একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে দেশের পরিবহন খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বেড়ে গেছে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও ট্রেইলরের ভাড়া। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার থেকে শুরু করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতি এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলার ত্রুটির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি তেল সংকট এখন কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়, বরং তা জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খাতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জনজীবন, নিত্যপণ্যের বাজার এবং দেশের প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য।
জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি মালিকরা দফায় দফায় ভাড়া বাড়াচ্ছেন। পণ্য পরিবহনের এই অতিরিক্ত খরচ সরাসরি গিয়ে পড়ছে ভোক্তার কাঁধে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারের প্রতিটি পণ্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা যেমন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি শহুরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষরা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাজারের এই অস্থিরতা যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
পরিবহন খাতের এই অস্থিরতা কেবল স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলো থেকে পণ্য খালাস এবং কলকারখানা থেকে পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে কাভার্ড ভ্যান ও ট্রেইলরের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ভাড়ার নৈরাজ্য এবং তেলের সংকটে সময়মতো পণ্য পরিবহন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রপ্তানিকারকরা নির্দিষ্ট সময়ে ক্রেতার কাছে পণ্য পাঠাতে পারছেন না, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে এবং তৈরি পোশাক খাতের মতো সংবেদনশীল খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, আমদানিকৃত কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় না পৌঁছানোয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা শিল্প খাতে স্থবিরতা ডেকে আনছে।
এই সংকটের পেছনে কেবল তেলের দুষ্প্রাপ্যতা নয়, বরং পরিবহন খাতের শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং তদারকির অভাবও দায়ী। সংকটের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও পরিবহন নেতা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা লুটছেন। সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহিতা না থাকায় এই চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। আপৎকালীন সময়ের জন্য জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে হবে। সরকার নির্ধারিত পরিবহন ভাড়া কার্যকর করতে কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। ভাড়ার ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের নৈরাজ্য দমনে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবহন খরচের অজুহাতে খুচরা বাজারে যাতে পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সেদিকে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। তেলনির্ভরতা কমিয়ে পণ্য পরিবহনে রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। জ্বালানি তেল সংকটে পরিবহন খাতের এই বিশৃঙ্খলা যদি দ্রুত নিরসন করা না যায়, তবে এর মাশুল দিতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকে। জনভোগান্তি লাঘব এবং অর্থনীতির গতি সচল রাখতে সরকারকে এখনই দৃঢ় ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পরিবহন খাতের এই অস্থিরতা দমনে শৈথিল্য দেখানোর আর কোনো অবকাশ নেই।
মতামত সম্পাদকীয়




















































