সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে দেশের উপকূলীয় ও নদীমাতৃক অঞ্চলের পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্প বন্ধ থাকার দৃশ্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক। এই ‘অস্বীকৃতি’ আর ‘বাস্তবতা’র মধ্যকার দূরত্ব কেবল একঘেয়ে বিতর্ক নয়, বরং এটি দেশের মৎস্য খাতের ওপর এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো মৎস্য আহরণ। কয়েক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি এর ওপর নির্ভরশীল। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর অস্থিতিশীলতার মাঝে মৎস্যখাতে নিয়োজিত হাজার হাজার নৌকা ও ট্রলার জ্বালানি সংকটে পড়েছে। সমুদ্রে যেতে না পারায় অধিকাংশ নৌকা ও ট্রলার ঘাটে অলস পড়ে আছে। কমে গেছে মাছ আহরণ। এর প্রভাব পড়েছে মাছের বাজারে, বাড়ছে বাজারদর। এতে একদিকে জেলেরা পড়েছেন আর্থিক সংকটে, অন্যদিকে ভোক্তাদের গুণতে হচ্ছে বাড়তি দাম। বর্তমানে ডিজেল ও পেট্রোলের তীব্র সংকটের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার ঘাটে অলস বসে আছে। জেলেরা সাগরে যেতে পারছেন না, আর যারা ঝুঁকি নিয়ে যাচ্ছেন, তারা প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে মাঝপথ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে বাজারে মাছের সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় এবং পকেটে।
সরকার যখন বলে সংকট নেই, তখন পাম্প মালিকরা তেলের ‘শর্ট সাপ্লাই’ বা সরবরাহে ঘাটতির কথা জানান। এই দ্বিমুখী তথ্যের মাঝে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ উৎপাদনশীল শ্রেণি। জ্বালানি না পেয়ে ট্রলারগুলো অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম, আর ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন প্রান্তিক জেলেরা। বিশেষ করে ইলিশের মৌসুমে বা বড় ধরনের মাছ আহরণের সময়ে এ ধরনের কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক সংকট দেশের নীল অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
জ্বালানি সংকটের এই নেতিবাচক প্রভাব কেবল মাছ ধরার ট্রলারেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি পুরো সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করছে। মাছ পরিবহনের ট্রাকগুলো বাড়তি ভাড়ার চাপে পিষ্ট, যার ফলে খুচরা বাজারে মাছের দাম সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত প্রোটিনের অভাব দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ।
আমরা মনে করি, সংকট ধামাচাপা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যদি আমদানিতে সমস্যা থাকে বা ডলারে টান পড়ে, তবে তা স্বচ্ছতার সাথে স্বীকার করে বিকল্প পথ খোঁজা জরুরি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মৎস্য ও কৃষি খাতের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। রেশন বা বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত জেলেদের হাতে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সরকারকে বুঝতে হবে, পেট্রোল পাম্প বন্ধ থাকা কেবল একটি সাময়িক অসুবিধা নয়, এটি একটি জাতীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার স্পষ্ট সংকেত। মৎস্য খাতকে বাঁচাতে এবং হাজার হাজার জেলের জীবিকা রক্ষা করতে অনতিবিলম্বে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।


















































