আব্দুস সালাম »
ফারহা বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“বাবা, আমার স্কুল তো ছুটি, আমি দাদার বাড়ি যাব!”
বাবা হেসে বললেন,
“ঠিক আছে মা, নিয়ে যাব।”
ফারহা আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
ফারহার দাদার বাড়ি দফরপুর গ্রামে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, শান্ত সেই গ্রাম। দাদার বাড়ির কথা মনে পড়তেই তার চোখে ভেসে ওঠে মাঠে দৌড়ানো, শিউলি কুড়ানো, আর দাদার আদর। দুই দিনের ছুটিতে ফারহা বাসে করে দফরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। জানালার পাশে বসে সে দেখল-ধানখেত, পুকুর, তালগাছ আর বিস্তীর্ণ আকাশ। তার কাছে মনে হচ্ছিল, ছোটবেলার অ্যালবাম থেকে এক একটি দৃশ্য যেন উঠে আসছে। দুপুরের আগেই ফারহা দাদার বাড়ি পৌঁছে যায়।
দাদার বাড়িতে পা দিয়েই ফারহার মন ভালো হয়ে গেল। বাড়ির পাশে মাঠ, দূরে নদী, আর অনেক পুরনো স্মৃতি। দাদু তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন,
“তুই এসেছিস? তোর জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম!”
শরৎকালের মিষ্টি হাওয়া ফারহার চুলে খেলে যাচ্ছিল। তার চাচাতো ভাই আরিয়ান তাকে দেখে খুশি হয়। সে বলল,
“ফারহা, চলো, কাজলা নদীর পাড়ে যাই! নদীর দুই তীর কাশফুলে ভরা।”
“সত্যি? তাহলে তাসলিমা, সুমাইয়াকেও ডাকি!”
তার সঙ্গে ছিল আরও কয়েকজন বন্ধু ফাইয়াজ ও আদিল। সবাই মিলে বেরিয়ে পড়ে কাজলার উদ্দেশে। কাজলার পাড়ে পৌঁছে তারা অবাক! সাদা তুলোর মতো কাশফুল নরম বাতাসে দুলছে, যেন প্রকৃতি নিজের চুল খুলে রেখেছে। নদীর পাড়জুড়ে এই ফুলের রাজ্য। তারা হাঁটে, দৌড়ায়, হাসে, আর ছবি তোলে।
তাসলিমা বলে,
“কাশফুলের মাঝে দাঁড়ালে মনে হয় আমি যেন রাজকুমারী!”
আরিয়ান মজা করে বলে,
“তুমি নও, ফারহাই রাজকুমারী!” তার কথা শুনে সবাই হেসে ওঠে।
আকাশে সাদা মেঘ যেন ছোট ছোট কাগজের নৌকা হয়ে ভেসে চলেছে। নদীর পানিতে শাপলা ভাসছে। আদিল পানিতে নেমে একটি শাপলা তুলে ফারহার হাতে দেয়। “এটা তোমার জন্য” আদিল বলল হাত বাড়িয়ে। ফারহা মুচকি হেসে তা গ্রহণ করল।
বিকালে তারা একজোট হয়ে মাঠে ঘুরতে যায়। ফারহা বলে,
“এই সবুজ মাঠগুলো যেন গল্প বইয়ের এক একটি পাতা!”
সুমাইয়া তখন বলে,
“তাহলে আমরা সবাই সেই গল্পের এক একটি চরিত্র!”
ফাইয়াজ আর আদিল ঘুড়ি ওড়ায়। আকাশে লাল-নীল-হলুদ ঘুড়ি। ঘুড়ির লেজে বাতাস বাজে ফুৃঁফুৃঁ করে। সবাই হাততালি দেয়। একটি ঘুড়ি হঠাৎ গাছের ডালে আটকে যায়। আরিয়ান গাছে উঠে সেটি নামিয়ে আনে। ফারহা চিৎকার করে ওঠে,
“আরিয়ান তুমি একেবারে স্পাইডারম্যান!”
পরদিন ভোরে, ফারহা আর আরিয়ান দৌড়ে গেল শিউলি গাছের তলায়। সাদা-কমলা ফুলগুলো ঘাসের ওপর ছড়িয়ে আছে।
“চলো এগুলো দিয়ে মালা গাঁথি?” আরিয়ান বলল।
ফারহা হেসে বললো,
“হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। চলো।”
তারা ফুল কুড়িয়ে মালা বানায়, আবার দাদাকে উপহার দেয়। দাদা উপহারগুলো পেয়ে খুশি হয়।
দাদা মাঠে যাওয়ার সময় ফারহাকে বলেন,
“চল্ ফারহা, তোকে ধান চাষ দেখাই।”
ফারহা দাদার সঙ্গে মাঠে যায়। কৌতূহল নিয়ে দেখে, দাদা চারা রোপণ করছেন, জমিতে নরম কাদায় হাঁটছেন।
ফারহা ভাবল,
“কৃষকরা কত কষ্ট করে আমাদের খাবার এনে দেয়! আমরা তো শুধু খাই, ভাবি না কার হাত ধরে এগুলো আমরা খেতে পাই।”
দুপুরে ফড়িং ধরা শুরু হয়। পাঠকাঠির ডগায় আঠা লাগিয়ে ফাইয়াজ ছোটে।
“এই দ্যাখ, লাল ফড়িং!”
“না, না! প্রজাপতি ধরবে না,” ফারহা বলে।
“ওদের ডানা ভেঙে যাবে।”
ফাইয়াজ মাথা ঝাঁকায়, “ঠিক বলেছো।”
তারপর সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “ওরা যেন আকাশের অতিথি, শুধু দেখার জন্যৃ”
শেষ বিকেলে, সবাই বসে নদীর পাড়ে। ফারহা চুপ করে বলে,
“শহরে এমন আকাশ দেখি না, এমন গন্ধ পাই না, এমন শান্তি পাই নাৃ”
সুমাইয়া তার পাশে বসে বলে, “মন খারাপ কোরো না। যখনই ছুটি পারে চলে আসবে। আমরা তোমাকে সঙ্গ দেব।”
দুই দিনের ছোট্ট অথচ রঙিন সফর শেষে, ফারহা ফিরে যায় শহওে হৃদয়ে কাশফুলের রাজ্য, শিউলি-ভোর আর বন্ধুত্বের অমলিন স্মৃতি নিয়ে।