ফিচার শিল্প-সাহিত্য

দিনান্তের যাত্রা

• ফিলিস্তিনের গল্প

 

মূল: ইজ্জাত আল-গাজ্জাউয়ি • অনুবাদ : আলমগীর মোহাম্মদ

গ্রামে অনেকগুলো মোড় ছিল। যার মধ্যে বাস টার্মিনালের দিকে যাওয়া পশ্চিমের শেষ প্রান্তটি ছিল সবচেয়ে বিবর্ণ। ওম সাবের (সাবেরের মা) গ্রামের যুব কমিটির বসানো পরিষ্কার প্লাস্টিকের বেঞ্চটিতে বসে শহরের প্রথম মাইক্রোবাসটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। অস্থিরভাবে তিনি নিজের পোশাকের ভেতর হাত দিয়ে সেখানে রাখা কাগজের টুকরোটি পরখ করে নিলেন। পুরনো ট্যাক্সি ড্রাইভার আবু হোসনি তাকে গন্তব্যে পৌঁছানোর সব নির্দেশনা লিখে দিয়েছিল: শাত্তা কারাগার। সেখানে এখন তার অস্তিত্বের সবচেয়ে মধুর অংশটি (তার সন্তান) বাস করে, যার টানে দূরত্ব আর সময় এখন তার কাছে নিছক বিভ্রম। একটি বড় বিড়াল তার শিশিরভেজা লোম ওম সাবেরের কালো পোশাকের এক প্রান্তে ঘষতে লাগল। তিনি হাসলেন এবং বিড়ালটি বিরক্ত না হওয়ার জন্য স্থির হয়ে বসে রইলেন। ভাঁজ করা কাগজটি খুঁজে পেয়ে তিনি আবারও মৃদু হাসলেন।
টার্মিনাল জুড়ে ডালপালা ছড়িয়ে থাকা বিশাল পাইন গাছটি এখনও সেখানেই আছে। ওম সাবের যখন মাঠে যেতেন, প্রতিদিন এটার পাশ দিয়ে যেতেন। তিনি তার স্বামীকে গাছের ডালে বসে থাকা পাখির ঝাঁক দেখাতেন। আর আবু সাবের ফ্যাকাশে গাধার পিঠে বসে তাকে শোনাতেন শৈশবের খেলার গল্প আর বন্ধুদের সাথে এই গাছের নিচেই কাটানো আনন্দময় দীর্ঘ রাতগুলোর কথা। কিন্তু এখন, এই গাছটি ওম সাবেরকে নির্দিষ্ট কিছু দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। যেদিন তিনি স্বামীর কাফনের কাপড় কিনতে শহরে যাওয়ার জন্য বাসে উঠেছিলেন। যেদিন তার ছেলে সাবের প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য বিদায় নিয়েছিল। এবং হ্যাঁ, সেই দিনটির কথাও, যখন মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি আর তার মা হাজ্জা আয়েশা বিয়ের সওদা করতে শহরে যাওয়ার জন্য তিন ঘণ্টা গাড়ির জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। এত পুরোনো দিনের কথা মনে রাখা ওম সাবেরের জন্য আশ্চর্যজনকভাবে সহজ ছিল। এটা কি তার প্রথম শহর ভ্রমণ ছিল বলে? নাকি অন্য কিছু…
পুরোনো মাইক্রোবাসের বিকট শব্দ তার কানে হাতুড়ির ঘায়ের মতো এসে লাগল। তিনি হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন, খেয়ালই করলেন না যে বিড়ালটি ভয় পেয়েছে। দেখলেন সেটি দৌড়ে গিয়ে গাছের চারপাশের দেয়ালের এক ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ল। ওম সাবের আবারও তার মূল্যবান চিরকুটটি দেখে নিলেন, তারপর ছায়ার মতো হালকা পায়ে গাড়িতে উঠে ড্রাইভারের পেছনের সিটে সকালের আধো-অন্ধকারে বসে পড়লেন।
শহরেরও অনেক মোড় আছে, কিন্তু ওম সাবের সেসবের কিছুই জানতেন না। শহরের যে অংশটি তিনি চিনতেন, তা তার কাছে সীমাহীন ও দিকহীন মনে হতো। সেটা কি শহরের কেন্দ্র ছিল? সেখানে ছিল পুরনো মসজিদ, কারাগার, প্রশস্ত রাস্তা আর শত শত অস্পষ্ট ভ্রমণস্মৃতি। সেখানে সব ধরনের ঘ্রাণ পাওয়া যেত। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই পথ চিনেছেন; কমলা আর শিশিরের ঘ্রাণ মেখে সাবেরের চোখের দিশায় তিনি হেঁটেছেন। গ্রামে ফেরার সময় সাবের নিজে কারাকক্ষে বন্দী থেকেওযেন মায়ের হাত ধরে তাকে ফিরতি গাড়িতে তুলে দিত। পথে সারা বিশ্ব যেন এক শ্রবণরত কান হয়ে যেত। জাদুর ঢোলে উলুধ্বনি বাজত, আর সুখ প্রতিটি মেয়েকে শুনিয়ে যেত আগামীকালের গল্প, বিয়ের খাবারের সুবাস আর এক শ্যামলা মেয়ের গান:
আমাদের বর আসছে সেজেগুজে চিনির চেয়ে সাদা সে, মিছরির চেয়ে মিষ্টি যে…
নারীরা ওম সাবেরকে অভিনন্দন জানাতে ভিড় করত, আনন্দের অশ্রুতে দীর্ঘ বছরের নীরবতা ভেঙে যেত, যুবকেরা নাচত, আর সাবের তার সাদা ঘোড়ায় চড়ে হাসিমুখে এগিয়ে আসত; পেছনের বাড়িটি তখন ছোটদের কলকাকলিতে কেঁপে উঠত।
পুরোনো মসজিদের রাস্তাটি আর আগের মতো নেই দেখে ওম সাবের হতাশ হলেন। অথবা হতে পারে তিনি আর আগের মতো আকুলতা নিয়ে রাস্তাটি দেখছেন না। কারণ এটি এখন আর তার যাত্রার শেষ বিন্দু নয়। এবার তাকে আরও দূরে যেতে হবে, শহরের উপকণ্ঠে। উঁচু দালানের ছায়ায় রাস্তাটি ঢাকা পড়ে ছিল। ওম সাবের পথচারীদের দিকে নজর দিলেন। এমন কাউকে খুঁজছিলেন যাকে তিনি তার চিরকুটটি পড়তে দিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপটি জানতে চাইতে পারেন। তিনি একটি গ্যাস স্টেশনের কোণে দ্বিধাভরে দাঁড়ালেন। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না; হাতে খবরের কাগজ নিয়ে এক তরুণীকে আসতে দেখলেন তিনি। ওম সাবের তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
মা!
জি…?
একটু এই নোটটা দেখো তো। আমি এখন এখানে আছি। আমার পরবর্তী কাজ কী?
কাগজটির দিকে তাকিয়ে তরুণীর মুখ লাল হয়ে গেল। শেষে সে বলল, আমার ভয় হচ্ছে আজ আপনি আপনার ছেলের সাথে দেখা করতে পারবেন না। আপনি কি জানেন না আজ ‘ভূমি দিবস’ (খধহফ উধু)?
ভূমি দিবস?
হ্যাঁ। আজ ধর্মঘট চলছে। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। গণ্ডগোল হতে পারে। আপনি কি আগামী সপ্তাহে আসতে পারেন না?”
বৃদ্ধা চুপ হয়ে গেলেন এবং তার কালো পোশাকের প্রান্তের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, মা, আমার পরের কাজটা কী?”
ঠিক আছে, আপনি চব্বিশ নম্বর বাসে উঠুন। ওই যে দূরে বাস টার্মিনাল দেখছেন? ওখানে গিয়ে চব্বিশ নম্বর বাসের কথা জিজ্ঞেস করুন।
ওম সাবের তার রুপালি জালের ঝুড়িটি তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। তার মনে হচ্ছিল তিনি যেন মাইলের পর মাইল হাঁটছেন। তরুণীটি গ্যাস স্টেশনের কোণায় দাঁড়িয়ে তার মিলিয়ে যাওয়া ছায়া দেখতে লাগল। তিনি ধীরলয়ে কিন্তু দৃঢ়ভাবে হাঁটছিলেন। আইদা ভাবল, এই নারীর মধ্যে অদ্ভুত এক জাদু আছে, সেই কালো ক্লান্ত চোখের ভেতরে এক শক্তি আছে। এক অব্যক্ত রহস্য; আইদা অনুভব করল ইনি সাধারণ কোনো নারী নন। কেন সে তার প্রতি টান অনুভব করছে? আইদা নিজের ভেতরে সেই অদৃশ্য টানকে মেনে নিল এবং দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরল। পেছনে নরম কণ্ঠ শুনে ওম সাবের ঘুরে তাকালেন।
মা!
কী হয়েছে মা?
আজ যাবেন না। দয়া করে। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি।
কেন?
কারণ আমি জানি না পরের পদক্ষেপ কী। আমরা কেউ জানি না। আমাদের পুরো প্রজন্মই জানে না।
তোমরা হারিয়ে যাওয়া এক প্রজন্ম। তবুও…ওম সাবের হাসলেন, মায়ার সাথে তরুণীটিকে দেখলেন। মেয়ের কাঁধে তার খসখসে হাত রেখে বললেন, তুমি বাড়ি যাও। আমি ব্যবস্থা করে নেব। আমার জন্য চিন্তা করো না।
তর্কের কোনো সুযোগ না দিয়ে তিনি আবার হাঁটতে শুরু করলেন, তার হাসি অমলিন ছিল। তিনি লক্ষ্য করতে শুরু করলেন যে আজ সবকিছু কেমন অস্বাভাবিক। রাস্তার দুই পাশের দোকানপাট বন্ধ। দোকানদারেরা বাইরে অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পথচারী খুব কম, যারা আছে তারাও কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই দ্রুত পালাচ্ছে; তাদের চোখের আতঙ্ক লুকানো যাচ্ছে না। বাসের দিকে যাওয়ার মোড় ঘোরার আগেই তিনি প্রথম গুলির শব্দ শুনলেন। তার হৃৎপিণ্ড যেন পাঁজরের ভেতর দিয়ে নিচে নেমে গেল। তিনি ভাবলেন রাস্তায় কেউ হয়তো গুলিবিদ্ধ হয়েছে এবং কেন জানি না তার তৎক্ষণাৎ সেই শ্যামলা মেয়েটির কথা মনে পড়ল। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে তিনি শুধু কিছু কিশোরের দলকে সবদিকে দৌড়াতে দেখলেন। গাড়িগুলো চিৎকার করে দ্রুত চলে গেল এবং টার্মিনাল নীরব হয়ে পড়ল। মেয়েটি কোথায়? সে কি বাড়ি চলে গেছে? একঝাঁক গুলির শব্দে ওম সাবেরের ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। এবার আর তার বুক কাঁপল না। টার্মিনালের গলিতে না ঢুকে তিনি প্রধান রাস্তায় উঠলেন। রাস্তাটি এখন এতটাই জনশূন্য যে তার মনে হতে লাগল কারাগারের পেছনের সেই জনমানবহীন কবরস্থানটি যেন জায়গা বদলে এই বিশাল আতঙ্কে ছড়িয়ে পড়েছে।
হঠাৎ দেয়ালের আড়াল থেকে একদল খালি পা মেয়ে বেরিয়ে এল, যা ওম সাবেরের মনে কিছুটা শান্তি দিল। তাদের হাতে শক্ত সাদা ঢিলা দেখে তার সেই গল্পের কথা মনে পড়ল, যেখানে একটি দেয়াল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল এবং একটি বোবা ছেলে একটি ছোট পাথর দিয়ে দেয়ালটিকে ঠেকিয়ে রক্ষা করেছিল। প্রার্থনার মতো কিছু আওয়াজ শুনে তিনি পেছনে তাকালেন। এক বিশাল জনস্রোত আসছে, হাতে এমন এক পতাকা যা তিনি আগে দেখেননি; তাদের স্লোগান তার দিকে আসার সাথে সাথে আরও জোরালো হচ্ছে। তিনি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলেন যতক্ষণ না সেই প্লাবন তাকে ছুঁল; তিনি অনুভব করলেন তার ডান হাতটি উপরে উঠে গেছে এবং নিজের গম্ভীর কণ্ঠে তিনি স্লোগান দিচ্ছেন- আমিই এই ভূমি।
পেটে একটি নরম হাতের স্পর্শ তাকে কাঁপিয়ে দিল। সেই স্পর্শ সাবেরের মতো শান্ত ও যত্নশীল। তিনি ঘুরে তাকালেন।
কে?
আমি আইদা।
তুমি বাড়ি যাওনি কেন?
কারণ আমি…
একটি মোটরের গর্জন আর বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য উচ্চকণ্ঠের নির্দেশে তাদের কথা থেমে গেল। গাড়ির শব্দ আরও বাড়তে লাগল; তারপর ভারী লাঠি হাতে সৈন্যরা সবখানে ছড়িয়ে পড়ল। আরও গুলির শব্দ শুনে ওম সাবের আইদার হাত শক্ত করে ধরলেন। ছেলেদের দৌড়াতে দেখে তিনি নিজের ঝুড়িটি ছেড়ে দিলেন। কিশোরদের লাঠি দিয়ে পিষে ফেলা হচ্ছিল, তাদের রক্তাক্ত মুখ হাত দিয়ে মুছতে মুছতে কেউ পালাচ্ছিল আর কাউকে ভ্যানে তোলা হচ্ছিল। ওম সাবের দুই হাত তুলে আকাশের দিকে প্রার্থনা করলেন। তিনি চাইলেন কোনো অলৌকিক কিছু ঘটে। এই পৃথিবীটা এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হোক যা সবকিছু পুড়িয়ে দেবে। কিন্তু মানুষের ভিড় তখন কমতে শুরু করেছে। মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে অলিগলিতে হারিয়ে যাচ্ছে। স্টিলের ব্যারিকেডের মাঝখানে তিনি নিজেকে আইদার সাথে একা আবিষ্কার করলেন এবং ঘৃণায় মাটিতে থুতু ফেললেন।
আইদা ওম সাবেরের পেছনে আশ্রয়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। এক সৈন্য ধীর ও ভারী পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে এল, বাতাসে লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে। সে কাছে আসার আগেই বাস টার্মিনালের প্রবেশপথের দেয়ালে লাঠি দিয়ে বাড়ি দিল। ওম সাবের এক হাতে ঝুড়িটি তুললেন, অন্য হাতে আইদার কাঁপা হাতটি চেপে। ধরলেন এবং এক কদম সামনে বাড়ালেন। সৈন্যটি অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, কোথায়?
বৃদ্ধা কথা বললেন না; তরুণীটি আর কাঁপল না।
কোথায়?কোথায়?” সৈন্যটি আবার চিৎকার করল এবং উত্তর না পেয়ে বন্দুক উঁচিয়ে তাদের দিকে এল। সে কিছুক্ষণ ওম সাবেরের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর এক পা পিছিয়ে এসে কিছুটা শান্ত স্বরে বলল, কোথায় যাচ্ছ তোমরা?
কারাগারে।
কেন?”
আমার ছেলে সাবেরকে দেখতে।
পরিচয়পত্র (ওউ) আছে?
আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখানে মহিলাদের আইডি থাকে না।
আর এর?
এ আমার মেয়ে।
তোমার মেয়ে?
হ্যাঁ।
ওম সাবের ঠোঁট কামড়ে ধরলেন এবং সৈন্যটির চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে রইলেন। সৈন্যটি আরও এক পা পিছিয়ে গেল, তারপর ব্যারিকেডের দিকে ফিরে গিয়ে গাড়িতে উঠল। মোটরের আওয়াজ উঠল এবং মুহূর্তের মধ্যে সেই বিশাল নিস্তব্ধতা আবার শহরটিকে গ্রাস করল। দুই নারী সেই স্থিরতার মাঝে দাঁড়িয়ে রইলেন।
যখন ওম সাবের আইদার বাড়ির কাছে পৌঁছলেন, তিনি সরু গলিতে রোদ আর নিস্তব্ধতায় ডুবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আইদা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ভাবল ওম সাবের তাকে অনুসরণ করবেন। কিন্তু বৃদ্ধা ঘুরে দাঁড়ালেন এবং গলির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে মিলিয়ে গেলেন। আইদার ডাক যেন তার কানেই পৌঁছল না। তাকে আরও কয়েক ঘণ্টা হাঁটতে হবে। সূর্যাস্ত নাগাদ পুরো পৃথিবীটা যেন এক শ্রবণরত কান হয়ে উঠল: এক শ্যামলা মেয়ে জাদুর ঢোল বাজাচ্ছে, যার সুর সন্ধ্যার ঢেউয়ের মতো মৃদু হয়ে বইছে- সুরটি কেবল তখনই থামল যখন ওম সাবের তার নিজের ঘরে প্রথম পা রাখলেন।