলা রাখব। বাইরে তখন রাত। কিন্তু সেই রাতের ভেতরেই যেন নতুন ভোরের আলো জেগে উঠছে।





















































