ধ্রুপদী শায়েরির আরও কয়েকজন

ভিনদেশি সাহিত্যের মধ্যে বাঙালির অন্যতম প্রিয় শের ও শায়েরি। অর্থ পুরোপুরি বোঝা যাক বা না যাক, উর্দু শের শুনতে এতটাই মিষ্টি যে কানে লেগে থাকে। বাংলা ভাষায় অসংখ্য ফারসি ও আরবি শব্দ আছে। ফারসি ও আরবি শব্দ বোঝাই উর্দুর অনেক শব্দ আমাদের চেনা এবং আমরা তা ব্যবহারও করি।

হিন্দি সাহিত্যের আদিকাল দশম শতকের মধ্যভাগ থেকে চৌদ্দ শতক (আনুমানিক ১০৫০-১৩৭৫ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত। বাংলা সাহিত্যের আদিকালও এই সময়ের মধ্যে। বাংলা সাহিত্যের আদিকালের সাহিত্যনিদর্শন হলো ‘চর্যাপদ’, যা ছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রার্থনার পদাবলী।

হিন্দি সাহিত্যের আদিকালের সাথে একাকার হয়ে তৈরি হয় হিন্দভি নামে নতুন একটি ভাষা, মানে হিন্দুস্তানের ভাষা। এছাড়া এই ভাষাকে কখনো দেহলভি আবার কখনো দকনি এবং রেখতা নামেও ডাকা হতো। উনবিংশ শতাব্দীর পরে ভাষাটি উর্দু নামেই বেশি পরিচিতি পায়।

বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষাই অন্য ভাষা থেকে শব্দ চয়ন করে নিজ শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। ফলে বাংলা ও উর্দু ভাষা অনেকক্ষেত্রে সহজাত সম্পর্কের মতো জড়িয়ে গেছে। এ দুটো ভাষাতেই প্রবেশ করেছে প্রচুর আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ ও ইংরেজি শব্দ।

পৃথিবীর হাজার রকমের ভাষা মূলত লেখা হয় সাত-আট নিয়মের বর্ণ-অক্ষরে। এর মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ বর্ণ-অক্ষর হলো আরবি। এই অক্ষর দিয়ে আরবি, ফার্সি, পশতু, সিন্ধি ও উর্দু লেখা হয়। আর বাংলা বর্ণমালার আদি উৎস ব্্রাহ্মী লিপি। ভারতীয় প্রায় সকল ভাষার বর্ণলিপিই ব্রাহ্মী লিপি থেকে জন্ম নিয়েছে।

উর্দুসাহিত্যের প্রথমযুগে শেখ শরীফুদ্দীন গন্জ-শকরের পথ ধরেই এগিয়ে আসেন কবি আমির খসরু। দ্বাদশ শতক থেকে শুরু করে সতের শতক পর্যন্ত কাল হচ্ছে উর্দুসাহিত্যের আদিকাল বা প্রথমযুগ। সতের শতক থেকে উনিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত মধ্যযুগ। প্রথম ও মধ্যযুগের বৈশিষ্ট্য হলো গজল। এ সময়ের বেশিরভাগ কবি মূলত গজলের কবি। তবে কেউ কেউ রুবাইয়াতও লিখেছেন। যদিও সেসময় কাসিদা এবং মসনভির লেখকদের প্রকৃত কবি বলা হতো।

মীর তকি মীর থেকে মির্জা গালিবের হাতে এসে উর্দু সাহিত্য আধুনিকতার ছোঁয়া পায়। মুহাম্মদ ইকবাল থেকে ফয়েজ আহমদ ফয়েজ পর্যন্ত হলো আধুনিক উর্দু সাহিত্যের যৌবনকাল। এরপরে উত্তরাধুনিক কাল শুরু।
প্রথম উর্দু কবিদের অন্যতম ও প্রচলিত কাওয়ালি গানের জনক আমির খসরু। তিনি হিন্দি ভাষার প্রথম মুসলমান কবি। আমির খসরুকে নিয়ে আলাদা একটি পর্ব (শের, শায়েরি ও শায়ের। পর্ব ৪) আগেই প্রকাশিত হয়েছে।

যে শায়েরি বা শের চিরায়ত বা অনেককাল আগে থেকেই স্বীকৃত ও সমাদৃত সেগুলোই ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদী। মীর তকি মীর উর্দু কবিতার স্থপতিদের অন্যতম। তাঁকে ভাবা হয় উর্দুর সবচেয়ে বড় কবি। আর মির্জা গালিবের হাত ধরেই আধুনিক উর্দু কবিতার জন্ম। এই দুজনের মাঝের ও কাছাকাছি সময়ে আরও কয়েকজন ধ্রুপদী শায়েরের শের এই পর্বে উপস্থাপন করলাম।

 

কুলি কুতুব শাহ
(১৫৬৫-১৬১২)

কুলি কুতুব শাহ দাক্ষিণাত্যের কুতুবশাহী রাজবংশের মানুষ, ছিলেন গোলকোণ্ডা রাজ্যের সুলতান। হায়দারাবাদ নগরের প্রতিষ্ঠাতা। উর্দু সাহিত্যের প্রথম যুগে যে কবির কাব্য সংকলন গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় তিনি কুলি কুতুব শাহ। তাঁর কাব্যগ্রন্থটির নাম ‘দিওয়ান’। দিওয়ান ফার্সি শব্দ, যার অর্থ কাব্যগ্রন্থ। ফার্সি আর তেলেগু ভাষাতেও কবিতা লিখেছেন তিনি। তাঁর লেখা লক্ষাধিক পঙ্ক্তির সন্ধান মিলেছে। উর্দুতে পারস্য কবি হাফিজ শিরাজির কবিতারও প্রথম অনুবাদক তিনি। কুলিই প্রথম উর্দু কবিতায় প্রেম ও প্রকৃতি নিয়ে আসেন। উর্দু কবিতাতে সুনির্দিষ্ট যে ছন্দ প্রকরণ তিনি নিয়ে এসেছেন তা আজও মেনে চলা হয়।

পিয়া বাজ পিয়ালা পিয়া জায়ে না
পিয়া বাজ ইয়াক তিল জিয়া জায়ে না

[ পিয়া-প্রিয়; পিয়ালা-পেয়ালা; পিয়া-পান
ইয়াক তিল-এক তিল; জিয়া-বাঁচা ]

প্রিয় ছাড়া পেয়ালা পান করা যায় না
প্রিয় ছাড়া এক তিল বাঁচা যায় না

মোহাব্বাত কি সুলতানি হ্যায় সব জগত মেঁ
কি উস সাম নেহিঁ কোয়ি গেয়ানি ও দানি

[ মোহাব্বাত-ভালোবাসা; সুলতানি-রাজত্ব;
জগত-দুনিয়া; কোয়ি-কেউ; গেয়ানি ও দানি- জ্ঞানী ও উদার ]

সারা দুনিয়া জুড়ে রাজত্ব ভালোবাসার
এর মতো হয় না কেউ জ্ঞানী ও উদার

ইশ্ক পন্থ মে জিন না বেতাব হোওয়ে
উসে আশিকাঁ কিঁ নাহিঁ ও সিয়ানি

[ ইশ্ক-প্রেম; পন্থ-পথ; বেতাব-অধীর
আশিকাঁ-প্রেমিক; সিয়ানি-সেয়ানা ]

প্রেমের পথে হয় না যে অধীর
বড়ই সেয়ানা সে, নয় প্রেমিক প্রবর

সব ইখতিয়ার মেরা তুজ হাত হ্যায় পিয়ারা
জিস হাল সুঁ রাখখেগা হ্যায় ও খুশি হামারা

[ ইখতিয়ার-এখতেয়ার বা কর্তত্ব ; পিয়ারা-প্রিয়
জিস হাল-যেমন ]

তোমার হাতেই প্রিয় সব কিছু আমার
যেমন রাখো তাতেই আনন্দ আমার

কাহি থে পিয়া বিন সুবুরি করু
কিয়া জায়ে আমা কিয়া যায়ে না

[ কাহি থে-বলছো; সুবুরি-ধৈর্য্য
কিয়া-বলা ]

বলছো, প্রিয় ছাড়া ধৈর্য্য ধর
বলা সহজ, বাঁচা কঠিন প্রিয় ছাড়া

 

ওয়ালি দকনি

(১৬৬৭-১৭০৭)

ওয়ালি দকনির আসল নাম শামসউদ্দিন মুহাম্মদ ওয়ালি। তিনি শামস ওয়ালিউল্লাহ নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর কবি নাম ওয়ালি দকনি, যার মানে দাক্ষিণাত্যের ওয়ালি। আবার কারো কারো কাছে তিনি গুজরাটি ওয়ালি নামেও পরিচিত। দাক্ষিণাত্য ও গুজরাট দুই অঞ্চল ওয়ালিকে তাদের নিজেদের বলে দাবি করে। তিনি জন্মে ছিলেন মহারাষ্ট্রের আওরাঙ্গাবাদে আর তাঁকে সমাহিত করা হয় গুজরাটের আহমেদাবাদে। ২০০২ সালের দাঙ্গায় তাঁর সমাধি ভেঙ্গে ফেলা হয়।
ওয়ালিকে উর্দু কবিতার আদি পিতা বলে গণ্য করা হয়। উর্দু গজলের আজকের যে রূপ তা ওয়ালির মাধ্যমেই হয়েছে। তিনি কখনো কোন দরবারের সাথে যুক্ত হননি। লেখেননি কোন ব্যক্তি বিশেষকে নিয়ে প্রশস্তি কাব্য। শিল্পসম্মত ভাষা হিসেবে উর্দুর সমৃদ্ধির জন্য কাজ করেছেন ওয়ালি দকনি। ১৮৪৪ সালে ওয়ালি দকনির দিওয়ান প্যারিস থেকে সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন প্রফেসর টাসি।

আকিবাত ক্যায়া হোয়েগা মালুম নেহিঁ
দিল হুয়া হ্যায় মুবতালা দিলদার কা

[ আকিবাত- পরিণতি; হোয়েগা-হবে; মালুম-জানা
মুবতালা-পীড়িত; দিলদার-হৃদয়হরণী ]

কে জানে কি হবে পরিণতি
হৃদয় করেছে পীড়িত হৃদয়হরণী

গর হুয়া হ্যায় তালিবে আযাদগি
বন্দ মাত হো সুব্হা ও যুন্নার কা

[ গর-যদি; তালিবে-চেয়েই ফেলো; আযাদগি-মুক্তি
সুব্হা-তসবি; যুন্নার-পৈতা ]

মুক্তি যদি চেয়েই ফেলো, তবে
হয়ো না বন্দী তসবি আর পৈতার

জিসে ইশক কা তীর কারি লাগে
উসে জিন্দেগি কিউঁ না ভারি লাগে

[ ইশক কা তীর-প্রেম তীর; কারি-বিষম
জিন্দেগি-জীবন; কিউঁ-কেন ]

প্রেম তীরের বিষম আঘাত লেগেছে যার
জীবন কেন লাগবে না ভারী তার

চাহতা হ্যায় ইস জাহান মেঁ গর বাহিশত্
জা তামাশা দেখ্ উস রুখসার কা

[ জাহান-জগত; বাহিশত্-স্বর্গ
জা-যাও; রুখসার-মুখ ]

এ জগতেই চাও যদি স্বর্গ
যাও, সেই মুখের তামাশা দেখ


ইয়াদ করনা হর ঘড়ি উস য়ার কা
হ্যায় ওয়াজিফা মুঝ দিলে বিমার কা

[ ইয়াদ-স্মরণ; হর ঘড়ি- প্রতি মুহূর্ত; য়ার-প্রিয় বা বন্ধু
ওয়াজিফা-প্রার্থনা; দিলে বিমার-পীড়িত হৃদয় ]

প্রতি ক্ষণে প্রিয়র কথা হয় যে স্মরণ
এই তো আমার পীড়িত হৃদয়ের প্রার্থনা

মুফলিসি সাব বাহার খোতি হ্যায়
মর্দ কা এহ্তিবার খোতি হ্যায়

[ মুফলিসি-গরীবী; বাহার-আনন্দ/বসন্ত; খোতি-ক্ষতি
মর্দ-মরদ; এহ্তিবার-ভরসা ]

আনন্দ নিরানন্দ হয় গরীবীতে
মরদের ভরসাও শেষ হয় তাতে

 

সওদা

(১৭১৮-১৭৮১)

সওদার পুরো নাম মির্জা মুহাম্মদ রফি। কাবুল থেকে আসা অভিজাত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। জন্মেছেন দিল্লিতে। বেড়ে ওঠাও সেখানে। পারিবারিক ব্যবসায়ে তাঁর আগ্রহ ছিল না। কবিতায় তাঁর ঝোঁক, হয়েছেন সফল কবি। মাঝ বয়েসে বার বার দিল্লিতে আক্রমণ, লুটতরাজ আর গণহত্যায় টিকতে না পেরে ঠাঁই নেন লখনউতে।
লখনউর নবাব আসাফদ্দৌলার দরবারে মালিকুশ শোয়ারা বা রাজকবি হিসেবে বার্ষিক ছয় হাজার টাকা সম্মানীতে নিযুক্ত হন সওদ। ফরাসি ধারা থেকে নেয়া নতুন নতুন ছন্দ-প্রণালী ও কাব্যরসের সৃষ্টি করে তিনি উর্দৃ সাহিত্যে এক নতুন যুগের প্রবর্তন করেন। উর্দুতে প্রশস্তি আর ব্যঙ্গকাব্য লেখার সূত্রপাত ঘটান তিনি।

মেঁ নে তুম কো দিল দিয়া অউর তুম নে মুঝে রুসভা কিয়া
মেঁ নে তুম সে ক্যায়া কিয়া অউর তুম নে মুঝ সে ক্যায়া কিয়া

[ দিল-হৃদয়; রুসভা-প্রত্যাখ্যান ]

তোমায় আমি হৃদয় দিলাম আর তুমি করলে প্রত্যাখ্যান
আমি তোমায় করলাম কী আর তুমি আমায় করলে কী

গরয কুফর সে কুছ, না দ্বীন সে হ্যায় মতলব
তামাশায়ে দ্যায়র ও হারম দেখতে হ্যায়ঁ

[ গরয-দায়; কুফর-দায়
দ্যায়র-মন্দিও; হারম-মসজিদ ]

অবিশ্বাসে নেই দায়, না আছে কাজ ধর্মে
শুধু তামাশা দেখি মন্দির ও মসজিদের

দোযখ মুঝে কবুল হ্যায় এ্যায় মুনকার ও নকির
লেকিন নেহি দিমাগ সওয়াল ও জওয়াব কা

[ দোযখ-নরক; মুনকার ও নকির-ফেরেস্তার নাম
সওয়াল ও জওয়াব-প্রশ্ন ও উত্তর ]

নরকে যেতে আপত্তি নেই, হে মুনকার নকীর
কিন্তু সওয়াল জওয়াব? পারবো না, ক্ষমা চাই

হোতি নেহি হ্যায় সুবহা না আতি হ্যায় মুঝ কো নিঁদ
জিস কো পুকার তা হুঁ ও কেহতা হ্যায় মর কাহিঁ

[ সুবহা-ভোর; নিদ-ঘুম
পুকার-ডাকা; কেহতা-বলে ]

ঘুম আসে না চোখে হয় না ভোর
যাকে ডাকি সেই বলে- মরনও নেই তোর!

হিন্দু হ্যায় বুদ-পরস্ত, মুসলমাঁ খুদা পরস্ত
পুজ ম্যায় উস কিসি কো জো হ্যায় আশনা পরস্ত

[ বুদ-পরস্ত- মূর্তিপূজক; খুদা পরস্ত-খোদাভক্ত
আশনা-বন্ধু; পরস্ত-ভক্ত বা অন্তপ্রাণ ]

হিন্দুতো মূর্তিপূজক, খোদাভক্ত মুসলমান
পূজা করি তার যে বন্ধু অন্তপ্রাণ

শেখ কাবা মে খুদা কো তু আবস্ টুডে হ্যায়
তালিব উস্ কা হ্যায় তো হর ইক কি কর দিল জুয়ি

[ আবস্-বৃথাই; টুডে-খোঁজা
তালিব- অনুসন্ধানকারী ]

শেখ, কাবায় ঈশ^র কে তুমি বৃথাই খুঁজছো
তাঁর খোঁজই যদি চাও, তবে সবার হৃদয়ে খোঁজ

 

আতিশ

(১৭৭৭-১৮৪৬)

খাজা হায়দার আলী আতিশ, দিল্লির এক সুফি পরিবারের সন্তান। জন্মগ্রহন করেন ফয়েজাবাদে। শৈশব কাটিয়ে লক্ষেèৗ চলে যান। লখনউ তখন কাব্য চর্চায় জমজমাট। উদার সুফি মনোভাবের এই কবি জাকজমক থেকে দূরে থেকে কবিতায় নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।
শায়ের শেখ গুলাম হামদানি মাসহাফির শিষ্য ছিলেন আতিশ। উর্দু ছাড়াও ফারসিতে কবিতা লিখেছেন এবং উর্দু বাগধারায় সুপণ্ডিত ছিলেন আতিশ। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল সহজ ও বোধগম্য। সাধারণের কথ্য ভাষার ব্যবহার তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

য়ে আরজু থি তুঝে গুল কে রুবারু করতে
হাম অওর বুলবুলে বেতাব গুফতুগু করতে

[ আরজু-বাসনা; গুল-ফুল; রুবারু-মুখোমুখি
বেতাব-অধীর বা ব্যাকুল; গুফতুগু-কথোপকথন ]

ফুলের মুখোমুখি করি তোমায়, ছিল বাসনা
কথোপকথন আমি ও বুলবুল, ব্যাকুল দুজনা

এয় সনম জিস নে তুঝে চাঁদ সি সুরত দি হ্যায়
উসি আল্লাহ নে মুঝকো ভি মুহাব্বত দি হ্যায়

[ সনম-প্রিয়া; তুঝে-তোমায়; সুরত-রূপ
মুঝকো-আমায়; মুহাব্বত-প্রেম ]

হে প্রিয়া তোমায় যে চাঁদের মতো রূপ দিয়েছে
সেই আল্লাহ আমাকেও প্রেম দিয়েছে

বুতখানা তোড় ডালিয়ে মসজিদ কো ঢাইয়ে
দিল কো না তোড়িয়ে খুদা কা মাকাম হ্যায়

[ বুতখানা-মন্দির, তোড়-ভাঙ্গা; ঢাইয়ে-ধসিয়ে দেয়া
দিল-হৃদয়; মাকাম-ঘর ]

মন্দির ভেঙ্গে ফেলো মসজিদ ধসিয়ে দাও
হৃদয় ভেঙ্গো না এ তো খোদার ঘর

কুছ নযর আতা নেহিঁ উস কে তাসাব্বুর কে সিওয়া
হসরতে দিদার নে আঁখো কো আন্ধা কর দিয়া

[ নজর- দেখা বা চোখে পড়া; তাসাব্বুর- কল্পনায় দেখা; সিওয়া-ব্যতীত
হসরতে দিদার- দেখার আকাক্সক্ষা; আঁখো-চোখ ]

তার ভাবনা ছাড়া কিছইু পড়ে না আর চোখে
শুধু তোমাকেই দেখবো বলে অন্ধ হয়েছে চোখ

আজব তেরি হ্যায় এয় মাহবুব সুরাত
নযর সে গির গায়ে সাব খুবসুরাত

[ আজব-বিস্ময়কর; মাহবুব-প্রেমময়; সুরাত-মুখ
নযর-দেখা; গির-পতন; খুবসুরত-সুন্দর ]

আজব তোমার প্রেমময় সুরত
নজরের আড়ালে সব খুবসুরত

হর শাব শাবে বরাত হ্যায় হর রোজ রোজে ঈদ
সোতা হুঁ হাথ গর্দানে মিনা মেঁ ডাল কে

[ শাব-রাত; শাবে বরাত-ভাগ্য লেখার রাত;
সোতা-নিদ্রা; গর্দানে মিনা-সুরাহি ]

সুরাহি- লম্বা গলাযুক্ত এক ধরনের পানপাত্র

প্রতি রাত শবে বরাত, প্রতিদিন ঈদ
সুরাহি ঘাড়ে রেখে নিদ্রা যাই রাতে

[ শাব-রাত; শাবে বরাত-ভাগ্য লেখার রাত;
সোতা-নিদ্রা; গর্দানে মিনা-সুরাহি ]

সুরাহি- লম্বা গলাযুক্ত এক ধরনের পানপাত্র

 

যওক

(১৭৯০-১৮৫৪)

শেখ মুহাম্মদ ইব্রাহিম যার তাখাল্লুস নাম যওক, ছিলেন শেষ মোগল সম্্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ওস্তাদ। মির্জা গালিবের সমকালে তিনি ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি। জন্মেছিলেন এক মামুলি সিপাহির ঘরে। বাবা রমজান আলী ছিলেন ক্ষত্রিয় বর্ণ থেকে আসা নও-মুসলিম পরিবারের সন্তান। এই পরিবার জ্ঞান ও সাহিত্য থেকে ছিল অনেক দূরে। যওককে হাফিজ গোলাম রসুলের মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়েছিল। গোলাম রসুল নিজে একজন কবি ছিলেন এবং শওক ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তাঁর সাহচর্যেই যওকের কবিতার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে যওক বাদশার শিক্ষক হওয়ার সূত্রে রাজকবির মর্যাদা পান। আমৃত্যু তা-ই ছিলেন, এমনকি গালিবের মতো প্রতিভাবান কবিও তাঁর ওই জায়গা দখল করতে পারেননি। নিজের সময়ে জনপ্রিয়তায় যওক গালিবের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন।
তখনকার দিনে ভাষা ও শব্দের বাহাদুরি দিয়েই কবির যোগ্যতা বিচার হতো। কাব্যের গভীরতা যা গালিবের রচনাকে অমরতা দিয়েছে, সে-রস অনুধাবন করার ক্ষমতা ওই সময়ের অল্প শিক্ষিত শ্রোতাদের ছিল না। যওক ভাষা ও শব্দ ব্যবহারে পটু ছিলেন আর যেহেতু খুব কম বয়স থেকে দরবারে আসা-যাওয়া এবং রাজন্যসংসর্গ তাই তাঁর ঝোঁক ছিল কসিদা লেখার দিকে। কসিদা উর্দু কাব্যের এক বিশেষ ধারা যাতে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির গুণকীর্তন করা হয়। এ ছাড়া, যওক ছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষ, তাই তাঁর কবিতায় ধর্মীয় অনুষঙ্গ বেশি। সম্রাট নিজে সহজ ভাষা পছন্দ করতেন। সিপাহি বিদ্রোহের গোলমালে যওকের বহু লেখা হারিয়ে যায়। মাত্র ১২০০টি দ্বিপদী এবং ১৫টি দীর্ঘ কবিতা (কসিদা) পাওয়া যায়।

যাহিদ শারাব পিনে সে কাফির হুয়া ম্যায়ঁ কিউঁ
ক্যায়া দেঢ় চুল্লু পানি মেঁ ইমান বেহ গ্যায়া

[ যাহিদ-তপস্বী; পিনে-পান করা; কিউঁ-কেন
দেঢ়-দেড়; চুল্লু-আঁজলা বা সামন্য; বেহ-ভেসে ]

তপস্বী, শরাব পান করায় আমি কাফের হলাম কেমন করে
দেড় আঁজলা পানিতে কি ইমান ভেসে গেলো?

আব তো ঘাবরা কে য়ে কেহতে হ্যায়ঁ কি মর জায়েঙ্গা
মর কে ভি চ্যায়েন না পায়া তো কিধার জায়েঙ্গা

[ আব-এখন; ঘাবরা-ভয়; মর-মরা
চ্যায়েন-শান্তি; কিধার-কোথায় ]

এখন তো ভয় পেয়ে বলি যে মরে যাবো
মরেও শান্তি না পেলে কোথায় যাবো

মালুম জো হোতা হামেঁ আনজাম-এ-মোহাব্বাত
লেতে না কাভি ভূল কে হাম নাম-এ-মোহাব্বাত

[ মালুম-জানা; আনজাম-এ-মোহাব্বাত-প্রেমের পরিণাম
কাভি-কখনো; নাম-এ-মোহাব্বাত-প্রেমের নাম ]

জানা যদি থাকতো আমার প্রেমের পরিণাম
নিতাম না কখনো আমি ভুলে প্রেমের নাম

হক নে তুঝ কো ইক জাবান দি অউর দিয়ে হ্যায়ঁ কান দো
ইস কে য়ে মা’আনি কহে ইক অউর সুনে ইনসান দো

[ হক-খোদা; জাবান-জিভ
ইনসান-মানুষ ]

খোদা তোমাকে জিভ দিয়েছে একটি আর কান দুটো
এর মানে মানুষ বলবে একটি কথা, শুনবে দুটো

ওয়াক্ত-এ-পীরী শাবাব কি বাতেঁ
এ্যায়সি হ্যায়ঁ জ্যায়সে খোয়াব কি বাতেঁ

[ ওয়াক্ত-এ-পীরী-বুড়ো বয়স; শাবাব-যৌবন
খোয়াব-স্বপ্ন; বাতেঁ-কথা ]

বুড়ো বয়সে যৌবনের কথা
মনে হয় এখন স্বপ্নের মতো

 

দাগ

(১৮৩১-১৯০৫)

দাগ দেহলভির প্রকৃত নাম নওয়াব মির্জা খান। মায়ের দ্বিতীয় বিবাহসূত্রে বাস করতেন দিল্লির লালকেল্লায়। তাঁর মা বাহাদুর শাহ জাফরের পুত্র যুবরাজ মির্জা মোহাম্মদ সুলতানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পিতার মৃত্যু এবং ১৮৫৭ সালে দিল্লির পতনের পর তিনি রামপুরে গমন করেন। পরে লখনউ, পাটনা, কলকাতা, হায়দারাবাদে বাস করেন।
গালিব এবং ইকবালের মাঝামাঝি প্রজন্মের কবি দাগ। তিনি আগাগোড়াই গজলের কবি। ইকবাল তাঁর শিষ্যদের একজন। জিগর মোরাদাবাদিও তাঁর শিষ্য। তেমনি তিনি নিজেও শিখেছেন অগ্রজ দুই শ্রেষ্ঠ কবি যওক এবং গালিবের কাছে।
দাগের কবিতার বিশিষ্টতা হচ্ছে ভাষার শুদ্ধতা আর চিন্তার সরলতা। সরল, মসৃণ, একরৈখিক ভাবপ্রবণতা ছিল তাঁর জনপ্রিয়তার মূল কারণ।

আভি কমসিন হো রেহ্নে দো কাহিঁ খো দোগে দিল মেরা
তুমহারে হি লিয়ে রাক্খা হ্যায় লে লেনা জওয়াঁ হো কর

[ কমসিন-অল্প বয়স; খো দোগে-হারিয়ে ফেলবে
জওয়াঁ-জোয়ান ]

এখনো অল্প বয়স, থাকুক, কোথাও হারিয়ে ফেলবে হৃদয় আমার
তোমার জন্যই রাখা আছে নিয়ে নিও জোয়ান হলে

ইস নাহিঁ কো কোঈ ইলাজ নেহিঁ
রোজ কেহ্তে হ্যায়ঁ আপ আজ নেহিঁ

[ কোই- কোন; ইলাজ-চিকিৎসা; কেহ্তে-বল ]

এই না-এর কোন চিকিৎসা নেই
রোজ তুমি বল, আজ না

আশিকি সে মিলেগা এয় যাহিদ
বান্দেগি সে খুদা নেহিঁ মিলতা

[ আশিকি-প্রেমেই; যাহিদ-তপস্বী
বান্দেগি-দাসত্বে ]

প্রেমেই মিলবে হে তপস্বী
বন্দেগিতে মেলে না খোদা

জিস মেঁ লাখোঁ বরস কি হুরেঁ হোঁ
এয়সি জান্নাত কো ক্যায়া কারে কোঈ

[ লাখোঁ- লাখ-লাখ; হুর-বেহেস্তের সুন্দরী
এয়সি-এমন; জান্নাত-স্বর্গ ]

যেখানে অযুত বয়সী সব উর্বশীর বাস
এমন এক স্বর্গ দিয়ে কার কী কাজ
(এখানে লাখোঁ বলতে অযুত বা অসংখ্য এবং
হুরঁ বলতে উর্বশী বোঝানো হয়েছে)

 

জিগর

(১৮৯০-১৯৬০)

উর্দু ধ্রুপদি কাব্যের শেষ প্রতিনিধি জিগর মোরাদাবাদি। আসল নাম আলী সিকান্দর। জন্ম উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ শহরে। জিগর ছিলেন জনগণের কবি। প্রথাগত গজলকবিদের মতো প্রথমদিকে তিনিও সুরা-সাকির মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছেন, কিন্তু আস্তে আস্তে তাঁর লেখায় মরমি ভাব উঠতে থাকে।
জিগরের বাবা কবি ছিলেন, লেখার হাতেখড়ি তাঁর কাছেই। পরে কবি দাগ আর আসগরের পরামর্শ নিয়েছেন। প্রেমের কবি হিসেবে জিগর কম সময়ে প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েও, শুধু কবিতার জন্যই আলিগড় মুসলিম বিশ^বিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন অনারারি ডি.লিট।

ইক লফ্জে মোহাব্বত কা আদ্না য়ে ফাসানা হ্যায়
সিম্টে তো দিল-এ-আশিক ফায়লে তো জামানা হ্যায়

[ লফ্জ-শব্দ; আদ্না-তুচ্ছ; ফাসানা-কাহিনি
সিম্টে-সংকুচিত; আশিক-প্রেমিক; ফয়লে-ছড়ায়; জামানা-দুনিয়া ]

প্রেমের একটি শব্দ যেন ছোট একটি গল্প
খুব ছোট তো প্রেমিকার হৃদয়, বড় হলে ছড়ায় দুনিয়ায়

তেরি আখোঁ কা কুচ কসুর নাহিঁ
হ্যাঁ মুঝি কো খারাব হোনা থা

[ আখোঁ-চোখ; কসুর-খুঁত,দোষ
মুঝি-আমার; খারাব-খারাপ ]

তোমার চোখের কোন দোষ নেই
হ্যাঁ, আমার তো খারাপ হওয়ারই কথা

য়ে ইশ্ক নেহিঁ আসাঁ ইতনা হি সমঝ লিজে
ইক আগ কা দরিয়া হ্যায় অউর ডুব কে জানা হ্যায়

[ ইশ্ক-প্রেম; আসাঁ-সহজ; সমঝ-বুঝে
আগ-আগুন; দরিয়া-সাগর,নদী ]

এই প্রেম সহজ নয়, এটুকু বুঝে নাও
এক আগুনের নদী, ওতে ডুবে যেতে হয়

আতিশে ইশ্ক ও জাহান্নাম হ্যায়
জিস মেঁ ফিরদৌস কে নযারে হ্যায়ঁ

[ আতিশে ইশ্ক-প্রেমের আগুন; জাহান্নাম-নরক
ফিরদৌস-স্বর্গ; নযারে-দৃশ্য ]

প্রেমের আগুন সেই নরক
যাতে আছে স্বর্গের দৃশ্য

জো তুফানো মেঁ পালতে জা রাহে হ্যায়ঁ
ওহি দুনিয়া বদল্তে জা রাহে হ্যায়ঁ

[ তুফান-ঝড়; পলতে-প্রতিপালিত
ওহি-সেই; দুনিয়া-পৃথিবী ]

তুফানের মধ্যে যে কিনা উঠেছে বেড়ে
সে-ই বদলে দিচ্ছে দুনিয়া

চয়ন, সম্পাদনা ও উপস্থাপন রুশো মাহমুদ