গভীর জ্বালানি সংকটের দিকে যাচ্ছে দেশ

দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট। যেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৫৮ কোটি ঘনফুট। চাহিদা ও সরবরাহে বর্তমানে ঘাটতি থাকছে দৈনিক ১২২ কোটি ঘনফুট। অন্যদিকে বর্তমানে যে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে তা গত বছরের এ সময়ের (১০ জানুয়ারি, ২০২৫) তুলনায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট কম। ওই সময়ে দেশে গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ ছিল ২৭৫ কোটি ঘনফুট। এরমধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে এক অস্থির বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার অন্যতম প্রধান উপসর্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে গভীর জ্বালানি সংকট। বিগত কয়েক দশকে দেশের শিল্পায়ন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বড় ভূমিকা রাখলেও, বর্তমান বাস্তবতা বেশ উদ্বেগজনক। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েন এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার চাকা সচল রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
জ্বালানি সংকটের এই মেঘ একদিনে ঘনীভূত হয়নি। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সে অনুযায়ী প্রাথমিক জ্বালানি বা গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করা যায়নি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা আমাদের অতিমাত্রায় আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং কয়লার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় মেটানো এখন সরকারের জন্য হিমশিম খাওয়ার মতো বিষয়। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটে বন্ধ থাকছে অথবা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।
এই সংকটের প্রভাব বহুমুখী। একে তো অসহনীয় লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ, তার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসছে শিল্প খাতে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে দেশ। কারখানায় ডিজেল ব্যবহার করে জেনারেটর চালানোয় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যার চূড়ান্ত ভার গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে জ্বালানি সংকটের কারণে মুদ্রাস্ফীতি আরও লাগামহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
তবে এই অন্ধকার সময় থেকে উত্তরণের পথ একেবারেই রুদ্ধ নয়। এখনই সময় দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করার।
প্রথমত, নিজস্ব খনিজ সম্পদ বিশেষ করে স্থলভাগ ও সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। বিদেশি কোম্পানির ওপর শতভাগ নির্ভর না করে বাপেক্সকে শক্তিশালী করা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন—সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের প্রসার ঘটাতে হবে। তৃতীয়ত, জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া এবং সিস্টেম লস বা অপচয় রোধে কঠোর হতে হবে।
জ্বালানি কোনো বিলাসদ্রব্য নয়, এটি অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এই সংকটকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি এখনই কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে আমাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে পড়বে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।