শের, শায়েরী ও শায়ের | পর্ব ৮
(প্রথম কিস্তি)
সোভিয়েত বিপ্লব সমস্ত দুনিয়ার চিন্তা ও কর্মের নতুন দ্বার উন্মোচিত করেছিল। এর ঢেউ এসে লাগে ভারতেও। এখানে বাম-ঘেঁষা লেখকদের একটি উর্বর ভূমি তৈরি হয়। যার শেকড় বিস্তৃত হয়ে গড়ে উঠেছিল প্রগতি লেখক সংঘ। এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল প্রবণতার বিরুদ্ধে এবং জীবনসংলগ্ন সাহিত্য রচনার জন্য একটি সংঘবদ্ধ মোর্চা।
উর্দু কবিতার প্রগতিবাদী চিন্তার বিকাশে আকবর এলাহাবাদী (১৮৪৬-১৯২১) এবং মোহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তারও আগে ভারতীয় মুসলিম সংস্কৃতিতে মানবতাবাদী উপাদানের পরিপূর্ণতায় প্রতিনিধিত্ব করেন মির্জা গালিব। তিনিই উর্দুর প্রথম আধুনিক কবি।
দেশভাগের পর প্রগতিশীল সাহিত্যিকদের মধ্যে কেউ কেউ পাকিস্তানে চলে যান। অনেকে অল্পদিনের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় শত্রু বনে যান। প্রগতিশীল এই সাহিত্যিকরা যেমন সামরিক শাসন, নাগরিক অধিকার হরণ, জাতিগত বা ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন, তেমনি নারীর সমতা, যৌনতাসহ নানা বিষয় তাঁরা তাঁদের সাহিত্যের বিষয়বস্তু করেছেন।
যতদিন প্রতিক্রিয়াশীলতা ও পশ্চাৎপদতা থাকবে, ততদিন সমাজকে এগিয়ে নিতে থাকবে প্রগতিশীলতা। প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে যুক্ত কথাশিল্পী ইসমত চুগতাইয়ের প্রাসঙ্গিক উক্তি — যতক্ষণ পর্যন্ত এই পৃথিবীতে প্রগতির কোনো সম্ভাবনা থাকবে, প্রগতিশীলতাও থাকবে বেঁচে।
বড়ো মাছ ছোটো মাছকে যতক্ষণ গিলে ফেলবে, প্রকৃতপক্ষে প্রগতিশীলতা ততক্ষণ থাকবে জীবিত।
ষাট, সত্তর আর আশির দশকের কয়েকজন উর্দু কবির শের তিনটি কিস্তিতে এই পর্বে উপস্থাপন করা হবে।
আজ প্রকাশিত হলো দুজন বিখ্যাত উদর্ৃু কবিকে নিয়ে প্রথম কিস্তি।
ফিরাক গোরখপুরি
(১৮৯৬-১৯৮২)

ফিরাক গোরাখপুরী নিজের সময়ে সবাইকে চমকিত করা খুবই জনপ্রিয় কবিদের একজন। ফিরাক— একটি পুরো প্রজন্মকে আলোড়িত করেছিলেন এবং এখনও করেন। তিনি কেবল উর্দু নয়, বিশ্বসাহিত্যের মান ও মূল্যবোধের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন পাঠকদের।
ফিরাক প্রেমের কবিতাই বেশি লিখতেন তবে গজলের জন্য প্রশংসা পেয়েছেন বেশি। তাঁর হাতে গজলের কাঠামো কিছুটা পাল্টেছেও। গজলের বিষয়বস্তুতে এনেছেন অভিনবত্ব।
জীবন যাপনে ফিরাক ছিলেন বোহেমিয়ান। পেশায় ইংরেজির অধ্যাপক। স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়ে বহুবার কারাবাসও করতে হয়েছে। অভিজাত পরিবারের সন্তান ফিরাকের জন্ম ভারতের উত্তরপ্রদেশের গোরাখপুর জেলায়। তাঁর পিতাও উর্দুতে কবিতা লিখতেন। পিতা ছিলেন পেশায় উকিল।
পারিবারিক চাপে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ফিরাক বিয়ে করতে বাধ্য হন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই বিয়েতে তিনি সুখী হননি। সারা জীবনই দাম্পত্য অশান্তিতে ভুগতে হয়েছে। সেইসঙ্গে সন্তানদের অকালমৃত্যু তাঁকে নিঃসঙ্গ করে দিয়েছিল। এত কষ্টের মধ্যেও তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। সামাজিক জীবনে তিনি হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির পক্ষে কাজ করে গেছেন। উর্দুকে মুসলমানের ভাষা বলে চিহ্নিত করার বিরুদ্ধে তাঁর কন্ঠ ছিল সর্বদা সোচ্চার।
কোয়ি সামঝে তো এক বাত কহুঁ
ইশ্ক তৌফিক হ্যায় গুনাহ্ নেহিঁ
[ কোয়ি-কেউ; সামঝে-বোঝে; বাত-কথা
ইশ্ক -প্রেম; তৌফিক-শক্তি বা ক্ষমতা ]
কেউ যদি বোঝে তো একটা কথা বলি
প্রেমের শক্তি এমনি যাতে পাপ নেই

মৌত কি ভি ইলাজ হ্যায় শায়াদ
জিন্দেগি কা কোয়ি ইলাজ নেহিঁ
[ মৌত-মৃত্যু; ইলাজ-চিকিৎসা; শায়াদ-হয়তো
জিন্দেগি-জীবন; নেহিঁ-নাই ]
মৃত্যুরও হয়তো চিকিৎসা আছে
জীবনের কোন চিকিৎসা নেই
হাম সে কেয়া হো সাকা মোহাব্বত মেঁ
খায়ের তুম নে তো বেওয়াফায়ি কি
[ হাম-আমার; মোহাব্বত-ভালোবাসা
খায়ের-ভালো; বেওয়াফায়ি-বিশ্বাসঘাতকতা ]
ভালোবেসে আর কিই বা হতো আমার
ভালোই হতো বিশ্বাসঘাতকতা করলে তুমি
ম্যায়ঁ হুঁ দিল হ্যায় তান্হায়ি হ্যায়
তুম ভি হোতে আচ্ছা হোতা
[ তান্হায়ি-একাকীত্ব; আচ্ছা-ভালো ]
আমি আছি হৃদয় আছে একাকীত্ব আছে
তুমিও থাকতে যদি, ভালো হতো
দেবতাঁও কা খুদা সে হোগা কাম
আদমি কা আদমি দরকার হ্যায়
[ দেবতাঁও-দেবতাদের: খুদা-ঈশ্বর
আদমি-মানুষ ]
দেবতাদের থাকতে পারে ঈশ্বরের সাথে কাজ
মানুষের জন্য মানুষই প্রয়োজন
আখোঁ মে জো বাত হো গায়ি হ্যায়
ইক শরাহ-এ-হায়াত হো গায়ি হ্যায়
[ আখোঁ-চোখ; বাত-কথা
শরাহ-এ-হায়াত-জীবনের ব্যাখ্যা ]
চোখে চোখে যে কথা হয়ে গেল
জীবনের এক ব্যাখ্যাও হয়ে গেল
আব তো উন কি য়াদ ভি আতা নেহিঁ
কিতনি তান্হা হো গায়ি তন্হাইয়াঁ
[ আব-এখন; য়াদ-মনে
কিতনি-কতো; তানহা-একা ]
এখন তো মনে আসে না তার স্মৃতিও
কতো একা হয়ে গেছে একাকীত্ব
য়ে মানা জিন্দেগি হ্যায় চার দিন কি
বহুত হোতে হ্যায় য়ারো চার দিন ভি
[ জিন্দেগি-জীবন; য়ারো-বন্ধুরা ]
এ কথা মানছি, জীবন চার দিনের
চার দিনও অনেক দীর্ঘ বন্ধুরা
কম সে কম মৌত সে অ্যায়সি মুঝে উমিদ নেহিঁ
জিন্দেগি তূ নে তো ধোকে পে দিয়া হ্যায় ধোকা
[ মৌত-মৃত্যু; অ্যায়সি-এমন; উমিদ-আশা ]
অন্তত মৃত্যুর কাছে আমি এমন আশা করি না
জীবন, তুমি তো ধোকার ওপর ধোকা দিয়েছো
জোশ মালিহাবাদি
(১৮৯৮-১৯৮২)
সাব্বির হাসান খান, যিনি জোশ মালিহাবাদি নামে পরিচিত। লখনউয়ের কাছে মালিহাবাদে এক সামন্ত পরিবারে ১৮৯৮ সালে জন্মগ্রহন করেন তিনি। তাঁদের নবাব পরিবারে কয়েক পুরুষ ধরে কবিতার চর্চা। জোশ মালিহাবাদি কবিতা রচনা শুরু করেন ১৩-১৪ বছর বয়স থেকেই। তিনি সীতাপুর, লখনউ, আগ্রা, আলিগড়সহ নানা জায়গায় পড়াশোনা করেন। এমনকি কিছুদিন শান্তিনিকেতনেও পড়াশোনা করেন।
জোশ ধর্মকে সমাজ-প্রগতির বাধা মনে করতেন। কিন্তু ধর্মগুরুদের প্রতি তাঁর অশ্রদ্ধা ছিল না। নজম ও গজল দুরকম লেখাই তিনি লিখেছেন। তবে গজলের চেয়ে নজম অর্থাৎ সাধারণ কবিতাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন। আজীবন সমাজবাদে বিশ্বাসী, কিন্তু তাঁর কবিতার বিষয় বিচিত্র। সেখানে প্রেম আছে, আবার প্রতিবাদও। ১৯২৫ সালে হায়দারাবাদের নিজামের বিরুদ্ধে কবিতা লেখার জন্য ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে তাড়ানো হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অনুবাদক ছিলেন।
উর্দু সাহিত্যের শ্রেষ্ট কবিদের একজন জোশ মালিহাবাদি। ভাষা ও ব্যাকরণে তিনি ছিলেন পটু। একারণে তাঁকে বলা হতো ‘উর্দুর বাদশাহ’। তাঁর আত্মজীবনী ‘ইয়াদোঁ কি বরাত’। সেখানে তিনি নিজের সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি এক কবি, প্রেমিক, জ্ঞানপিপাসু ও মানবতার বন্ধু’।
জোশ মালিহাবাদি ‘শায়ের-এ-ইনকিলাব’ বা বিপ্লবের কবি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৩৬ সালে জোশ দিল্লি থেকে ‘কালিম’ নামে একটি জার্নাল প্রকাশ শুরু করেন। কালিম মানে প্রশ্নকর্তা। নিজের এই পত্রিকায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লিখতেন। প্রায় তিন বছর পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সূত্রে জাতীয় নেতাদের সঙ্গে সখ্য হয় তাঁর। ১৯৪১ সালে পুনেতে শালিমার পিকচার্সে যোগ দেন এবং সিনেমার জন্য গান লেখেন।
১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর ভারত সরকার প্রকাশিত ‘আজকাল’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে আট বছর কাজ করেন। পদ্মভূষণ সম্মান দিয়েও ভারত সরকার তাঁর পাকিস্তান যাওয়া আটকাতে পারেনি। ১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং উর্দু বোর্ডের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে ভারত সফরে গিয়ে এক সাংবাদিককে দেয়া সাক্ষাৎকারের কারণে পাকিস্তান সরকারের চাকরিটি হারান। জন্মভূমির স্মৃতি কাতরতা ও অনুশোচনা নিয়েই ১৯৮২ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেখানেই সমাহিত হন।
দিল কি চোটেঁ নে কাভি চ্যায়েন সে রেহ্নে না দিয়া
যাব চলি র্সদ হাওয়া ম্যায় নে তুঝে য়াদ কিয়া
[ চোটঁ-ব্যথা; চ্যায়েন-শান্তি; রেহনে-থাকতে
র্সদ-শীতল; য়াদ-স্মরণ ]
হৃদয়ের ব্যথা থাকতে দেয়নি কভু শান্তিতে
বইবে যখন শীতল হাওয়া তোমায় আমি করবো স্মরণ
ইনসান কা লহূ কো পিয়ো ইযনে আম হ্যায়
আঙ্গুর কি শরাব কা পিনা হারাম হ্যায়
[ ইনসান-মানুষ; লহূ-রক্ত; ইযনে আম-নেই মানা
শরাব-মদ; হারাম-নিষিদ্ধ ]
মানুষের রক্ত পানে নেই মানা
আঙ্গুরের শরাব পান হারাম
মুঝ কো তো হোশ নেহিঁ তুম কো খবর হো শায়দ
লোগ ক্যাহতে হ্যাঁয় কি তুম নে মুঝে বরবাদ কিয়া
[ মুঝ কো-আমার; হোশ-হুঁশ; শায়দ-হয়তো
লোগ-লোক; বরবাদ-নষ্ট ]
আমার তো হুঁশ নেই জানো হয়তো তুমি
লোকে বলে, আমাকে বরবাদ করেছো তুমি
উস নে ওয়াদা কিয়া হ্যায় আনে কা
রংগ দেখো গরীব খানে কা
[ ওয়াদা-শপথ; রংগ-রঙিন ]
সে করেছে ওয়াদা আসবার
দেখো রঙিন গরীবের ঘর
ইস কা রোনা নেহি কিয়ূঁ তুম নে কিয়া দিল বরবাদ
ইস কা গগম হ্যায় কি বহুত দের মেঁ বরবাদ কিয়া
[ রোনা-কাঁদি; কিয়ূঁ-কেন; দিল-হৃদয়
গগম-দুঃখ; বহুত-অনেক; দের-দেরিতে ]
এজন্য কাঁদি না, করেছো তুমি হৃদয় বরবাদ
এজন্য দুঃখ, করেছো অনেক দেরিতে বরবাদ
গুযার রাহা হ্যায় ইধার সে তো মুস্কুরাতা যা
চেরাগে মজলিশে রুহনিয়াঁ জ্বালাতে যা
[ মুস্কুরাতা-হাসি; চেরাগ-প্রদীপ; রুহনিয়াঁ-হৃদয়জ ]
এপথ দিয়ে যাচ্ছো তো হাসতে হাসতে যাও
হৃদয়জ মজলিসে প্রদীপ জ্বালিয়ে যাও
কিসি কা আহদে জওয়ানি মেঁ পারসা হোনা
কসম খুদা কি য়ে তৌহিনো হ্যায় জওয়ানি কি
[ জওয়ানি-যৌবনকাল; পারসা-পবিত্র
কসম খুদা-খোদার কসম; তৌহিনো-অপমান ]
কারো পবিত্র হওয়া যৌবনকালে
খোদার কসম, এ যৌবনের অপমান
কাম হ্যায় মেরা তগয়্যূর নাম হ্যায় মেরা শাবাব
মেরা ন’আরা ইনকিলাব ও ইনকিলাব ও ইনকিলাব
[ তগয়্যূর-পরিবর্তন; শাবাব-যৌবন
ন’আরা-স্লোগান; ইনকিলাব-বিপ্লব ]
কাজ আমার পরিবর্তন নাম আমার যৌবন
আমার স্লোগান, বিপ্লব এবং বিপ্লব এবং বিপ্লব
চয়ন, সম্পাদনা ও উপস্থাপন • রুশো মাহমুদ




















































