বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই

৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে অর্থনীতির চাকা সচল করতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাম্প্রতিক ঘোষণা একটি সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর এই সিদ্ধান্ত কেবল শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যেই নয়, বরং দেশের লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। একটি স্থবির অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য উৎপাদন খাতের পুনরুজ্জীবন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

বিগত দেড় বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, ভুল নীতি এবং নানাবিধ প্রশাসনিক জটিলতায় দেশের শিল্প খাতের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০টি শিল্পকারখানা বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে পোশাক খাত, টেক্সটাইল, চামড়া শিল্প এবং হালকা প্রকৌশল খাতের কারখানাই প্রধান।
এই বন্ধের ফলে সৃষ্ট প্রভাব কেবল অবকাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সামাজিক মূল্য অনেক বেশি। আনুমানিক হিসেবে দেখা গেছে, এই কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ শ্রমিক ও কর্মচারী সরাসরি বেকার হয়ে পড়েছেন। পরোক্ষভাবে এই সংকটের শিকার হয়েছেন কয়েক কোটি মানুষ, যারা এই শিল্পগুলোর ওপর নির্ভরশীল। বেকারত্বের এই পাহাড় কেবল দারিদ্র্যই বাড়ায়নি, বরং জাতীয় অর্থনীতিতে স্থবিরতা এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণাটি কয়েকটি বিশেষ কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বন্ধ কারখানা চালু হলে লাখ লাখ শ্রমিকের ঘরে আবার আয়ের উৎস তৈরি হবে, যা জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে পোশাক ও চামড়া শিল্পের কারখানাগুলো চালু হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে। সরকারের এই উদ্যোগ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এই বার্তা দেবে যে, বর্তমান প্রশাসন শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর। উৎপাদন খাত সচল হওয়ার অর্থ হলো জাতীয় জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়া এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হওয়া।
সিদ্ধান্তটি চমৎকার হলেও এর সফল বাস্তবায়নে কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বন্ধ হওয়া অনেক কারখানার মালিক ব্যাংক ঋণে জর্জরিত, আবার অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এসব কারখানাকে পুনরায় দাঁড় করাতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ এবং সহজ শর্তে ঋণ পুনর্তফসিলীকরণ সুবিধা প্রদান করা জরুরি। এছাড়া, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করতে পারলে কারখানার চাকা সচল রাখা সম্ভব হবে না।
শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়টিও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দেখতে হবে। মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করাই হবে এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার প্রধান ভিত্তি।
শিল্পকারখানা একটি দেশের অর্থনীতির ফুসফুস। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এই ঘোষণা সেই ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহের মতো। আমরা মনে করি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সাথে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দ্রুতই তার হারানো অর্থনৈতিক গৌরব ফিরে পাবে।