বিপন্ন কর্ণফুলী—রক্ষার দায় কার?

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি মনজিল মোরসেদ বলেছেন, ‘কর্ণফুলী রক্ষায় গত ১৬ বছরে সাতটি মামলা জিতেছি। কিন্তু বারবার নতুন মামলা করে দখলদারেরা নদী ভরাট চালিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে কর্ণফুলী একদিন মৃত নদীতে পরিণত হবে। চট্টগ্রামবাসী একত্র না হলে এই দখল ঠেকানো যাবে না।’ বৃহস্পতিবার দুপুরে ‘কালের ধ্রুবতারা: অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
চট্টগ্রামের প্রাণ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ধমনী হলো কর্ণফুলী নদী। পাহাড় থেকে নেমে আসা এই খরস্রোতা নদীটি ঘিরেই গড়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দর। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দূষণ, দখল আর পলির ভয়াবহ গ্রাসে কর্ণফুলীর অস্তিত্ব আজ সংকটের মুখে। জনমনে এখন একটিই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে—আমাদের প্রাণের কর্ণফুলী কি তবে মরে যাবে?
কর্ণফুলীর সংকটের মূলে রয়েছে মূলত তিনটি কারণ: অনিয়ন্ত্রিত দখল, শিল্পবর্জ্য ও পলি ভরাট। আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও নদীর দুই তীরে অবৈধ স্থাপনার উচ্ছেদ প্রক্রিয়া বারবার থমকে যাচ্ছে। প্রভাবশালী মহলের মদতে নদীর বুক চিরে গড়ে উঠেছে বস্তি, কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। নদীর প্রশস্ততা কমতে কমতে অনেক জায়গায় সংকীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামের কয়েক হাজার কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য এবং শহরের গৃহস্থালি ময়লা সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতে। কর্ণফুলীর পানি এখন আর স্বচ্ছ নেই; বরং কুচকুচে কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত এক তরলে পরিণত হয়েছে। এতে নদীর ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে। বিপন্ন হচ্ছে জাতীয় মাছ ইলিশের বিচরণক্ষেত্র এবং গাঙ্গেয় ডলফিনের আবাসস্থল। পাশাপাশি, ক্যাপিটাল ড্রেজিং বা নদী খননের ধীরগতি ও ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে নদীর তলদেশে প্লাস্টিক ও পলি জমে চর জেগে উঠছে, যা বন্দর নগরীর জন্য এক অশনি সংকেত।
যদি কর্ণফুলী মরে যায়, তবে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকারিতা স্থবির হয়ে পড়বে। জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ধস নামবে। এছাড়া জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করবে, কারণ শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম এই নদীটিই।
কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হলে কেবল কথার ফুলঝুরি নয়, চাই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ। নদীর সীমানা নির্ধারণ করে স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করতে হবে। প্রতিটি কারখানায় ইটিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। নদী ড্রেজিংয়ের কাজে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং পলি জমার উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
কর্ণফুলী কেবল একটি নদী নয়, এটি চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। একে মরে যেতে দেওয়া মানে দেশের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি; সরকার, প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই ঐতিহাসিক নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে। নদী বাঁচলে বাঁচবে বন্দর, আর বন্দর বাঁচলে সচল থাকবে আমাদের জাতীয় সমৃদ্ধি।
মনজিল মোরসেদ যথার্থই বলেছেন, কর্ণফুলী শুধু একটি নদী নয়, চট্টগ্রামের প্রাণ। অথচ প্রভাবশালীদের দখল, প্রশাসনিক দুর্বলতা আর আইনের ফাঁকফোকরে নদীটি দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। জনস্বার্থে দায়ের করা মামলাগুলোয় রায় পাওয়ার পরও দখল উচ্ছেদ হচ্ছে না।