প্রকৃতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যিক রাজধানী দেশের মোট রাজস্বের সিংহভাগ যোগান দেয়। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বীর চট্টলার জনজীবন আজ প্রধানত দুটি সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে—একটি হলো দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, আর অন্যটি অনিয়ন্ত্রিত যানজট। এই সমস্যাগুলো কেবল নাগরিকদের দুর্ভোগই বাড়াচ্ছে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির গতিকেও মন্থর করে দিচ্ছে।
গত কয়েক দশকে চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের চশমা হিল, মুরাদপুর কিংবা বহদ্দারহাট এলাকা যখন তলিয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—এই বিশাল বাজেটের সুফল কোথায়? মূলত ড্রেনেজ সিস্টেমের ত্রুটি, খালের অবৈধ দখল এবং পাহাড় কাটার ফলে নেমে আসা বালি নালাগুলোকে ভরাট করে ফেলছে। জোয়ারের পানি আটকানোর জন্য নির্মিত ‘টাইডাল রেগুলেটর’ গুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সক্রিয়তা নিয়েও জনমনে সংশয় রয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে ড্রেন পরিষ্কার না করে পুরো শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার একটি মাস্টারপ্ল্যান ভিত্তিক আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামের যানজট পরিস্থিতি এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে জিইসি মোড়, দেওয়ানহাট এবং আগ্রাবাদ এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ যানজটে আটকে থাকছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলেও তার সুফল সাধারণ যাত্রী ও ছোট যানবাহনের ক্ষেত্রে কতটুকু মিলছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নগরে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা, যত্রতত্র পার্কিং এবং ফুটপাত দখল যানজটকে আরও উসকে দিচ্ছে। বাণিজ্যিক রাজধানীর জন্য একটি সুশৃঙ্খল মেট্রো রেল বা বিআরটি সার্ভিস চালুর প্রয়োজনীয়তা এখন অনস্বীকার্য।
চট্টগ্রামের উন্নয়নের পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা এবং পিডিবি একেক সময় একেক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে। প্রায়ই দেখা যায় একটি রাস্তা কার্পেটিং করার কয়েকদিন পরই অন্য একটি সংস্থা নালা খননের জন্য তা খুঁড়ে ফেলছে। এতে জনদুর্ভোগ যেমন বাড়ে, তেমনি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়।
চট্টগ্রামকে একটি সত্যিকারের বিশ্বমানের বাণিজ্যিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে হতে হবে দীর্ঘমেয়াদী ও পরিবেশবান্ধব। জলাবদ্ধতা নিরসনে পাহাড় রক্ষা ও খাল উদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
চট্টগ্রাম কেবল চট্টগ্রামের মানুষের নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। তাই এই শহরের ক্ষতগুলো সারাতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও আন্তরিক ও সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগই পারে চট্টগ্রামকে একটি বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরীতে রূপান্তর করতে।
এ মুহূর্তের সংবাদ

















































