পাকিস্তানের সিদ্ধান্তে যে প্রভাব পড়তে পারে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে

সুপ্রভাত ডেস্ক »

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচদিন আগে পাকিস্তানের সরকার জানিয়েছে, দেশটির ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ খেলবে। তবে বয়কট করবে ভারতের বিপক্ষে পূর্ব নির্ধারিত ম্যাচ। এই সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)।

বাংলাদেশ নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার কথা জানিয়ে ভারতে সফর বাতিল করার পরই প্রতিযোগিতাটি বর্জনের বিষয় বিবেচনা করতে শুরু করে পাকিস্তান। এরই ধারাবাহিকতায় দেশটির সরকারের তরফে নতুন এই অবস্থান জানানো হয়।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ২০১৩ সালের পর বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের বাইরে ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের মুখোমুখি হয়নি। অন্যদিকে, ২০০৮ সালের পর থেকে ভারত পাকিস্তানে কোনো ম্যাচ খেলেনি। গত বছর স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের যে কোনো একটি দেশ আইসিসির কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করলে ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচ হতে হবে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। সে অনুযায়ী ২০২৬

পাকিস্তান সরকার এক বিবৃতিতে জাতীয় দলের টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের অনুমোদন দিলেও তারা জানায়, ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচে মাঠে নামবে না পাকিস্তান দল। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) পাকিস্তানের এই অবস্থানকে ‘মিলিয়ে নেওয়া কঠিন’ বলে মন্তব্য করেছে। সংস্থাটি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে (পিসিবি) একটি ‘পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান’ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে।

আইসিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এখনো পর্যন্ত তারা পিসিবির কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা পায়নি। তবে নির্বাচিতভাবে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের অবস্থান একটি বৈশ্বিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মৌলিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘নির্বাচিত অংশগ্রহণ প্রতিযোগিতার ভাবমূর্তি ও পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করে।’

আইসিসি জানিয়েছে, তারা জাতীয় নীতিনির্ধারণে সরকারের ভূমিকার প্রতি সম্মান দেখায়। তবে এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক ক্রিকেটের স্বার্থে নয় এবং পাকিস্তানসহ সারা বিশ্বের সমর্থকদের জন্যও হতাশাজনক। সংস্থাটি আশা প্রকাশ করেছে, পিসিবি নিজেদের দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে এবং সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে এগোবে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জন করলে পাকিস্তান কী ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ, টুর্নামেন্টের খেলার শর্তাবলি এখনো প্রকাশ করেনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। তবে আগের আসরের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানালে বা আত্মসমর্পণ করলে সেটিকে ‘ম্যাচ কনসিডেড’ অথবা ‘ম্যাচ অ্যাওয়ার্ডেড’ হিসেবে গণ্য করা হয়। পাকিস্তান এরই মধ্যে ২০ দলের এই টুর্নামেন্টের জন্য দল ঘোষণা করেছে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ অবশ্য সরকারের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল বলে আগেই জানানো হয়েছিল।

এদিকে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতের পরিবর্তে অন্য আয়োজক দেশ শ্রীলঙ্কায় নিজেদের ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে আইসিসি সেই আবেদন নাকচ করে দেয়। সংস্থাটির দাবি ছিল, নিরাপত্তা নিয়ে ‘বিশ্বাসযোগ্য কোনো হুমকি নেই’। এরপর বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানের সঙ্গে রয়েছে ভারত, নামিবিয়া, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাষ্ট্র। গ্রুপ ‘এ’-তে জায়গা পাওয়া এই দলগুলো একে অপরের মুখোমুখি হবে। বিশ্বকাপের আগে ভালো ফর্মে রয়েছে পাকিস্তান দল। রোববার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১১১ রানের বড় ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে তারা তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করেছে। এই অবস্থায় বিশ্বকাপে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ ও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলা নিয়ে শেষপর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে ক্রিকেট বিশ্ব।

পাকিস্তান বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে

গত মাসে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। পরে আইসিসি সেই আবেদন নাকচ করে দিলে বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।

এই সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ এবং ‘দ্বৈত নীতি’ বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে নিয়ম প্রযোজ্য, তা সবার জন্যই সমান হওয়া উচিত। যদি কোনো দেশ নিরাপত্তার কারণে অন্য দেশে খেলতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে, তাহলে বাংলাদেশেরও সেই অধিকার থাকা উচিত।”

মহসিন নাকভি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, গত বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল ভারত। সে সময় ভারতের ম্যাচগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে আয়োজন করা হয়। তিনি বলেন, “সে ক্ষেত্রে ভারতের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি, যা স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক।”

পিসিবি চেয়ারম্যান আরও জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে পাকিস্তান সরকার। তিনি বলেন, “যদি বাংলাদেশের প্রতি ন্যায্যতা নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে আইসিসি চাইলে আরও একটি দল যুক্ত করে ২২ দলের টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে পারে।”

যে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে

ভারতের বিপক্ষে বহুল আলোচিত ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দিলেও পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তকে এখনই চূড়ান্ত বলে মনে করছেন না ভারতের ক্রিকেট অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে মুম্বাইয়ের ক্রীড়া ও সম্প্রচার শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মহলে ধারণা, পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এই ঘোষণা শেষ কথা নাও হতে পারে।

এখনো পর্যন্ত পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) এ বিষয়ে কোনো চিঠি দিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে ধারণা, শুধু ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি বর্জন করলে পাকিস্তানকে কঠোর পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে।

আইসিসির অবস্থান স্পষ্ট- তারা এমন কোনো দৃষ্টান্ত তৈরি হতে দিতে চায় না, যেখানে কোনো সদস্য হঠাৎ করে নির্ধারিত সূচি অমান্য করে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেয়।

সংস্থাটির মতে, এতে আইসিসির কর্তৃত্ব ও স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফলে দুবাইভিত্তিক আইসিসি সদর দপ্তর থেকে পাল্টা পদক্ষেপ আসা প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে। ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পরিস্থিতি জটিল হলে আইসিসি কয়েকটি কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।                                                                                                                                                                                      এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) জন্য বিদেশি খেলোয়াড়দের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) না দেওয়া, পাকিস্তানকে এশিয়া কাপ থেকে বাদ দেওয়া কিংবা আইসিসির রাজস্ব বণ্টনে পিসিবির অংশ স্থগিত করা।

২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মোট ৫৫টি ম্যাচের মধ্যে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ম্যাচকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি দর্শক, বিজ্ঞাপন ও সম্প্রচার আয় হয়ে থাকে।

যদিও এই একটি ম্যাচকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন, কারণ এটি পুরো টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক প্যাকেজের অংশ।

তবে প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, ভারতের প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের বাজারমূল্য প্রায় এক থেকে ১ দশমিক ১ কোটি মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১০০ কোটি রুপির কাছাকাছি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের আর্থিক মূল্য সাধারণ ম্যাচের দ্বিগুণ, এমনকি তারও বেশি হতে পারে। সে হিসেবে এই ম্যাচ বাতিল হলে অন্তত ২০০ কোটি রুপির বেশি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

এই বিপুল আর্থিক ক্ষতির প্রভাব শুধু পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ওপরই নয়, পড়তে পারে আইসিসি, সম্প্রচার সংস্থা, স্পনসর এবং আয়োজকদের ওপরও। পাশাপাশি বিশ্বকাপের সামগ্রিক আকর্ষণ ও ব্যবসায়িক মূল্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা পাকিস্তানের জন্য যেমন বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে, তেমনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের অবস্থানও দুর্বল করে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।

পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া কেমন?

জনপ্রিয় ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলে ইনস্টাগ্রামে লেখেন, পাকিস্তান বিশ্বকাপে খেললেও যদি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলে, তাহলে আইসিসি কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটি দেখার বিষয় হবে। তিনি বলেন, আইনি দিকটি কীভাবে সামলানো হবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে আইসিসি চাইলে সম্প্রচার সংস্থার ক্ষতির অর্থ পাকিস্তানের রাজস্ব অংশ থেকে আদায় করতে পারে। এমনকি ভারত-পাকিস্তান ফাইনাল হলে কী হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

একই প্রশ্ন তুলেছেন ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার কেভিন পিটারসেন, তিনি তার এক্স একাউন্টে লিখেছেন – “গ্রুপ ও প্লে-অফের কাঠামোর কারণে এই বিশ্বকাপে ভারত ও পাকিস্তানের ফাইনালে দেখা হওয়া সম্ভব কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে যদি তারা ফাইনালে ওঠে, তাহলে কি পাকিস্তান বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলতে অস্বীকৃতি জানাবে?”

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান কামরান আকমল। তিনি বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেক আগেই চলে এসেছিল।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কামরান আকমল বলেন, “যথেষ্ট হয়েছে। আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতেই হতো। ভারত বারবার খেলাধুলার সঙ্গে রাজনীতি মিশিয়ে ক্রিকেটের মূল চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই সরকার যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সেটিকে সমর্থন করা উচিত।”

এদিকে ভারতের আরেক সাবেক ক্রিকেটার আকাশ চোপড়া প্রশ্ন তুলেছেন, “এমন এক দিনে ভারতের সাথে খেলবে না জানালো পাকিস্তান, যেদিন আইসিসির একটি টুর্নামেন্টে ভারত পাকিস্তানকে হারিয়েছে। এটাকে ভন্ডামি বলা যায়?”- তিনি মূলত অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ম্যাচের কথা বলেছেন যেখানে রোববার মুখোমুখি হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান।

বিবিসি বাংলা