হাবিবুল হক বিপ্লব »
বিজয়দিবস সংখ্যায় প্রকাশিত লেখার বাকী অংশ।
তার কবিতা হতেই আমরা জানতে পারি- ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা শহিদ ছেলের দান কে লিখেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার গান? স্বাধীনতার গানগুলো লাল রক্তে হলো লেখা রক্ত সাগর পেরিয়ে পেলাম স্বাধীনতার দেখা।’ মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় কবির কবিতা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের। তারা একদিকে যেমন এককোটি শরণার্থীকে লালন-পালন করেছেন নয়মাস, তেমনি বিশ্বব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতেও ব্যস্ত ছিলেন। এর পাশাপাশি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় নিয়ে তারা অমূল্য কবিতাও রচনা করেছেন। কবি ও সমালোচক বুদ্ধদেব বসু ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’ শিরোনামে লিখেছেন এক অসাধারণ কবিতা- ‘আজ রাত্রে বালিশ ফেলে দাও, মাথা রাখো পরস্পরের বাহুতে, শোনো দূরে সমুদ্রের স্বর, আর ঝাউবনে স্বপ্নের মতো নিস্বন, ঘুমিয়ে পোড়ো না, কথা ব’লেও নষ্ট কোরো না এই রাত্রি- শুধু অনুভব করো অস্তিত্ব।’ পশ্চিবঙ্গের জয়ন্ত সাহা একাত্তর-বাহাত্তর সালে প্রকাশিত পশ্চিবঙ্গের পত্র-পত্রিকা ঘেটে পঞ্চাশ জন কবির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কবিতা নিয়ে একটি অসাধারণ সংকলন সম্পাদনা করেন। কবিতাগুলোর মাধ্যমে পূর্ব বাংলার প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং তার সাথে মুক্তিযুদ্ধের অপূর্ব এক ভিন্ন চিত্র প্রতিফলিত হয়। এতে মনীশ ঘটক, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, বিমল চন্দ্র ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন বসু, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত, মনীন্দ্র রায় থেকে শুরু করে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সিদ্ধেশ্বর সেন, রানা বসু, শক্তি চট্টপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ প্রমুখ কবির কবিতায় সমৃদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় নিয়ে পাকিস্তানী কবিদের কবিতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের সাথে আমাদের কোন যুদ্ধ ছিল না। আমরা কেবল আমাদের স্বাধীনতা চেয়েছিলাম। আমাদের যৌক্তিক দাবিকে সম্মান জানিয়ে, আমাদের উপর অমানবিক নির্যাতনকে নিন্দা করে পাকিস্তানী কবিরাও লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন কবিতা। কবিতা লিখে জেল খেটেছেন কবি আহমেদ সালিম। সালিম ছাড়াও ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, সৈয়দ আসিফ শাহাকার, আহমদ ফরাজ এদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অকৃত্রিম সমর্থন ও সমবেদনা ফুটে উঠেছে। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ লিখেন- ‘এই হত্যার উৎসব কী দিয়ে সাজাই? কী দিয়ে রাঙাই এই হত্যাযজ্ঞ!’ সৈয়দ আসিফ শাহাকারের কবিতায় পাই- ‘বাংলা দেবী, এই স্বাধীনতার রয়েছে অনেক ঋণ এই ঋণ শোধ হয়েছে তোমার হাজারো সন্তানের শক্তি ও মুক্তি দিয়ে’। অন্যান্য বিদেশী ভাষায় বিজয়ের কবিতা : বাংলা ভাষা ছাড়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অন্য ভাষার কবিরাও কবিতা রচনা করেছেন। উনিশশো একাত্তর সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে পাপুয়া নিউগিনি থেকে বিদেশী ও বাংলাদেশী কবিদের ইংরেজিতে ভাষান্তরিত একটি কবিতা সংকলন প্রকাশ পায়। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বের সমর্থন আদায়ে ‘টু ইচ মাই ব্লাড এ্যান্ড আদার হিম’ নামে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের দেশটি থেকে এই কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, যার সম্পাদক কবি পৃথেন্দ্র চক্রবর্তী। পৃথেন্দ্র চক্রবর্তী ও উলি বেয়ার বাংলা কবিতাগুলো ইংরেজিতে ভাষান্তর করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ভূমিকার বিরুদ্ধে কবিতায়-গানে-আলোকচিত্রে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন লিয়ার লেভিন, এ্যালেন গিন্সবার্গ, জর্জ হ্যারিসন, জোয়ান বায়েস প্রমুখ ব্যক্তিরা। জোয়ান বায়েসের গীতিকবিতা- ‘Bangladesh, Bangladesh When the sun sinks in the west Die a million people of the Bangladesh’ বিশ্বকে জানিয়ে দেয় বাংলাদেশের নাম। গিন্সবার্গের সেই অসাধারণ বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড ’ কিংবা হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ শীর্ষক কবিতা ও গীতিকবিতা আমাদের অমূল্য সম্পদ। মার্কিন কবি এ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা আজও জ্বলজ্বল করে আমাদের মানসপটে- ‘Millions of fathers in rain Millions of mothers in pain Millions of brothers in woe Millions of sisters nowhere to go…’ ব্রিটেনের টমাস এ্যানসেল ‘বাংলাদেশ’ কবিতায় লিখেছেন- ‘এই ভূমি অশ্রুতে ভেসে গেছে আর অনাথের কান্নায় উচ্চকিত মৃতের লাল রক্তে শহীদেরা মিশে আছে’। অস্ট্রেলিয়ান কবি ফিলিপ ভয়েজি বেদনায় কাতর হয়ে বলেন- ‘তোমার কী হবে বাংলাদেশ গোটা পৃথিবী তোমার কান্না দেখেছে মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো তোমার একটি টুকরো মৃত।’ কানাডা প্রবাসী কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের সম্পাদনার বদৌলতে আমরা জানতে পারি, ডয়েচে ভাষায় জার্মান কবি গিয়ার্ড লুইপকে ‘কুড হেইম এবং শেখ মুজিব’ শীর্ষক কবিতায় এঁকেছেন তুলনামূলক চিত্র- ‘আমাদের হিটলার ছিল- একাত্তরে তোমাদের ছিল ইয়াহিয়া আমরা দুই জার্মানির দেয়াল ভেঙেছি : যুক্ত তোমরা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান পৃথক করে : মুক্ত’। সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের সঙ্গে যেমন আমাদের পতাকার অপূর্ব মিল আছে তেমনি মিল আছে মানসিকতারও। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে জাপান যে অবদান রেখেছে তা তাদের কবিতাতেই প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন- ‘বন্ধু, তোমাদের মায়ের ক্রন্দন ঝরছে বৃষ্টির জলে তোমাদের ভাইয়ের বেদনা বইছে নদী-ঝর্নায়।’ বসনিয়ান কবি ইভিৎসা পিসেস্কি লিখেছেন- ‘আমি তখনো জন্ম নিইনি তারপরও আমি তাদের দৃঢ়কণ্ঠের আওয়াজ শুনেছি। জোরে জোরে বলছে : মুক্তি।’ মারাঠি কবি হিরা বানসোদের কবিতায় পাই- ‘যে সাহসে ভর করে পেয়েছ বরমাল্য আমার বন্ধুরা, তোমাদের জন্য এনেছি সূর্যোদয়।’ নেপালি কবিদের মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের প্রতি ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন। নেপালি কবি বিবশ পোখরেল মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি যুগিয়ে বলেন- ‘শত্রুকে পরাজিত করে উড়িয়ে দাও সবার জন্য একটি সমবেত সকাল।’ কালের ব্যাপ্তিতে নয়মাস খুব অল্প সময় হলেও এর ব্যাপ্তি ও ব্যাপকতা বিশাল।
তিরিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা-বোনের সমভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া বিজয় পৃথিবীর নানা দেশে নানাবিধভাবে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। কারও কাছে গানে, কারও কাছে চিত্রে আবার কারও কাছে কবিতায় বিজয় হয়ে উঠেছে অর্থবহ। বিজয় ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিগত চুয়ান্ন বছর ধরে লিখা কবিতার হদিশ বের করা সত্যিই হার্কিউলিসের কাজ। এমনকি বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে যত বিজয়ের কবিতা রচিত হয়েছে তার হিসাব বের করাও সহজ নয়। সাহিত্যের স্রোতধারায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার বিজয় ঘটিয়েছে ব্যাপক সৃজনশীলতার উন্মেষ। এই সৃজনশীলতা দীর্ঘজীবী হোক, বিশ্বজয়ী হোক।





















































