চট্টগ্রাম নগরীতে মশার উপদ্রব এখন কেবল যন্ত্রণার কারণ নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক কেন্দ্র—সর্বত্রই মশার রাজত্ব। নগরবাসী মশার কয়েল, অ্যারোসল বা মশারি ব্যবহার করেও নিস্তার পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পক্ষ থেকে নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর দাবি করা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন মিলছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে মশার এই অপ্রতিরোধ্য বিস্তার এবং ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে যে সংশয় দেখা দিয়েছে, তা নিরসনে জরুরি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।
গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে এক ধরনের জৈবিক প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। চসিক বর্তমানে যে ‘অ্যাডাল্টিসাইড’ বা কীটনাশক ব্যবহার করছে, তা গত তিন-চার বছর ধরে অপরিবর্তিত। ফলে মশা এসব ওষুধের প্রতি সহনশীল হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ইনসেক্টিসাইড রেজিস্ট্যান্স’ বলা হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলও বিষয়টি স্পষ্ট করেছে যে, একই রাসায়নিক বারবার ব্যবহারে মশার জিনগত পরিবর্তন ঘটে, যা তাদের মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে দেয়। সিটি করপোরেশন এখন ওষুধের মান পরীক্ষা বা পরিবর্তনের যে কথা ভাবছে, তা আরও আগেই করা উচিত ছিল।
মশা নিধনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আধুনিক তথ্যের অভাব। চসিক এখনও পুরোনো জরিপ বা অন্য সংস্থার অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কার্যক্রম চালাচ্ছে। কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব কেমন, কোন প্রজাতি কোথায় বেশি বংশবিস্তার করছে—এসব বিষয়ে নিজস্ব কোনো নিয়মিত গবেষণা বা ‘এন্টমোলজিক্যাল সার্ভে’ (কীটতাত্ত্বিক জরিপ) চসিকের নেই। ফলে লক্ষ্যহীনভাবে ওষুধ ছিটিয়ে কেবল অর্থের অপচয় হচ্ছে, মশা মরছে না। কোনো যুদ্ধজয়ের জন্য যেমন শত্রুর অবস্থান জানা জরুরি, মশা নিধনের জন্য ঠিক তেমনি ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করা অপরিহার্য।
মশা কেন মরছে না, সেই বিজ্ঞানভিত্তিক কারণ খুঁজে বের করা এবং সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা সাজানোই এখন সময়ের দাবি।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জনবল বা ওষুধের সীমাবদ্ধতার কথা বললেও নগরবাসীর অভিযোগ—তৎপরতার অভাবই মূল কারণ। নালা-নর্দমা পরিষ্কার না রাখা এবং জমে থাকা পানির উৎস ধ্বংস না করে কেবল উড়ন্ত মশা মারার চেষ্টা করলে কোনো লাভ হবে না। লার্ভিসাইড বা লার্ভা ধ্বংসকারী ওষুধের প্রয়োগ বাড়াতে হবে। গত বছর বিটিআই (BTI) ব্যবহারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা এবং সঠিক প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মশার উপদ্রব থেকে নগরবাসীকে বাঁচাতে হলে প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে এসে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। নিয়মিত ব্যবধানে কীটনাশক পরিবর্তন করতে হবে যাতে মশা প্রতিরোধক্ষমতা গড়তে না পারে। রাসায়নিকের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব হারবাল ওষুধের কথা ভাবা যেতে পারে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশেষজ্ঞ সংস্থাকে সাথে নিয়ে বছরব্যাপী মশার ঘনত্ব ও ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা সেল গঠন করতে হবে। বর্ষা আসার আগেই নালা-নর্দমা পরিষ্কার এবং বিশেষ মশক নিধন অভিযান বা ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ জোরদার করতে হবে।
অবশ্য শুধু প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে না থেকে নাগরিকদেরও নিজ আঙ্গিনা ও ছাদবাগান পরিষ্কার রাখতে উৎসাহিত করতে হবে।
চট্টগ্রামকে একটি বাসযোগ্য ও মশামুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তোলা অসম্ভব কিছু নয়। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা, স্বচ্ছতা এবং বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ। কর্তৃপক্ষ যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে সামনে গরম এবং বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আমরা আশা করি, সিটি করপোরেশন দ্রুত ঘুম ভাঙবে এবং নগরবাসীকে এই অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে।
মতামত সম্পাদকীয়





















































