সনেট দেব »
বাংলা কবিতায় প্রেম ও বঞ্চনার ইতিহাস দীর্ঘ। সময় বদলেছে, ভাষা বদলেছে, বদলেছে সম্পর্কের কাঠামোও। কিন্তু মানুষের ভেতরের চাওয়া, প্রতীক্ষা আর ভাঙনের অনুভব একই রয়ে গেছে। অনির্বাণ দত্তের সমসাময়িক কবিতা “তোমার জন্য” এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কালজয়ী কবিতা “কেউ কথা রাখেনি”—এই দুই কবিতা ভিন্ন সময়ের ফসল হলেও মানুষের সেই চিরচেনা ক্ষতচিহ্নেই এসে মিলিত হয়।
বিশ শতকের মধ্যভাগে জন্ম নেওয়া দুই কবি—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪) ও অনির্বাণ দত্ত (১৯৪৬)—বাংলা কবিতার দুই ভিন্ন অথচ সংলগ্ন ধারার প্রতিনিধি। সুনীল আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বহুমুখী স্রষ্টা হিসেবে ব্যক্তি-জীবনের অনুভব, স্বপ্ন ও অস্তিত্বের সংকটকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন, আর অনির্বাণ দত্ত বামপন্থী রাজনৈতিক চেতনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে কাব্যের প্রধান শক্তি করেছেন। একই ঐতিহাসিক সময়ের অভিঘাতে গড়ে ওঠা এই দুই কবির কণ্ঠস্বর ভিন্ন হলেও, উভয়ের কবিতায় সময়, সমাজ ও মানুষের গভীর বেদনা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন স্পষ্ট হয়ে ওঠে—যা বাংলা কবিতাকে দিয়েছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও অর্থবহ বিস্তার।
অনির্বাণ দত্তের কবিতায় প্রেমিকের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় এক অদ্ভুত সর্বস্বতা। নদী সাঁতরে যাওয়া, গাছে চড়া, আকাশ ছোঁয়া, এমনকি প্রিয় মানুষের বুকের যন্ত্রণার ‘বিষ পোকা’ আঙুলের ফাঁকে চেপে মারার দৃশ্য—সবই প্রেমের জন্য সম্ভাব্য। এই কবিতায় প্রেম মানে ক্ষমতা নয়, বরং আত্মনিবেদন। বারবার উচ্চারিত পঙ্ক্তি— “এই দেখো, তুমি চাইলে কী না দিতে পারি আমি”—এক ধরনের আবেগী প্রতিজ্ঞার মতো শোনায়। কিন্তু কবিতার শেষ পঙ্ক্তিতে এসে সেই প্রতিজ্ঞাই ভেঙে পড়ে— “অথচ আশ্চর্য, কিছুতেই তুমি চাইলে না কিছু।” আধুনিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শূন্যতাই এখানে ধরা পড়ে: দেওয়ার ইচ্ছা আছে, কিন্তু অপরপক্ষের চাওয়ার ভাষা নেই।
অন্যদিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “কেউ কথা রাখেনি” এক দীর্ঘশ্বাসের কবিতা। এখানে প্রেম কেবল প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি শৈশব, সমাজ, শ্রেণি, পরিবার ও জীবনের কাছে পাওয়া প্রতিশ্রুতির হিসাব। বোষ্টুমীর আগমনী গান, মাঝি নাদের আলীর বিল দেখানোর আশ্বাস, বাবার স্বপ্ন, বরুণার ভালোবাসা—সবই প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সময় গড়িয়ে যায়, বয়স বাড়ে, আর প্রতিশ্রুতিগুলো রয়ে যায় অপূর্ণ। কবিতার পুনরুক্তি— “কেউ কথা রাখেনি”—শুধু অভিযোগ নয়, এটি একটি প্রজন্মের হাহাকার।
এই দুই কবিতার মিলবন্ধন তৈরি হয় ঠিক এখানেই। অনির্বাণ দত্তের কবিতায় আছে না-চাওয়ার নীরবতা, আর সুনীলের কবিতায় আছে চাওয়ার পরও না-পাওয়ার দীর্ঘ বেদনা। একটিতে মানুষ সব দিতে প্রস্তুত, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে; অন্যটিতে মানুষ সারাজীবন অপেক্ষা করেও ফেরত পায় শূন্যতা। দুটোই আসলে সম্পর্কের ভাঙা চুক্তির গল্প।
সময়গত পার্থক্য সত্ত্বেও দুই কবিতাই তাদের সময়ের চাহিদা তুলে ধরে। সুনীলের সময় ছিল প্রতিশ্রুতির—‘একদিন হবে’, ‘একদিন দেখাবো’, ‘একদিন ভালোবাসবো’। অনির্বাণের সময় হলো দ্বিধার—মানুষ কিছুই চায় না, কারণ চাওয়ার পর অপূর্ণতার ভয় আরও গভীর। তবু দুই কবিই দেখান, মানুষ আজও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক খোঁজে—যেখানে কথা রাখা হবে, অথবা অন্তত চাওয়ার সাহস থাকবে।
অনির্বাণ দত্তের “তোমার জন্য” যেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “কেউ কথা রাখেনি”-র উত্তরকাল। একজন দেখান কীভাবে দেওয়ার অশেষ সামর্থ্যও মূল্যহীন হয়ে ওঠে, আর অন্যজন দেখান কীভাবে অপেক্ষা মানুষকে ধীরে ধীরে নিঃস্ব করে। সময় বদলায়, কবির ভাষা বদলায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের ক্ষুধা বদলায় না। বাংলা কবিতায় তাই চাওয়া, প্রতিশ্রুতি আর না-পাওয়ার এই বেদনা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।



















































