২০২৫ সালের অপরাধের যে পরিসংখ্যান পুলিশের পক্ষ থেকে সামনে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগের নয়, বরং জননিরাপত্তার প্রশ্নে এক চরম সতর্কবার্তা। ঘরে ডাকাতি, পথে ছিনতাই আর মামলার সংখ্যা এক বছরে ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা এবং সমাজের অন্তর্নিহিত অস্থিরতা—উভয়কেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়া। বিশেষ করে ডাকাতি, ছিনতাই ও দস্যুতার মতো অপরাধগুলো সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নিরাপত্তাকে সরাসরি আঘাত করে। যখন একজন মানুষ নিজের ঘরে থাকতে ভয় পান কিংবা রাস্তায় চলতে গিয়ে দস্যুর কবলে পড়ার শঙ্কা বোধ করেন, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তিটি কোথাও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতার এই বোধটি যখন সামগ্রিক রূপ নেয়, তখন তা জনজীবনে এক ধরনের স্থবিরতা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
কেন এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি? অপরাধের এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে সাধারণত কিছু আর্থ-সামাজিক কারণ থাকে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষকে অপরাধের পথে ধাবিত করার অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তবে শুধু অভাব নয়, বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতিও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ কিংবা দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ বিচার ব্যবস্থা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। এছাড়া ডিজিটাল যুগে অপরাধের ধরনে পরিবর্তন এলেও মাঠ পর্যায়ের পুলিশিং যদি সেভাবে আধুনিক ও গতিশীল না হয়, তবে এই প্রবণতা রোধ করা দুরূহ হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, পুলিশের তথ্যে মামলার সংখ্যা বাড়াকে অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখতে চান এই যুক্তিতে যে, সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি অভিযোগ জানাতে থানায় যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিকারের হার কতটুকু? মামলার সংখ্যা বাড়লে যদি সাজার হার না বাড়ে, তবে তা কেবল নথির স্তূপই বাড়াবে, অপরাধীর মনে ভয় ধরাবে না।
বর্তমানে যে ৩৯ শতাংশ অপরাধ বৃদ্ধির তথ্য আমরা দেখছি, তা কমিয়ে আনতে কেবল কঠোর দণ্ডই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিকল্পিত ও জনবান্ধব পুলিশিং। বিশেষ করে হটস্পটগুলোতে নজরদারি বাড়ানো, রাতের বেলায় টহল বৃদ্ধি এবং পাড়া-মহল্লায় সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধের মূলে থাকা অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে।
জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ২০২৫ সালের এই পরিসংখ্যানকে স্রেফ একটি সংখ্যা হিসেবে না দেখে, একে জননিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি সংশোধনের একটি স্মারক হিসেবে নিতে হবে। সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই নিরাপত্তাহীনতার বোধ আগামীতে সামাজিক অস্থিরতাকে আরও উসকে দিতে পারে।


















































